সোমবার, ২৯ মে ২০১৭ ০৭:০৯:৪৪ পিএম

দীপ্ততে কেন তিক্ত শিল্পী সমাজ! এবং কুলসুমের প্রিয় সুলতান সুলেমান

সাইফুর রহমান সাগর | সম্পাদকীয় | বৃহস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর ২০১৬ | ১২:৩৪:৩১ পিএম

আমার সহধর্মিনীর সহকারী কুলসুম, টিভি না দেখলে কোনো কাজ করেনা. টিভি দেখানোর শর্তে যে কোনো কাজ করানো যায়. 

আমার সহধর্মিণীকে গত কিছুদিন যাবৎ জাহাপনা জাহাপনা করে ডাকে কুলসুম. আমার সহধর্মিনীও তার ডাকে মহারানীর স্টাইলেই সারা দেয়.

বিষয়টি নিয়ে প্রথমে কিছুদিন লক্ষ্য না করলেও, ইদানিং ব্যাপারটা আরো বেশি বিস্তৃতি লাভ করায়, যেমন আমার মেয়েকেও রাজা রানীর আমলের নামে ডাকাডাকি, এসব কিছু মিলিয়ে আমি একটু অবাক হয়েই প্রশ্ন করলাম আমার সহধর্মিণীকে, ব্যাপার কি ?

কিছুক্ষন হেঁসে আমাকে বললো, আরে আপনিও দেখেন, পরে নিজেকে সুলতান মনে হবে. 

আরো খুলে বলতে বললে জানালো, দীপ্ততে বিদেশী ডাবিং করা সিরিয়াল " সুলতান সুলেমান" এর কথা.

আমার সহধর্মিনী বললো সিরিয়ালটা মোটামুটি পর্দাশীল ও পারিবারিক বলয়ে দেখার মতো একটি রুচিশীল গল্পো , উপস্থাপনা গুলো অসাধারণ.

কাজের চাপে দীর্ঘদিন টিভির সাথে আমার সম্পর্ক নাই.

আমার বৌ এর মুখে সুনাম শুনে চুপে চুপে ইউটিউবে গেলাম দেখতে,রাতে শোবার আগে .

প্রথম পর্ব দেখলাম , ঐতিহাসিক সুলতান সুলেমানের বীরত্ব গাঁথা শাসন আমলের ভিডিও চিত্র, এ যেন সেকালের সুলতানের পুরো মহল ও পোশাক আষাক আয়নার মতো সামনে ভেসে উঠেছে।

সুলতান সুলেমান পৃথিবীর অন্যতম সাবলিল শাসনের সত্যিকারের ইতিহাস .কিন্তু এই ইতিহাসকে এতো সুন্দর ভাবে সাজিয়ে এবং অত্যাধুনিক বৈচিত্র্যতায় চিত্রায়ন করে তুলে ধরা, নিতান্তই কষ্টসাধ্য ব্যপার।

শুধুমাত্র প্রথম পর্ব দেখেই অনেক ভালো লাগলো, গল্পটা কি আছে সেটা না দেখলেও প্রেজেন্টেশন ও ড্রেসআপ গুলি দেখে মনে হয়েছে, বিশাল ব্যয়বহুল, রুচি সম্মত , প্রতিটা অভিনয় শিল্পীর অভিনয় দক্ষতা, এ যেনো সামনে বসে সেকালের ঘটনা সরাসরি প্রত্যক্ষ করা .

সিরিয়ালটি নিয়ে সম্প্রতি শিল্পী সমাজের একঅংশ একাট্টা হয়ে প্রতিবাদ করছে যেনো সিরিয়ালটি বন্ধ করা হয়. একটা অংশ এ কারণেই বলবো, দীপ্ততে আরেকটা সিরিয়াল চলছে যেটা একদম হুবুহু ইন্ডিয়ান পারিবারিক কলহ নির্ভর সিরিয়ালকে কপি করার এবং সিকুয়েন্স গুলো ইন্ডিয়ান সিরিয়ালকে হুবুহু নকল করার চেষ্টা, যদিও নকলের চেষ্টাতেও সফল হয়নি আমাদের গুনি নির্মাতারা।

বলে রাখা ভালো , ডাবিং এর চেয়ে হুবুহু নকল করার চেষ্টা সবচে বড় অপরাধ।

ওই সিরিয়ালে যারা নিয়মিত অভিনয় করে যাচ্ছেন তাদের বিশাল একটি অংশকে এ আন্দোলনে দেখা যায়নি . আন্দোলনটিকে এ যাবৎকালের শ্রেষ্ঠ আন্দোলন বলা চলে যে, একটা টিভি ভবনের সামনেই অনুষ্ঠান ও টিভির লাইসেন্স বন্ধের দাবিতে অবস্থান গ্রহণ.

এটাকে অনেকটা জোর করা বলা চলে .

দীর্ঘকাল আমাদের দেশের যুব সমাজ থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত হিন্দি সিরিয়ালে আক্রান্ত হয়ে আমাদের সংস্কৃতি থেকে শুরু করে, আমাদের পরিবারের একমাত্র অশান্তি হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছিলো.

এমনকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এইসব সিরিয়ালের নামে অনেক হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনার কথাও দেখেছি সংবাদ মাধ্যম গুলোতে . এসব ঘটনা গুলো নিয়মিত হচ্ছে ও এখনো চলমান।

মজাদার বিষয় হলো, আজ পর্যন্ত কখনো শুনিনি, সুলতান সুলেমানের জন্য অপ্রিতিকর কোন অঘটন ঘটতে।

আমার প্রশ্ন এবং উদ্বেগ হলো, ইন্ডিয়ান সিরিয়াল এর বিরুদ্ধে এরকম বিক্ষোভ বা আন্দোলন কেনো করা হয়নি.

অবাক বিষয় হলো এখন অবধি ইন্ডিয়ান ঐসব সিরিয়ালের বিরুদ্ধে তাঁদের বর্তমান আন্দোলনেও শক্ত কোনো অবস্থান নেই। 

তাহলে, শুধু সুলতান সুলেমান কেনো ?

এখানে আমার সুস্পষ্ট সন্দেহ বোধ হয় . আমাদের টেলিভিশন মিডিয়াকে ইন্ডিয়া ছাড়া অন্য কোনো দেশের বিনোদন বা অনুষ্ঠান যেনো যখন দখল করতে না পারে, এই জন্য একটি মহল ইন্ডিয়ার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে বলে মনে হওয়াটা কি অস্বাভাবিক ?

আমাদের দেশের শিল্পীরা শুধু সস্তা চেতনা নিয়ে পড়ে থাকবেন আর মুখে বলবেন ডিজিটাল কথা বার্তা, কাজের বেলায় ঠনঠন .

শিল্পীরা তো অনেকেই এখন ক্যামেরাতে চেহারা দেখানোর ব্যবসা করে চলেছেন. শুনেছি ২/১ টা নাটকে নাকি চেহারা দেখতে পারলেই গাড়ি বাড়ির মালিক হয়ে যায় সহজেই .

আমাদের দেশের চিত্র শিল্পের এমন দশা দেখি মাঝে মাঝে, ঠিক মতো নকলটাও করতে পারেনা.

একই ধাঁচের চেতনা নিয়ে বার বার পিছিয়ে থাকা গল্প নির্ভর, আর দিনে 10টা নাটকের অভিনয়ের শিডিউল নিয়ে আর যাহোক, কোনো সৃষ্টিশীল কাজের গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব নয়.

আমাদের এখানে বেশি মুনাফার লোভে নূন্যতম মান বজায় রাখতে পারেনা পরিচালক ও প্রযোজকরা . নিজেরা ভিন্ন দেশি কালচারে বসবাস করে সাধারণ মানুষকে পঁচা রুচির মানহীন নাটক বা সিনেমা দেখতে বাধ্য করাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত, আমার বোধগম্য নয় .

এসব ছেড়ে ভালো মানের চলচিত্র নির্মাণে মনোযোগ দিন .

এই পৃথিবী এখন উন্মুক্ত আকাশের নিচে. আপনি টিভিতে অন্য সিরিয়াল না দেখালে, মানুষ ইন্টারনেটে দেখবে . 

মানুষের সাংস্কৃতিক রুচিবোধকে আবদ্ধ করার অধিকার কারোর নেই . এটা অন্যায়, জুলুম, জোর করে নিজের মাল খাওয়ানো .

আমার দেশের পণ্য আমি অবশ্যই নিবো এবং কিনবো ,যদি সে পণ্যটি মানশীল ভেজাল বিহীন ও ফরমালিন বিহীন হয় . এতটুকু অধিকার আমার আছে .


প্রবাসে রাজনীতি ও আমাদের নোংরা মানসিকতা লেখক,
সাইফুর রহমান সাগর
সংবাদকর্মী

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন