বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭ ০৩:২৪:০৭ এএম

কুমিল্লা নামে বিভাগ চাই, কেনো ময়নামতি নামে নয়!

সাইফুর রহমান সাগর | সম্পাদকীয় | শুক্রবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ | ০৬:১০:৫৬ পিএম

 অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, আমাকেও ফেসবুক থেকে অনেক বন্ধু জিজ্ঞাসা করেছে একই প্রশ্ন, বিভাগ ময়নামতি নামে হলে সমস্যা কি?

আজকে আমি আমার ব্যক্তিগত কিছু মতামত দেয়ার চেষ্টা করছি এই বিষয়ের উপর, কুমিল্লা নামে চাই, কেন ময়নামতি নয়।

যারা "ময়নামতি হলে সমস্যা কি" জানতে চেয়েছেন, তারা কি একবারও নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, ময়নামতি না হয়ে কুমিল্লা হলে সমস্যা কি, যেখানে দীর্ঘদিন কুমিল্লার মানুষের দাবী কুমিল্লার নামে হবে বিভাগ ??

আমি জানি কুমিল্লা নাম না হয়ে ময়নামতি নামটি থাকুক, এটা চাচ্ছে শুধুমাত্র ৪টি এলাকার মানুষ সারা বাংলাদেশের মধ্যে।

১. ময়নামতি ইউনিয়নের মানুষ ( কারণ তাদের ইউনিয়নের নামে )

২. নোয়াখালীর মানুষ ( কারণ তারা চায়না কুমিল্লার নামের নিচে তারা থাকুক)

৩. ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ( তারাও নোয়াখালীর মতোই অনেকটা, কুমিল্লা নাম টা না হলেই ভালো)

৪. চাঁদপুর ( একই ভাবে, আগের ২ জেলার মানুষ যেভাবে চেয়েছে )
শুধুমাত্র কুমিল্লার জেলার মানুষ সহ সারা বাংলাদেশের মানুষ চায় কুমিল্লা নামেই জেলা হোক।

দুঃখজনক হলেও সত্য,কুমিল্লা না হোক ওই ৪ জেলার মানুষের চাওয়া গুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও প্রতিহিংসাপরায়ণ।

অথচ এই ৪টি জেলাই ১৮৮১ সাল পর্যন্ত একই পরিবারের মানুষ ছিলো. বৃহত্তর কুমিল্লাতেই এই ৪টি জেলা ছিল।

পরবর্তীতে নোয়াখালীকে আলাদা করে দিয়ে বাকি ৩ জেলা নিয়েই বৃহত্তর কুমিল্লা ছিলো, পরবর্তীতে,ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ও সর্বশেষ ১৯৮৪ সালে চাঁদপুরকে আলাদা করা হয়েছিলো।

কুমিল্লা তখন থেকেই ষড়যন্ত্রের শিকার হতে শুরু করেছে।

একটা পরিবারের কোনো সদস্যকে যখন আলাদা করে দেয়া হয়, অন্যরা সুযোগ নেয় নিজেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করার।

সেই বিরোধের জেরেই, কুমিল্লাকে চাকরির কোটার আওতায় আনলো এরশাদ সাহেব।
একটা সময় ছিল বাংলাদেশের প্রতিটা দপ্তরে এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কুমিল্লার মানুষের অবস্থান এবং সংখ্যায় সবচে বেশি, কারণ বাংলাদেশে শিক্ষিতের হার সব সময় কুমিল্লাতেই বেশি ছিল।

কুমিল্লার মানুষের চাকরি থেকে দূরে রাখার জন্য এই কোটা ভিত্তিক চাকুরী সিস্টেম শুরু করেছিলো তৎকালীন সরকার।

তখন থেকেই কুমিল্লাতে শিক্ষিত বেকারের হার হু হু করে বাড়তে থাকলো।
দেশীয় চাকুরী ব্যবস্থাতে কুমিল্লার অবস্থান অনেক নিচে আসতে শুরু করলো।
সরকারি চাকুরী সোনার হরিনের মতো হয়ে গেলো কুমিল্লার মানুষের জন্য।

যখন দেশের বাজারে কুমিল্লার অবস্থান শূন্যে, তখনি কুমিল্লার সকল শ্রেণী পেশার মানুষ যুবক, বৃদ্ধ, ছাত্র ,অর্ধ শিক্ষিত , ও উচ্চ শিক্ষিতরাও সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে পাড়ি দিতে লাগলেন দেশের বাইরে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে।

জীবিকার তাগিদে, সংসারের প্রয়োজনে জীবনের সবচে আনন্দের সময় গুলি হাসি মুখে বিসর্জন দিয়ে জীবন সংগ্রাম করে চলেছেন, কুমিল্লার লক্ষ লক্ষ মানুষেরা।
আজ বাংলাদেশ গর্ব করছে দেশের উন্নতি নিয়ে, গর্ব করছে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে, আর এসব গর্বের পেছনে যাদের অবদান তাদেরকে ভুলে গেছেন আজকের সরকার।

বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ বৈদেশিক মুদ্রা আসে কুমিল্লার মানুষের ঘামে ঝরা রেমিটেন্স থেকে।

কুমিল্লার উন্নতির পেছনে কুমিল্লার মানুষের নিজেদের প্রেরিত অর্থেই চলে কুমিল্লার অনেক উন্নয়ন। ব্যক্তিগত উদ্দ্যেগেই তৈরী হয়েছে অনেক রাস্তা ঘাট, মসজিদ মন্দির।
কুমিল্লার মানুষের অর্থেই তৈরী হয় আজকের বাংলাদেশের কয়েক লক্ষ কোটি টাকার বাজেট, সেই বাজেটে পূরণ হয় বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বপ্ন।
এবার আসি ময়নামতি প্রসঙ্গে, ময়নামতি একটি ইতিহাস মাত্র. ময়নামতি যদি আমাদের. এতো গুরুত্বপূর্ণ হতো তাহলে ত্রিপুরার পর কুমিল্লার নাম ময়নামতিই হতো।

ময়নামতি যেমন আদি এবং ঐতিহাসিক, তেমনি লালমাই, চন্ডিমুড়া,বিজয়পুর, একই ছন্দে ঐতিহাসিক ও বিখ্যাত। তাই বলে ওইসব নামে কি কুমিল্লার নাম পরিবর্তন করে রাখার প্রয়োজন আছে?

ময়নামতি আমাদের অবিচ্ছেদ্য একই অনস্বীকার্য্য অংশ. কিন্তু আমাদের দীর্ঘদিনের দাবিটি ময়নামতি নিয়ে নয়, দাবিটি ছিল কুমিল্লার নাম নিয়ে।

আমাদের কুমিল্লার সাধারণ মানুষের তেমন বেশি বিভাগীয় দাপ্তরিক কাজের প্রয়োজন হয়না, কারণ কুমিল্লার ৬০ শতাংশ মানুষ প্রবাসী আয়ের উপর নির্ভরশীল।কুমিল্লার মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজধানি মুখী তাই দপ্তর কোথায় হলো সেটি অতি গুরত্ত বহন করেনা কুমিল্লার মানুষের কাছে।

নামটি ঠিক রেখে দপ্তরটি ময়নামতিতে হলেও আমাদের আপত্তি ছিলোন। কারণ আমরা আমাদের কুমিল্লার নামে বিভাগ চাই।

এবার আসি নোয়াখালীর দাবির প্রসঙ্গে।

বিভাগীয় দপ্তর অথবা, জেলার প্রয়োজনগুলি নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের উপরে।
যেমন, লোকসংখ্যা, ভুগলিক অবস্থান, আয়তন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।

এই সব গুলি প্রয়োজনের মধ্যে কোনটাতেই নোয়াখালীর পক্ষে যুক্তিযুক্ত কারণ নেই বিভাগীয় দপ্তর হওয়ার।

নোয়াখালী দেশের একদম শেষ ভাগে, যা কুমিল্লা থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিনে। নোয়াখালীর পর বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত এলাকা হিসেবে নোয়াখালী ১ নাম্বারে।

রাজধানিতে আসার জন্য একমাত্র রেলপথ ও সড়ক পথ কুমিল্লাকেই ব্যবহার করতে হয় নোয়াখালীর মানুষের। যে ৪টি জেলা নিয়ে বিভাগ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে কুমিল্লা সব গুলি জেলার মধ্যবর্তী স্থানে।

এবার আসি খোন্দকার মোস্তাক প্রসঙ্গে বাংলাদেশের জনক ও স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম খুনির বাড়ি কুমিল্লায়। এই কারনেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রি কুমিল্লার নাম বাদ দিয়ে ময়নামতি দিতে বলেছেন, এমন একটা কথা বা চতুরতা অবলম্বন করছেন অনেকেই, প্রধানমন্ত্রীর নামে।

আমার বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী এমন ধরণের ইচ্ছা করার কোন যুক্তি আছে বলে মনে করিনা। কারণ একজন প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা থাকেই মানুষের ইচ্ছার উপর। প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই জানেন কুমিল্লার মানুষ দীর্ঘদিন, যুগ যুগ কুমিল্লাকে বিভাগ করার দাবী জানিয়ে আসছেন।

মোস্তাকের প্রতি কুমিল্লার মানুষের ঘৃণা বিভিন্ন ভাবেই প্রকাশ করেছে কুমিল্লার মানুষ, তা প্রধানমন্ত্রী জানেন। তাছাড়া এই খুনির নাম বা তার সকল সৃতি মুছে ফেললে, আমাদের প্রজন্ম কিভাবে জানবে বঙ্গবন্ধুর খুনি কারা ছিল, মোস্তাকের বাড়ি কোথায় ছিল, কি অবস্থায় আছে তার বাড়ি ঘর, কি পরিনতি হয়েছিলো তার।
এগুলি পরের প্রজন্ম না দেখলে, এদেশে আরও মোস্তাকের জন্ম হতে পারে। তাই খুনির পরিনতি জানাতে হলে আমাদের মোস্তাকের পরিনতিও রাখতে হবে।

মোস্তাকের কারনে যদি কুমিল্লার নাম পরিবর্তিত হয়, তাহলে বর্তমানে কুমিল্লার সব মানুষকেই মোস্তাকের মতো করে দেখছেন প্রধামন্ত্রি, এটাই আমাদের মানতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে কুমিল্লার মানুষের একটাই দাবী, আপনিতো কলমের একটা খোঁচা দিয়েই শব পরিবর্তন করে ফেলবেন। কিন্তু এই খোঁচাটি কুমিল্লার কোটি মানুষের প্রানে কতোটুকু রক্ত ঝরাবে তা হয়তো আপনাকে কেউ বুঝাইয়নি।

আপনাকে বুঝালে আপনি নিশ্চয় বুঝতেন। কিন্তু অসহায় আমরা, কারণ আপনার চারপাশের মানুষ গুলো কুমিল্লার আপন নয়। কুমিল্লা তাঁদের না হলেও চলবে। আপনি আসুন কুমিল্লায়, কুমিল্লার মানুষের সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞাসা করুন। হা,না ভোট দিন। এর পর সিদ্ধান্ত নিন।

আমরা মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, আপনি-ই পারেন, লালমাই এবং কুমিল্লার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। আপনার সেই যোগ্যতা আছে।

আমরা আপনার পাশে আছি, কুমিল্লার মানুষ আপনার পাশে আছে। আর তা যদি না করতে পারেন, কুমিল্লার মানুষ ও কুমিল্লার ইতিহাস আপনাকে ক্ষমা করবেনা।
আমরা ষড়যন্ত্রের কাছে আর হার মানতে রাজি নই। আমরা আমাদের অধিকার আদায়ে সমগ্র কুমিল্লার মানুষ ব্রত।

সবাইকে অনুরোধ করবো পোস্ট টি নিজেদের ওয়ালে শেয়ার করে অন্যকে জানিয়ে দিন।

সাইফুর রহমান সাগর
সাংবাদিক ও লেখক এবং কুমিল্লার সন্তান
কো-অরডিনেটর
" ময়নামতি নয়, কুমিল্লা নামেই বিভাগ চাই"
" আমরা কুমিল্লা"
আমাদের ফেসবুক গ্রুপে অংশগ্রহণ করতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন।
https://www.facebook.com/groups/wedemandcomillaback/

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন