বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০১৭ ০৪:৪৮:০৭ এএম

আমার আপনার জন্ম যদি ‘রোহিঙ্গার’ ঘরে হতো!

সাইফুর রহমান সাগর | সম্পাদকীয় | শনিবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৬ | ০৪:৫৫:০৪ পিএম

কোন ধরণের সুচনা না দিয়েই মুল কথায় শুরু করতে চাই। ইতিহাস কম বিস্তর সবার জানা আছে।  এক কথায় মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গা মানব গুষ্ঠিগুলো নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে বহু বছর ধরে।

 সম্প্রতি এই নির্যাতনের চিত্র গুলি মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানিয়েছে। চেঙ্গিস খান যখন তাঁর বাহিনী নিয়ে কোন প্রান্তর ও এলাকা দখল করতে যেতেন, তখন আগে থেকে শত্রু বাহিনীকে সময় নির্ধারণ করে দিতেন যেন এলাকা ছেড়ে চলে যায়। যেসব লোকেরা তাঁর আদেশ অমান্য করে রয়ে যেতেন, তাঁদের ভাগ্যে নিশ্চিত ম্রিত্যু ছাড়া কিছুই থাকতোনা।  শত শত মাইলে যেসব ঘর বাড়ি ও মানুষ থাকতো সেগুলিকে পুরিয়ে মারা হতো। 
কিন্তু এখন যা হচ্ছে মায়ানমারে, কোন ধরণের পূর্বাভাস ছাড়াই সরকারী বাহিনী আক্রমণ চালাচ্ছেন নিরস্ত্র অসহায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ বনিতার উপর। আগুন ঢেলে দেয়া হচ্ছে গায়ের মধ্যে। ঘরবাড়ি, পশু, ও ছোট ছোট শিশুদেরকে পর্যন্ত নির্যাতন ও ধর্ষণ করছে। 

আমরা আজ আবার সেই মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে পুনরায় দেখতে পাচ্ছি।  তবে এই বর্বরতার চিত্রে মিল থাকলেও পরিবর্তন হয়েছে নেতৃত্বে দানকারী অত্যাচারী মানুষটির। ২০১৬ এর অবশেষে এসে আমরা সেই চেঙ্গিস খান থেকেও ভয়ানক রুপে দেখছি মায়ানমারের অংসান সূচি কে।

অংসান সূচিকে গনতন্ত্রপন্থী নেত্রী হিসেবে সবাই জানি। এবং এই মহিলাটি যখন কারা ভোগ করেছেন এক যুগেরও বেশি, সারা বিশ্ব এবং দল,মত,বর্ণ বিশেষ করে ধর্ম নির্বিশেষে আন্তর্জাতিক ভাবে তাঁর পক্ষে কাজ করেছিল সবাই। 

যার প্রেক্ষিতে তাঁকে নোবেল আয়োজক কমিটি ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পদক দেয়ার ব্যপারে ঐকমত হন এবং তাঁকে শান্তি পদকে ভূষিত করেন। 

পরপরই সূচির মুক্তির দাবীতে তৎকালীন সেনা সমর্থিত সরকারের বিপক্ষে সারা বিশ্ব ব্যপি সমালোচনা ও ক্ষমতা ছাড়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। ফলশ্রুতিতে সেনা সরকার ক্ষমতা ছেড়ে গনতান্ত্রিক নির্বাচন দিতে বাধ্য হন।

সুবাদে ২০১৫ তে অংসান সূচির ন্যাশনাল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি  বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন।
তিনি এবং তাঁর দল ক্ষমতা বুঝে নিলেন, বিশ্ববাসী ১০০ ভাগ নিশিন্ত ভাবে বিশ্বাস করেছিল দীর্ঘ চলমান বর্ণবাদী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর এবার একটা নিশ্চিত অবস্থান তৈরি হবে মায়ানমারে। 
২০১৬ সালের প্রান্তে এসে আমাদের তথা সারা বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়ে ইতিহাসে আরেকটি ঘৃণ্য অধ্যায়ের জন্ম দিলেন এই নারী অংসান সূচি।

বার বার বিশ্ববাসীর কাছে গনতন্ত্রের কাণ্ডারি হিসেবে আসলেও , সবার ধারনাকে পাল্টে দিয়ে উনি হয়ে গেলেন ২০১৬ এর চেঙ্গিস খান। তাঁর এই পদক্ষেপে ইতিহাসে তাঁর অবস্থান হয়ে গেলো আস্তাকুরের তলদেশে। 

সেনা সরকারের আমলেও এতো নির্যাতন হয়নি যতটা সূচির নেতৃত্বে হচ্ছে। বিশ্ববাসী অবাক হয়ে শুধু চেয়েই রইলেন, কেউ থামানোর মতো উদ্যোগ নিচ্ছেনা। 

বিশ্ব বাসীর কাছে সন্দেহের রুপে ধরা দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নিরবাস্থান। তাহলে কি আমরা ভেবে নিবো এই প্রহসনের পেছনে তাঁদের ইন্ধন রয়েছে?

জাতিসংঘের কি কিছুই করার নেই? যে দেশে তেল এবং স্বার্থ আছে শুধুমাত্র সেসব দেশেই কি জাতিসংঘ বিনা কারনে তাঁদের কর্মসূচি পরিচালনা করবেন?  অন্যদের দোষ দিয়ে লাভ কি? আমরা প্রতিবেশি রাষ্ট্র হিসেবে কি দায়িত্ব পালন করছি?

অসহায় নারী শিশুরা যখন একদিকে আগুন আরেকদিকে বেঁচে থাকার নুন্যতম ভরসা নিয়ে আমাদের পানে ছুটে আসছে, আমরা তাঁদেরকে ফিরিয়ে আবারো একই নৌকায় আগুন ও অথৈ সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছি ।
Image result for Rohingya kill 2016

শুধুই কি একটাই দোষ, তারা মুসলমান???

আমার প্রশ্ন এদেরকে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই? অন্য সময় গুলিতে তারা যখন বাংলাদেশে ঢুকতে চেয়েছে, আমরা পুশ ব্যাক নামক ইংরেজি শব্দ দিয়ে স্টেটমেন্ট দিয়েছি যে আমরা কয়েকজনকে পুশব্যাক করেছি।  পুশব্যাক মানে হল তাঁদেরকে গলা ধাক্কা দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছি যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে। 

মেনে নিলাম, অপ্রয়োজনে কেন এদেশে আসবে তাই ফিরিয়ে দেয়া। কিন্তু এখন যারা আসছে তারা তো ভালো জীবনের খোঁজে আসেনি, তাঁরা এসেছে জীবনের বাঁচার সর্বশেষ  চেষ্টায়।

সেই অধিকার টুকুও তাঁদেরকে দিলাম না আমরা। প্রশ্ন এসে যায়, আমাদের আর মায়ানমারের বর্তমান স্বেচ্ছাচারী সরকারের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
আমরাও তো পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিনা কারনে আশ্রয় নিয়ে থাকি। একবার ভেবে দেখুন তো আমাদেরকে এভাবে ফিরিয়ে দিলে আমাদের কেমন লাগতো?

একবার ভেবে দেখুন তো আমাদের জন্ম যদি এই রোহিঙ্গাদের ঘরে হতো তাহলে কেমন লাগতো?

একি কারনে যদি ভারত থেকে কেউ ঢুকতে চাইতো তাহলে কি বাংলাদেশ সরকার হিন্দুদেরকে ফিরিয়ে দিত? 
Image result for Rohingya news 2016
একি কারনে যদি মায়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলমান না হয়ে হিন্দু বা অন্য ধর্মের হতো তাহলে কি ফিরিয়ে দিতো?

হায়রে রোহিঙ্গা, তোমাদের একটাই দোষ, একটাই অপরাধ, তোমরা কেন মুসলমান। তোমাদের একমাত্র মুক্তির পথ " মৃত্যু" 

লেখকঃ সাইফুর রহমান সাগর, সংবাদকর্মী ও সম্পাদক , ইউরোবিডি নিউজ ডটকম



খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন