বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭ ০৫:২০:০১ পিএম

কথায় কথায় অস্ত্র বের করেন মেয়র মিরু: আহত ছাত্রলীগ নেতা বিজয়

রাজনীতি | সিরাজগঞ্জ | রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ | ১২:২০:৫৯ পিএম

ডান পা ও ডান হাতে ব্যান্ডেজ। বাঁ পায়ে বেশ কয়েকটি সেলাই। ডান হাতটি বুকে রেখে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) সিডি ওয়ার্ডের ১১ নম্বর বেডে শুয়ে রয়েছেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদ। তাকে ঘিরে রয়েছেন স্থানীয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। শাহজাদপুর পৌর মেয়র ও সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হালিমুল হক মিরুর ভাই পিন্টু গত বৃহস্পতিবার বিজয়কে বেদম পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেন। পরে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে মেয়রের গুলিতে নিহত হন সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুল।

গতকাল শনিবার দুপুরে পঙ্গু হাসপাতালে কথা হয় বিজয়ের সঙ্গে। তিনি জানান, মেয়র মিরু, তার ভাই পিন্টু ও মিন্টু কথায় কথায় অস্ত্র বের করেন। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস করেন না এলাকাবাসী।

বিজয় জানান, দুর্বৃত্তায়নের কারণে শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বেশিরভাগ নেতাকর্মী মেয়র মিরুর বিরুদ্ধে। পৌর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর মিরু ও তার ভাই পিন্টু-মিন্টু ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেন। গড়ে তোলেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। মিরুর পাশাপাশি ক্যাডার বাহিনীর অন্যতম নিয়ন্ত্রক তার ভাই পিন্টু। নিজের ভাইয়ের পক্ষে দলীয় সমর্থন বাড়াতে নেতাকর্মীদের নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করতেন তিনি। মাস চারেক আগে বিজয় মাহমুদকে তার সঙ্গে বৈঠকে বসার প্রস্তাব দেন পিন্টু। কিন্তু তাতে সাড়া দেননি তিনি। বিজয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ সদস্য হাসিবুর

রহমানের অনুসারী। এ ছাড়া বিজয়ের বাড়ি কান্দাপাড়ায় উপজেলা রোড (রবীন্দ্রসরণি) প্রায় এক বছর ধরে খোঁড়াখুঁড়ি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এ নিয়ে কিছুদিন আগে কান্দাপাড়াবাসীসহ বিজয় ও তার লোকজন মেয়রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। এসব কারণে বিজয়ের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন মেয়র ও তার ভাইয়েরা।

বিজয় জানান, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে উপজেলার মনিরামপুর কালিবাড়ী এলাকায় মৎস্য অফিসের সামনে একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। মিনিট পাঁচেক পর মোটরসাইকেল চালিয়ে আনুমানিক ২০ গজ এগিয়ে কালীবাড়ি মোড়ে গিয়ে যানজটে আটকা পড়েন বিজয়। এ সময় মেয়র মিরুর ভাই পিন্টু পেছন দিক থেকে ছুটে এসে লাথি মেরে তাকে মোটরসাইকেল থেকে ফেলে দেন। এরপর পিন্টুর ১০-১২ জন ক্যাডার এসে জামার কলার ধরে তাকে টেনেহিঁচড়ে মাইক্রোবাসে ওঠায়। মাইক্রোবাসে করে পাশেই মেয়রের বাড়ির মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। বিজয় বলেন, সেসময় মেয়র বাড়িতেই ছিলেন। মেয়রের সঙ্গে ১০-১২ জন ছিলেন, তাদের অনেকের বাড়ি পাবনায়। বাড়ির পেছনে খোলা জায়গায় নিয়ে বিজয়ের মাথায় দু'জন দুটি পিস্তল ঠেকিয়ে রাখে এবং প্রথমেই পিন্টু লোহার পাইপ দিয়ে ডান পায়ে একের পর এক আঘাত করেন। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন বিজয়। এর পরই পিন্টু ও মিন্টুসহ ১৮-২০ জন তাকে রড, হকিস্টিক ও লোহার পাইপ দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকেন। বিজয় বলেন, মারধরের সময় পিন্টু বলছিলেন, 'অনেকদিন ধরে তোকে খুঁজছি। সুযোগ মতো পাওয়া যাচ্ছিল না। আজ তোকে হাতে পেয়েছি। তোর হাড়গোড় আলাদা করে দেব।' প্রায় আধঘণ্টা পর আহত অবস্থায় বিজয়কে একটি ভ্যানগাড়িতে ওঠায় পিন্টুর লোকজন। বিজয়কে তার ভগি্নপতি পৌর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সভাপতি আবদুর রহিমের বাড়ির সামনে ফেলে আসার জন্য ভ্যানচালককে নির্দেশ দেন পিন্টু। ভ্যানচালক তাকে রহিমের বাড়ির সামনে নিয়ে যান, তখন আনুমানিক দুপুর সোয়া ২টা।

পঙ্গু হাসপাতালে বিজয়ের পাশে থাকা তার অনুসারীরা জানান, বিজয়কে মারধরের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিকেল ৩টার দিকে তার পক্ষের আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ নেতাকর্মী এবং স্থানীয় লোকজন ও কলেজের ছাত্ররা জোটবেঁেধ মহাসড়ক অবরোধ করে। তাদের একটি অংশ পরে মনিরামপুরে মেয়রের বাড়ি ঘেরাও করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এমন কিছুর আশঙ্কায় আগেই নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীকে প্রস্তুত রেখেছিলেন মেয়র। তারা বিজয় সমর্থকদের ধাওয়া করে। মেয়র মিরু নিজেও শটগান দিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে ছুটে আসেন। সেই দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করছিলেন সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুল। ক্যামেরা তাক করা দেখে শিমুলের ওপর গুলি চালান মেয়র। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শিমুল। বগুড়ায় প্রাথমিক চিকিৎসার পর শুক্রবার দুপুরে ঢাকায় নেওয়ার পথে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

এদিকে হাত ও পা ভাঙা অবস্থায় প্রথমে বিজয়কে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে বৃহস্পতিবার রাতেই ঢাকায় এনে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে।তথ্যসূত্র:সমকাল।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন