রবিবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৭ ১১:১৫:৫৫ এএম

এমপি কেয়ার প্রচেষ্টায় বেরিয়ে এলো সৌদিতে যৌনদাসত্বের ভয়াবহ চিত্র !

নবীগঞ্জ সংবাদদাতা | জেলার খবর | হবিগঞ্জ | শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ | ১২:৫২:৩৮ পিএম

‘আম্মা আম্মা গো, আমারে বাঁচাও। আমারে বেইজ্জতি থাইকা বাঁচাও। আমি পেট লইয়া দেশে আইতাম না খালি পেটে আইতাম’। ‘বাবা আমাকে বাঁচাও’। সৌদি আরব থেকে মোবাইল ফোনে মা-বাবার কাছে এমনই আকুতি জানিয়েছিলো নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের কায়স্থ গ্রামের এবাদ আলীর কন্যা।

দরিদ্র পিতা-মাতার মুখে হাসি ফুটাতে দালালের খপ্পরে পড়ে গত ৬ ডিসেম্বর সে গৃহকর্মীর চাকুরী নিয়ে সৌদি আরবের দাম্মামে যায়। এরপর তার উপর শুরু হয় শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতন। সেখানকার দালাল তাকে টাকার বিনিময়ে তিন/চার দিনের জন্য একেকজন আরব নাগরিকের কাছে ভাড়া দেয়। তখন শুরু হয় তার উপর পাশবিক নির্যাতন। বিষয়টি টেলিফোনে মা-বাবাকে জানিয়ে তাকে উদ্ধার করার আকুতি জানায় মেয়েটি।

পাশাপাশি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ নেতাদের কাছে যাওয়ারও পরামর্শ দেয় সে। মেয়েটির দরিদ্র মা-বাবা নেতাদের কাছে টেলিফোনের কথাবার্তার আধাঘন্টার রেকর্ড নিয়ে দৌঁড়ালে তারা তাদেরকে ম্যান পাওয়ারের মামলা দিতে বলেন।

এ ব্যাপারে মামলা দিলে দালাল চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে এবং সৌদি আরবে মেয়েটির কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে যায়। পরে কোন উপায় না পেয়ে মেয়েটির মা-বাবা ও আত্মীয় স্বজন ছুটে যান হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর কাছে।

গত বুধবার দুপুরে সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি কেয়া চৌধুরীর প্রচেষ্টায় সিআইডি পুলিশ ঢাকা নয়াপল্টনের এলাকার গ্রীণ বেঙ্গল ইন্টান্যাশনাল লিঃ ট্রাভেল এজেন্সী থেকে দালাল চক্রের ৩ সদস্যকে আটক করে।

আটককৃতরা হলো গ্রীণ বেঙ্গল ইন্টান্যাশনাল লিঃ-এর জেনারেল ম্যানেজার মো. শাহজানুর রহমান, পরিচালক এরশাদ উল্লাহ ও আবু তাহের। তাদের মধ্যে আবু তাহের শায়েস্তাগঞ্জ পৌর এলাকার রমিজ আলীর ছেলে, শাহজানুর রহমান ফেনী জেলার সোনাগাজী থানার বাগদানা গ্রামের মৃত সিরাজুর রহমানের ছেলে ও এরশাদ উল্লাহ কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কাতালিয়ার মৃত আব্দুল হাকিমের ছেলে।

তাদেরকে আটকের সময় গ্রীণ বেঙ্গল ইন্টান্যাশনাল লিঃ ট্রাভেল এজেন্সী থেকে চুনারুঘাটের এক কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়। ফলে বিদেশে পাচার হওয়া থেকে রক্ষা পায় মেয়েটি। তাদেরকে গ্রেফতারের পর তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সিআইডি পুলিশ গতকাল বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে মেয়েটিকে উদ্ধার করে। এ সময় সৌদি আরবে এক দালালকেও আটক করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকার নয়াপল্টনের রিক্রুটিং এজেন্সি গ্রীণ বেঙ্গলের কর্ণধার জাকির হোসেন পাটোয়ারী দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যুবতী নারীদেরকে সংগ্রহ করে সৌদি আরবে পাঠায়। তার দালাল শেকুল আহমেদ নবীগঞ্জের কায়স্থগ্রাম থেকে যে মেয়েটিকে সৌদি আরবে পাচার করেছে সেই মেয়েটির পরিবারকে প্রলোভন দেয়- সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে গেলে মাসে ২০ হাজার টাকা বেতন, বছরে একবার দেশে আসার সুযোগ ও ঈদ বোনাস পাওয়া যাবে। প্রলোভনে রাজি হলে দালাল শেকুল আহমদে মেয়েটির পাসপোর্ট করে তাকে ঢাকায় এক মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে সৌদি আরবে পাঠায়। সেখানে যাওয়ার পর থেকে মেয়েটির ওপর নির্যাতন শুরু হয়।

এমপি কেয়া চৌধুরী জানান, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মেয়েটির মা-বাবা তার কাছে আসে। টেলিফোনে রেকর্ড হওয়া মেয়েটির কথা শুনে তিনি আৎকে উঠেন। তিনি তাদেরকে মামলা করার পরামর্শ দিলে ১৪ ফেব্রুয়ারি নবীগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করে মেয়েটির পরিবার। পরে তিনি সেই অডিও টেপ নেন নিজের মোবাইলে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর সাথে। পরে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্রের পরামর্শে ঢাকায় সিআইডির সাথে যোগাযোগ করলে সিআইডির কর্মকর্তা শাহ আলম গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তিন দালালকে গ্রেপ্তার করেন।

এ সময় পাচারের অপেক্ষায় থাকা চুনারুঘাটের জারুলিয়া গ্রামের দিনমঞ্জুর গাবরু মিয়ার কিশোরী কন্যাকে উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা হয় ২৫টি পাসপোর্ট, রেজিস্ট্রার খাতা ও মোবাইল নাম্বার। পাশাপাশি সিআইডি সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় নবীগঞ্জের কায়স্থগ্রাম থেকে পাচার হওয়া মেয়েটিকে উদ্ধার করে এবং সেখানকার এক দালালকেও আটক করে।

মোবাইলে রেকর্ড করা কায়স্থগ্রামের মেয়েটির কথা থেকে জানা যায়, হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানের ১৯ নারী এক সাথে বন্দী রয়েছে। তাদেরকে কয়েকদিনের জন্য একেকজন সৌদি নাগরিকের কাছে ভাড়া দেয়া হয়। সেখানে তাদের উপার্জিত টাকা দালালরা নিয়ে যায়। কেউ কোন কথা বললে তাকে কিল-ঘুসি-লাথি মেরে আঘাত করা হয়। কথোপকথনের এক পর্যায়ে কায়স্থগ্রামের মেয়েটি তার বাবাকে বলে ‘বাবা আমাকে বাঁচাও। যেভাবে পার আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে নেয়ার ব্যবস্থা কর’। মায়ের সাথে কথা বলার সময় সে মাকে বলে- ‘আম্মা, আম্মাগো আমারে বাঁচাও। সেকুল আমারে দালালের কাছে বেঁচে দিয়েছে। দাম্মামে একটি ঘরে আমাদের আটকে রাখা হয়। এছাড়া একেক দিন একেক বাড়িতে পাঠানো হয়। আম্মা আমারে যদি জীবিত দেখতে চাও তাহলে তাড়াতাড়ি আমারে দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো। ওরা আমাকে মেরে-ধরে শেষ করে দিচ্ছে। বেইজ্জত করছে। এখন যে বাড়িতে আছি ওই বাড়ির মহিলারে বলে তোমাদের কাছে ফোন করছি। আর হয়তো ফোন করতে পারবো না। দ্রুত আমাকে দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো। কল্পনা বলেন, আম্মাগো ওরা জানোয়ার।

এরপর তার বাবার সঙ্গে কথা বলেন, ‘আব্বা আমাকে বাঁচাইবানি। আব্বা আমারে বাঁচাইলে সেকুলের বাড়ি যাও। ওরে বলো আমারে ফিরাইয়া আনতে। দুইদিনের মধ্যে যদি আমাকে দেশে না নিতে পারো তাহলে আমারে আর খুঁজে পাবে না। সেকুল কণ্ট্রাক করে আমাদের বিদেশ পাঠাইছে। আমাদের বিভিন্ন বাড়িতে পাঠায় আর টাকা নেয় কফিল। আমাকে দেশে না নিলে ফাঁস দিয়ে মরবো। একেক বাড়ি থেকে নিয়ে আমাদের রাখে ওদের অফিসে। ওটা একটা যমঘর। খাওন দেয় না। একটা রুটি ঢিল মারে। ওইটা খাইয়া থাকতে হয়। তোমরা যদি আমারে দেখতে চাও তাহলে তাড়াতাড়ি দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো।’ টানা ৩১ মিনিটের ওই টেলিফোন কথাবার্তায় বেশির ভাগ সময়ই কল্পনা হাউ মাউ করে কেঁদেছেন। আর তাকে উদ্ধারের আকুতি জানিয়েছেন।

এমপি কেয়া চৌধুরী আরও জানান, সৌদি আরবে এ ধরণের পাচার হওয়া মেয়েদের উদ্ধারে চেষ্টা চালাচ্ছে সিআইডি।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির উপ-পুলিশ পরিদর্শক সুমান মালাকার জানান, বুধবার দুপুরে ঢাকার নয়াপল্টনে অভিযান চালিয়ে গ্রীণ বেঙ্গল ইন্টান্যাশনাল লিঃ ট্রাভেল এজেন্সী থেকে আবু তাহের, মো. শাহজানুর রহমান ও এরশাদ উল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়।

এ সময় চুনারুঘাটের জারুলিয়া গ্রামের এক মেয়েকে উদ্ধার করা হয়। রাতে গ্রেফতারকৃতদের হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তাদেরকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। সেই সাথে উদ্ধারকৃত মেয়েটির জবানবন্দি গ্রহণ করেন বিচারক।

জবানবন্দি গ্রহণের পর মেয়েটিকে তার বাবা-মার জিম্মায় দেয়া হয়। উদ্ধারকৃত মেয়েটির বাবা জানান, একই উপজেলার ছনখলা গ্রামের এয়াকুব মিয়া ও শাহজাহান মিয়ার মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে তার মেয়েকে সৌদি আরব পাঠানোর জন্য বায়না করেন। এ হিসেবে দালাল এয়াকুব মিয়াকে তিনি ৩০ হাজার টাকা দেন। মঙ্গলবার রাতে ইয়াকুব মিয়া মেয়েটির মেডিকেল সম্পন্নের জন্য ঢাকায় নিয়ে যায়।

তিনি আরো জানান, মেয়েটির প্রাপ্ত বয়স ১৭ হলেও পাসপোর্টে তার বয়স ২৮ বছর দেখানো হয়। এছাড়া দালালরা তাকে আরেকজনের বিবাহিতা স্ত্রী হিসেবে দেখায়। গাবরু মিয়া জানান, ইয়াকুব মিয়া দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আদম ব্যবসা করছে। তার মাধ্যমে তার বড় মেয়েও দুবাইতে গিয়েছিল। সে সেখানে থেকে ভাল আয়-ইনকাম করেছে। এ ঘটনার পর থেকে দালাল ইয়াকুব এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন