মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭ ০৪:১৫:০৪ পিএম

সিলেটে ব্যবসায়ী সাফল্যের ‘রোল মডেল’ মোসাব্বির আল মাসুদ

সৌরভ আদিত্য | জেলার খবর | মেীলভীবাজার | বুধবার, ১ মার্চ ২০১৭ | ০৫:১৪:১৯ পিএম

পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। এই প্রবাদের বাস্তব উদাহরন শ্রীমঙ্গলের মোসাব্বির আল মাসুদ। তিনি ১৯৮৪ সালে মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে খামার ব্যবসা শুরু করেণ। আজ তিনি বৃহত্তর সিলেটে ব্যবসায়ী সাফল্যের বরপুত্র বা রোল মডেল হিসেবে পরিচিত।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওর সংলগ্ন নোয়াগাঁও গ্রামে তিনি সযত্নে গড়ে তুলেছেন ‘আল মাসুদ ফিশারী এন্ড ডেইরী’। এলাকার আমিষ ও প্রোটিনের কিয়দংশ যোগান দিচ্ছে ৬০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এ প্রকল্প। প্রকল্পের মাধ্যমে মোসাব্বির আল মাসুদ নিজে যেমন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বি হয়েছেন তেমনি এলাকার শতাধিক দরিদ্র বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পটি আরো বর্ধিতকরণের কাজ চলছে, যা অব্যাহত রয়েছে। সেটি সম্পন্ন হলে প্রকল্পে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে তিনি জানান।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত হাইল হাওর পাড়ের নোয়াগাঁও গ্রামে অবস্থিত ‘আল মাসুদ ফিশারী এন্ড ডেইরী’-তে মাছ চাষের জন্য রয়েছে ৩৩টি বিশালাকার পুকুর, ১০০টি শংকর প্রজাতির গরুর খামার, ২টি দেশীয় ও ৪টি লাল জাতের মুরগীর খামার যাতে রয়েছে ১৪ হাজার মোরগ, রয়েছে বায়োগ্যাস প্লান্ট, সবজির খামার।

বৃহত্তর সিলেটে একমাত্র এ প্রকল্পেই পুকুরে হচ্ছে দেশীয় পাবদা মাছের চাষ। এছাড়া দেশীয় মাগুর, গুলাইয়াও চাষ হচ্ছে। পুকুরে মাছের খাদ্য তৈরি হচ্ছে প্রকল্পেই। মোরগের বিষ্ঠা, গোবর, খৈল, ভূষি, অচোগুড়া, লবন মিশিয়ে প্রকল্পের কর্মচারীরাই মাছের খাবার তৈরি করছেন।

আল মাসুদ ফিশারী এন্ড ডেইরীর স্বত্ত্বাধীকারী মোসাব্বির আল মাসুদ জানান- ১৯৮৪ সালে মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি মুরগীর খামার গড়ে তুলেন। কঠোর পরিশ্রম, সফল হবার জন্য প্রচন্ড জেদ তাকে ধীরে ধীরে ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। প্রথম দিকে দিনের বেলা খামারের মোরগের পরিচর্চা ও রাতের বেশীরভাগ সময় পাহাড়া তিনি নিজেই দিয়েছেন। যখন কয়েক ধাপে সফলতা আসে তখন একজন কর্মচারী নিয়োগ দেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে খামারের পরিধি।

২০১১ সালে ৩নং শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের হাইল হাওর পাদদেশে নোয়াগাঁও গ্রামে কিছু জমি ক্রয় করে গড়ে তুলেন ফিশারী। গত পাঁচ বছরে তিনি কঠোর পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের সফল ফিশারীর রোল মডেলে পরিণত হন।এ প্রকল্পে প্রতি বছর গড়ে ৫ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে। মুরগীর খামারে প্রতিদিন গড়ে ৭ হাজার ডিম উৎপাদন হচ্ছে। প্রতিটি ডিমের বর্তমান বাজার মূল্য ৮ টাকা করে মোট প্রতিদিন ৫৬ হাজার টাকার ডিম বিক্রি হচ্ছে। ১০০টি শংকর প্রজাতির গরু থেকে প্রতিদিন দুধ উৎপাদন হচ্ছে ১৪০ লিটার। এ দুধ থেকে এখানেই ছানা, ক্রীম ও ঘি তৈরি করা হচ্ছে। আরো ৩০০টি গরুর সেড তৈরির কাজ চলছে। কয়েকদিনের মধ্যেই আরো ৪০০টি গরুর বৃহৎ খামার গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পের পুকুরের চারপাশে রয়েছে সহস্রাধিক তেজপাতা গাছ। রয়েছে আম্রপালি আম, রূপালী আম, পেপে, দেশীয় কুল, বাউকুল, আপেলকুল গাছ।

খামারের সফলতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এক সময় অর্থনৈতিক কষ্টে ছিলাম। ১৯৮৪ সালে নিজ এলাকার অনেক বেকার যুবক মধ্যপ্রাচ্য পাড়ি জমায়। অনেকে আমাকেও প্রবাসে পাড়ি জমানোর জন্য তাগদা দিতে থাকে। পরিবারের পক্ষ থেকেও আমাকে প্রবাসে গিয়ে নিজের পায়ে দাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু আমি দেশে থেকেই কিছু একটা করে সবাইকে দেখিয়ে দেয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে বাড়িতে মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ব্রয়লার মুরগীর খামার গড়ে তুলি। দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করি। ধীরে ধীরে সফলতা পেতে থাকি। পরবর্তীকালে আমার খামারের পাশে এসে দাড়ায় বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।

এ ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় (ঋণ) আমি বর্তমান পর্যায়ে এসে দাড়িয়েছি। আমার আল মাসুদ ফিশারী এন্ড ডেইরী সিলেট বিভাগের একটি অন্যতম প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান। এখন এখানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন শতাধিক বেকার যুবক। বর্তমানে ৩৩টি পুকুরে বিভিন্ন জাতের ২৫ লক্ষাধিক মাছ রয়েছে। দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় মাছের চাষ এখানে বেশি হচ্ছে। পাশে আরো কয়েক একর জমি বায়না করা হয়েছে। এগুলোর ক্রয় সম্পন্ন হলে আরো ২৫টির মতো পুকুর করা হবে। ডেইরী খামারে গরুর দুধ দিয়ে নিজস্ব মেশিনে ছানা, ক্রীম ও ঘি প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হচ্ছে।

সিলেট অঞ্চলের সর্বত্র সরবরাহ করা হচ্ছে এসব ছানা ও ঘি। মোরগ রয়েছে ১৪ হাজার। এতে ডিম উৎপাদন হচ্ছে প্রতিদিন ৭ হাজার। আগামী জুন-জুলাই মাসে ডিমের পরিমাণ দাড়াবে ১২/১৩ হাজার। ৩০০ গরুর সেড নির্মাণ হচ্ছে। আগামী কয়েকমাসে ৩০০ গরুর খামারের কাজ সম্পন্ন হবে।’

তিনি আরো বলেন টাকা খরচ করে প্রবাসে গিয়ে চাকরী না করে সঠিক পরিকল্পনা, সততা, পরিশ্রম থাকলে অল্প পুঁজিতে দেশেই অর্থনৈতিকভাবে সফলতা পাওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘আমাদের এই দেশটা সত্যিকার অর্থেই একটি সোনার বাংলা। এ দেশে সোনা ফলে। প্রয়োজন একটু আন্তরিকতা, পরিশ্রম আর সঠিক পরিকল্পনা। সবাই যদি দেশের জমিগুলোর সদব্যবহার করেন তবে এ মাটি থেকে সোনা ফলানো সম্ভব।’

তিনি তার প্রতি সহায়তার হাত প্রসারিত করায় বাংলাদেশ কৃষি ব্যংক কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাদের আরো একটু সহায়তা পেলে তাঁর খামারটি আরো সমৃদ্ধ আর এলাকার সহস্রাধিক বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের পাথেয় হতে পারে।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন