বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ০২:২৯:৩৫ পিএম

লালমাই পাহাড়ের আর্তনাদঃ সাইফুর রহমান সাগর

Shaifur Rahman | সম্পাদকীয় | রবিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ | ১১:৩৪:১৯ পিএম

কুমিল্লা কেনো বিখ্যাত, প্রশ্নে একটাই উত্তর আসবে আর তা হলো, লালমাই ময়নামতি পাহাড়। 

 যদিও লালমাই পাহাড় বলতে আমরা পাহাড়ের মতো দেখতে আকারে ছোট টিলাকেই পাহাড় বলি। 


প্রকৃতপক্ষে এগুলি পাহাড় নয়, সাধারনত পাহাড়ের আয়তন হয়ে থাকে বিশালাকার ও সুউচ্চ।

আমাদের দেশে পাহাড়ি অঞ্চল আছে অনেক, যার মধ্যে পার্বত্য অঞ্চল উল্লেখযোগ্য।

পাহাড়ে জনমানবের চলাচল অনেকটাই সীমিত থাকে।

পাহাড়ি দুর্গমতার কারণে  নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক অনিরাপদ অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

 তাই বিশ্ব্বের বেশির ভাগ পাহাড়ি অঞ্চলে, বিশেষ করে পাহাড়ের উপরিভাগ মানবশূন্য থাকে।


কিন্তু এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের নেশা এবং মনোমুগ্ধকর পরিবেশ, সবুজের গন্ধ, মানব গুষ্ঠিকে বার বার টেনে নিয়ে যায় পাহাড়ের কাছে।

মানবকুলের প্রিয়তম জায়গা গুলির মাঝে সমুদ্র এবং পাহাড়ি প্রকৃতি সর্বাগ্রে অবস্থান করে আছে মানুষের প্রানে।


মানসিক আনন্দদায়ক প্রাকৃতিক রূপে ভরা মুগ্ধকর পরিবেশ আছে পাহাড় থেকে কিছুটা ছোট, যাকে আমরা টিলা বলে চিনি. যেখানে মানুষের আরোহণ পাহাড়ের চাইতেও সহজতর।

পৃথিবীতে পাহাড়ের সংখ্যা অনেক বেশি হলেও, টিলার সংখ্যা অনেক কম।

বেশিরভাগ দেশেই আকাশচুম্বী পাহাড়কে কেটে টিলা বা ছোট পাহাড়ের মতো বানাতে শত শত বছর কাটিয়ে দেয়। 


শুধু মাত্র মানুষের সাময়িক অবকাশ মেটানোর জন্য তৈরি করা হয় এইসব পর্যটক আকর্ষণীয় ছোট পাহাড়। 
তবে সবার আগে পরিবেশের ক্ষতির দিকে লক্ষ্য রেখে এবং ভারসাম্য সঠিক রেখেই এই ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়।


সৌভাগ্যবশত আমাদের দেশে মানবআরোহণ ও নিরাপদ উচ্চতার টিলা একমাত্র কুমিল্লার লালমাইতে আছে। শত শত টিলার এক অপরূপ সন্নিবেশন লালমাই ময়নামতিতে। নিরাপদ ভোগলিক অবস্থানের কারনে দূর দুরান্ত থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আসে এখানে অবকাশকালিন সময় কাটাতে ।


কিন্তু এখানকার পরিবেশ অনুকূলে না থাকার কারণে আজো লালমাই পাহাড় অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে ।

পাহাড়কে ধরণীধর বলা হয়, মানে হলো ধরণীকে যে ধরে রাখে। সৃষ্টির এই বিশালাকার ধরণীর স্তম্ভ হলো পাহাড় বা পর্বত। 
প্রকৃতির নিষ্ঠুর ভূকম্পন থেকে রক্ষা করে থাকে এই পাহাড় এবং টিলা ।

বিজ্ঞানীরা অনেক ভাবে প্রমান করেছে, ভূপৃষ্ঠকে ধরে রাখার পেছনে পাহাড়ের অবদান অপরিসীম।

আমার আজকে লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়টি পাহাড় হবার পেছনে বিশেষ কারণ রয়েছে। 


বাংলাদেশে খুব কমসংখক এলাকা জুড়ে রয়েছে পাহাড়।

দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ পূর্ণ দেশ হিসেবে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান. যে কোন বড় ধরণের জলোচ্ছ্বাস ও ভুমিকম্পে তলিয়ে যাবে আমাদের এই অঞ্চল । এমন পূর্বাভাস অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা বার বার দিয়ে যাচ্ছে।


পৃথিবী ব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনে যেখানে কোটি কোটি ডলারের প্রজেক্ট হাতে নিচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশে প্রকৃতির লীলাভূমি ও ভূপৃষ্ঠ রক্ষাকারী পাহাড়কে নিয়মিত নিঃশেষ করা হচ্ছে।

ছোট পাহাড়ের অঞ্চল কুমিল্লা লালমাই ময়নামতি পাহাড় ঘেরা এই অঞ্চলটিকে ভৌগোলিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয় শুধুমাত্র পাহাড়ের জন্য।


কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে এই পাহাড় এবং টিলা গুলোকে কেটে টুকরা টুকরা করে চলেছে ভুমিদস্যু ও মাটি বিক্রেতারা।

পাহাড় কেটে সমান্তরাল করে আবার সেই জমি বিক্রি করছে সেখানকার ভূমিদস্যুরা।


পাহাড়ের প্রয়োজনীয়তা না জানার কারণে হাজার হাজার একর পাহাড়ি উচুঁ এলাকা প্রতিনিয়ত কেটে কেটে সমান্তরাল করছে স্বার্থান্বেষী মহল।

রাজনৈতিক আশীর্বাদে যারা এই সম্পদ দেখার দায়িত্বে রয়েছে, তারাই ভোগ করছে এই অপকর্মের আর্থিক সুবিধা ।


প্রশাসনিক ভাবে আদালত থেকে পাহাড় না কাটার নির্দেশনা থাকলেও, মানছেনা কেউই ।

পাহাড়ে আশ্রিত মানুষ সেই পাহাড়কে কেটে তার বুকে তৈরী করছে বাড়ি ঘর।

এভাবে চলতে থাকলে খুব নিকট ভবিষ্যতে আমরা পুরো লালমাই পাহাড়ের সমাধিস্থল দেখতে পাবো।

একদল স্থানীয় ও চিহ্নিত পাহাড় দস্যুদের যদি এখুনি বাঁধা না দেয়া হয়, তাহলে অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে লালমাইয়ের বাকি টুকু পাহাড়ি অঞ্চল।


সরকারের সু-দৃষ্টি না দেয়া হলে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক ভাবে আরো বেশি হুমকির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে নিঃস্বন্দেহে।

পাশাপাশি এই এলাকাটিকে সরকারের বনবিভাগের আওতাধীন এনে, বিশাল বনায়নের সম্ভাবনাময়ী এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।


লালমাটির বিলুপ্তপ্রায় অঞ্চলটিকে রক্ষা করা সরকারের নৈতিক ও প্রাকৃতিক দায়িত্ব বলে আমি মনে করি.
বিশ্ব জলবায়ু শর্তানুযায়ী লালমাইকে বন ও পরিবেশ রক্ষার আওতাধীন এনে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

যারা এই প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করছে, তাদের বোঝাতে হবে এই পাহাড় কারো মালিকানা সম্পদ নয়. এইসব এলাকা সম্পূর্ণ সরকারি ও মানবসম্পদ।


এই পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ।

এই এলাকাকে ধ্বংস করা মানে নিজের প্রজন্মকে ধ্বংস করা।

শুধুমাত্র সাময়িক সামান্য অর্থের লোভে যে কাজটি করা হচ্ছে. তা কখনো হাজার গুন্ অর্থ ব্যয় করেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবেনা।

পাহাড় দস্যুদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির বিধান রেখে কঠিন ভাবে আইন প্রনয়ন এখন সময়ের দাবী।


তাই আসুন সবাই মিলে আমাদের লালমাইকে সব দিক থেকে রক্ষা করি, আগামী দিনের শিশুদের একটি সবুজ পাহাড় ঘেরা লিলাভুমি অর্পণ করে যাই।

সবুজ বেঁচে থাকুক আমাদের শিশুদের মাঝে।

সাইফুর রহমান সাগর
সাংবাদিক ও লেখক



খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন