বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ ০২:০৫:৪৯ পিএম

যৌতুকের দাবি মেটাতে না পারায় স্ত্রীর ওপর ইমামের নির্যাতন

জাফর আহমেদ, টাঙ্গাইল থেকে | জেলার খবর | টাঙ্গাইল | সোমবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬ | ১০:১৬:০৬ এএম

যৌতুকের দাবি মেটাতে না পারায় স্ত্রীর ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছেন মসজিদের এক ইমাম। ৬ ডিসেম্বর রাতে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অলোয়া ইউনিয়নের চানআমুলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নির্যাতনকারীর নাম শফিকুল ইসলাম। তিনি উপজেলার নিকলা রায়পাড়া মসজিদে ইমামতি করেন। ১২ দিনের শিশুসন্তান নিয়ে ওই ইমামের স্ত্রী ফাতেমা খাতুন লিয়া (২৫) এখন টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ১৩ নম্বর বেডে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। ফাতেমা উপজেলার নিকরাইল ইউনিয়নের মাটিকাটা গ্রামের মো. তোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে।

এ ঘটনায় তোফাজ্জল হোসেন বাদী হয়ে তিন জনের নাম উল্লেখ করে ভূঞাপুর থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। জানা যায়, ২০১০ সালে দু’পক্ষে মতামতের ভিত্তিতে অলোয়া ইউনিয়নের চানআমুলা গ্রামের আবদুল হামিদের ছেলে শফিকুল ইসলামের সঙ্গে ফাতেমার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে শফিকুলকে ১ লাখ টাকা ও মেয়ের গহনা বাবদ ২ ভরি সোনা দেন ফাতেমার বাবা তোফাজ্জল হোসেন। বিয়ের পর ভালোই চলছিল তাদের দাম্পত্য জীবন। দুই বছর পর তাদের ঘরে জন্ম নেয় ছেলে রৌফান। এরপর থেকে শফিকুল ও তার বাবা-মা মিলে নানা অজুহাতে ফাতেমার ওপর অত্যাচার চালাতে থাকে। বাবার বাড়ি থেকে আনতে বলা হয় যৌতুক। মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে ফাতেমার বাবা শফিকুল ইসলামকে একবার ৭০ হাজার টাকা দেন। এতেও শফিকুলের মন ভরেনি। ফাতেমাকে আরও এক লাখ টাকা আনতে বলে শফিকুল। দাবিকৃত টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় অত্যাচার কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

এরই মধ্যে ৩০ নভেম্বর স্থানীয় একটি ক্লিনিকে দ্বিতীয় ছেলে সন্তানের জন্ম দেন ফাতেমা। ৫ দিন পর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ছুটি দিয়ে দেয়ায় ফাতেমা স্বামীর বাড়িতে চলে আসেন। ৬ ডিসেম্বর রাতে স্বামী শফিকুল ঘরে ঢুকে আলো নিভিয়ে ফাতেমার মুখ চেপে ধরে কিল-ঘুষি মারেন। একপর্যায় ফাতেমার মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে শফিকুল। ফাতেমার চিৎকারে আশপাশের লোকজন দৌড়ে এসে তাকে উদ্ধার করে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। আর এ সুযোগে পালিয়ে যান ইমাম শফিকুল।

রোববার টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ফাতেমা বেডে শুয়ে আছেন। মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত। আঘাতের কারণে দুটি চোখে ফুলে গেছে। কিছু দেখতে পারছেন না। এলোপাতাড়ি মারধর ও কোপানোর কারণে তার শরীরের বিভিন্ন স্থান ক্ষতবিক্ষত।

ফাতেমা নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘বিয়ের দুই বছর পর থেকে আমার ওপর নির্যাতন চলছে। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব মুখ বুজে সহ্য করে আসছি। এভাবে স্ত্রীকে স্বামী কোপাতে পারে, তা কল্পনায়ও আনতে পারিনি। আমি নরপশু শফিকুলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

ফাতেমার মা হালিমা বেগম বলেন, ‘মেয়েকে খুব আশা করে বিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলম জামাই ইমাম, মেয়েকে মর্যাদা দিয়ে রাখবে। কিন্তু সব ভাবনা উলট-পালট হয়ে যায় ওই জামাই যখন যৌতুক দাবি করে। যৌতুকের দাবিতে মেয়েকে মারধর করে। একবার শফিকুল গয়নার জন্য মেয়েকে আমাদের বাড়ি পাঠায়। পরে মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে ৫ ভরি সোনার গয়না দিয়ে মেয়েকে স্বামীর বাড়ি পাঠিয়ে দিই। তার কয়েকদিন পর আবার মেয়ের ওপর নির্যাতন শুরু হয়।’

ফাতেমার বাবা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘নির্যাতনের কারণে মাঝেমধ্যেই ফাতেমা আমাদের বাড়িতে চলে আসত। আমরা বুঝিয়ে তাকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিতাম।’ তিনি বলেন, ‘শফিকুল ইমাম নামের কলংক। আমি ওর শাস্তি চাই।’

অলোয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মসজিদের ইমাম হয়ে শফিকুল স্ত্রীকে এভাবে নির্যাতন করল, ভাবাতেই অবাক লাগে। এর নিন্দা জানানোর ভাষা আমার নেই।’

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা টাঙ্গাইল জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান আজাদ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার দাবি করেছেন। নির্যাতিতাকে সব ধরনের আইনি সহায়তা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শামসুল হুদা বলেন, গৃহবধূ নির্যাতনের ঘটনায় মামলা দায়ের পরপরই আসামিদের গ্রেফতারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। এরই মধ্যে টাঙ্গাইল মেডিকেলে চিকিৎসাধীন ফাতেমা খাতুনের জবানবন্দি নেয়া হয়েছে।সূত্র: যুগান্তর।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন