বুধবার, ২৯ মার্চ ২০১৭ ১১:০৬:৩৩ পিএম

স্পেশাল আর সিটিং এর নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রতিযোগিতা

যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ও মেহেদী হাসান (প্রতিমঞ্চ) | নগর জীবন | মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ ২০১৭ | ১১:০৬:৩৪ এএম

পৃথিবীর কোথাও সিটিং সার্ভিস নামে আলাদা কোনো বাস সার্ভিস নেই, ঢাকা শহরে ওই নামে জনগণের গলা কাটা সার্ভিসের উপস্থিতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি কোনো নথিপত্রে এসব সার্ভিসের কথা উল্লেখ না থাকলেও যাত্রীদের সেবার মান বৃদ্ধির অজুহাতে বাড়তি টাকা আদায় করছেন বাস মালিকরা। ঢাকা শহরের বিভিন্ন রুটে এ সিটিং সার্ভিসের নামে চিটিং সার্ভিসের বাসের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রতিযোগিতা

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, ঢাকা মহানগরে অভ্যন্তরীণ রুটে নিয়মিত চলাচল করছে প্রায় ছয় হাজার বাস। কর্তৃপক্ষ যাতায়াতের জন্য এসব যানবাহনের সর্বনিন্ম যাত্রী ভাড়া ৭ টাকা আর মিনিবাসের জন্য ৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু রাজধানীজুড়ে গেটলক, সিটিং, স্পেশাল বা ক্লাসিক সার্ভিসের নামে বাসগুলোতে সর্বনিন্ম ভাড়া ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন অনুযায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটনের মধ্যে চলাচলকারী বাসের প্রতি কিলোমিটারের জন্য একজন যাত্রী ভাড়া প্রদান করবেন ১.৭০ টাকা। আব্দুল্লাপুর থেকে মিরপুর-১ এর দূরত্ব হচ্ছে ১৭.৫ কিলোমিটার অর্থাৎ ভাড়া হবে ২৯ টাকা ৭৫ পয়সা। আর সে জন্যই এ দূরত্বে বাস মালিকদের নির্ধারিত ভাড়া হচ্ছে ৩০ টাকা। আপতদৃষ্টিতে আইন সম্পন্ন ভাড়া মনে হলেও এর মাঝখানের যে কোনো এক স্টপেজ থেকে নিকটবর্তী পরবর্তী যে কোনো দূরত্বের চেকিং পয়েন্টের জন্য ভাড়া গুনতে হবে ১০ টাকা যা কিলোমিটার হিসেবে দ্বিগুণেরও বেশি। একজন যাত্রী যদি আব্দুল্লাপুর থেকে শেওড়া পর্যন্ত যেতে চান তাহলে তাকে সর্বমোট ভাড়া গুনতে হবে ৩০ টাকা; আব্দুল্লাপুর থেকে বিশ্ব রোড পর্যন্ত ভাড়া দিতে হবে ২০ টাকা এবং বিশ্ব রোড থেকে শেওড়া পর্যন্ত মাত্র ৬০০ মিটার রাস্তার জন্য ভাড়া গুনতে হবে অতিরিক্ত ১০ টাকা। যা সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার প্রায় ১০ গুণেরও বেশি। এভাবেই সরকারকে ‘বুড়ো আঙ্গুল’ দেখিয়ে চলছে এসব বাস প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মহোৎসব।

নামে সিটিং, কাজে লোকাল

মিরপুর/সদরঘাট/যাত্রাবাড়ি টু আব্দুল্লাপুর রুটের বাসগুলোর যাত্রীসেবা নামে সিটিং হলেও বাস্তবে অনেক লোকাল বাসের তুলনায় এসব বাসের যাত্রীসেবা অত্যন্ত জঘন্য। প্রায় প্রতিটি স্টপেজেই ৭-৮ মিনিটেরও অধিক সময় যাত্রী উঠানো-নামানোর কাজে ব্যয় করে বাসগুলো। টিকিট সুবিধা না থাকায় সব স্টপেজ এবং সড়কের যেকোন স্থান থেকে হেল্পার যাত্রীদের ডেকে ডেকে বাসে উঠান। ফলে যাত্রীদের নষ্ট করতে হয় তাদের মূল্যবান সময়। প্রতি যাত্রীর বিপরীতে একটি সিট বরাদ্দ থাকার কথা কিন্তু অধিকাংশ সময় যাত্রীদের দাঁড়িয়েই যেতে হয়। যেহেতু যাত্রী চেক করা হয় নির্ধারিত চেক পোস্টে তাই সেই চেকারের হাতে ২০-৩০ টাকা গুঁজে দিয়ে হেল্পাররা এ সমস্যার সমাধান করেন। এ রুটে পর্যাপ্ত লোকাল বাস না থাকায় যাত্রীদের শত ভোগান্তি মাথায় নিয়েই এসব বাসে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়। সরকারে নির্দেশনা অনুযায়ী বাস ভাড়ার তালিকা প্রত্যেকটি বাসে রাখা বাধ্যতামূলক হলেও কোনো বাসেই পাওয়া যায় না সেই তালিকা।

বাসে নানারকম বিড়ম্বনা

যাত্রীরা অবশ্যই চান তার যাত্রাপথে কোনো ধরনের বিড়ম্বনা না হোক, অবশ্য সিটিং বাস সার্ভিসের হর্তা-কর্তারা তাই বলে থাকেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। বাসে যখন-তখনই উঠে যায় ভিক্ষুক, বেদেনীর দল, হিজড়ার দল। ফলে যাত্রীদের পোহাতে হয় বাড়তি ঝামেলা। এদের মধ্যে হিজড়া ও বেদেনীর দলের সদস্যদের আবদার অনুযায়ী টাকা না দিলে যাত্রীদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে বাসে উঠে যাচ্ছে হকারের দল, শুরু করছে বেচাকেনা। বিড়ম্বনার মধ্যেই বাসেই ধূমপান করেন ড্রাইভার ও হেল্পার। তথাকথিত সিটিং সার্ভিস বাসে ফ্যানের কোনো ব্যবস্থা নেই, এমনকি সিটগুলোও ভাঙা, জানালায় নেই গ্লাস। যেখানে সেখানে থামিয়ে যাত্রী তোলা হয়, অপরিচ্ছন্ন আসন, আর ছারপোকা তো নিত্যদিনের সঙ্গী। লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলোকে বানানো হচ্ছে স্পেশাল। শান্তিনগর থেকে কুড়িল বিশ্ব রোডে নিয়মিত অফিস করেন হাসিব কামাল। তিনি বলেন, এ রুটে চলাচল করা সুপ্রভাত গাড়িটি রাতারাতি ‘স্পেশাল সার্ভিস’ নাম দিয়ে সিটিং হয়ে গেছে। শুরুতে কিছু ফ্যান চালু থাকলেও বর্তমানে একটি ফ্যানও সচল নেই। সিটগুলোতে নেই পর্যাপ্ত জায়গা। বসলেই হাঁটু লেগে যায়। যাত্রীকল্যাণ সমিতি বলছে, গত ৬ মাসে ১৭টির বেশি নতুন বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুরনো বাস সার্ভিসগুলোও সিটিং সার্ভিসের এক প্রতিযোগিতায় মেতেছে।

ভিআইপি পরিবহনে ‘ভিআইপি’ কারবার

রাজধানীর আজিমপুর থেকে গাজীপুরের চৌরাস্তা পর্যন্ত ‘ভিআইপি-২৭’ নামের একটি বাসসেবা দীর্ঘদিন থেকে চালু আছে। কোম্পানিটির বাসসেবা মূলত চালু আছে ‘কাউন্টার সার্ভিস’ নামে। বাসটির সর্বনিন্ম ভাড়া ৫০ টাকা। কোনো যাত্রী যদি আজিমপুর থেকে উত্তরা পর্যন্ত যে কোনো জায়গায় যেতে চান তা হলে তাকে ৫০ টাকার টিকিট কাটতে হবে। অর্থাৎ আজিমপুর উত্তরা থেকে খিলক্ষেত, বিশ্বরোড, বানানী, ফার্মগেট যেখানেই নামুন না কেন ভাড়া গুনতে হবে ৫০ টাকা। গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ভাড়া আবার ৭০ টাকা। কলাবাগান থেকে নিয়মিত বনানী যাতায়াত করেন ফজলুল হক। তিনি বলেন, ‘কলাবাগান থেকে বনানীর ভাড়া ১৫ টাকা। কিন্তু ভিআইপি-২৭ নম্বরে গেলে ৫০ টাকা ভাড়া গুনতে হয়। যা রীতিমতো গলাকাটা।’ অনেক যাত্রী বাসটির অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। এর আগে প্রতিমঞ্চ বিভাগে ভিআইপি বাস নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ৪০ টাকার একটি টিকিট চালু করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তারা বরাবরের মতো সর্বনিন্ম ভাড়া ৫০ টাকা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেন, পরিবহন সেবা খাতে নানা অনিয়ম বন্ধ করতে বর্তমানে রাজধানীতে চারটি ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছেন। প্রতিদিনই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালন করে বাস-মালিক, চালক এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

একনজরে গলা কাটা সার্ভিসের বিভিন্ন রুটের বাসগুলো

মিরপুরের কালশী থেকে বিশ্বরোডের দূরত্ব ফ্লাইওভার দিয়ে মাত্র ৫ কিলোমিটারের একটু বেশি। হিসাব অনুযায়ী প্রতি ১ টাকা ৭০ পয়সা হারে এ পথে মোট ভাড়া ৯ টাকা। কিন্তু এ রুটে চলাচল করা বাসগুলো সিটিং সার্ভিসের নাম দিয়ে ৯ টাকার জায়গায় আদায় করছে ৩০ টাকা। গাবতলী, আগারগাঁও, মিরপুর ১০ ও আনসার ক্যাম্প থেকে আব্দুল্লাহপুর কিংবা বাড্ডা, গুলশানে চলাচল করছে প্রজাপতি, বসুমতি, মধুমতি, জাবালে নূর, আকিক, নূরে মক্কা, অছিমসহ অনেক গাড়ি। সিটিং সার্ভিসের নামে চলা এসব গাড়িতে যে কোনো দূরত্বের জন্য নেয়া হচ্ছে সর্বনিন্ম ২৫-৩০ টাকা। রাজধানীর মোহাম্মাদপুর থেকে মিরপুর-১০, ২, ১ নম্বর হয়ে আনসার ক্যাম্প যায় প্রজাপতি এবং মোহাম্মদপুর থেকে আবদুল্লাহপুর চলাচল করে তেঁতুলিয়া পরিবহন। সাভার-আজিমপুর রুটে চলাচল করে গ্রামীণ সেবা যেগুলোর সর্বনিন্ম ভাড়া ২৫ টাকা। যাত্রাবাড়ী থেকে গাবতলী ও সাভার পর্যন্ত চলে লাব্বাইক পরিবহন, সায়েন্সল্যাব শাহবাগ মালিবাগ চলে তরঙ্গ প্লাস- তাদের সর্বনিন্ম ভাড়া ২০ টাকা। বাসগুলোতে দেয়া হয়না কোন টিকিট। সাইনবোর্ড ও জুরাইন থেকে গাজীপুরগামী অনাবিল এবং ছালছাবিল পরিবহন সবচাইতে ‘জঘন্য’ সার্ভিস দেয়া পরিবহনগুলোর মধ্যে অন্যতম। সদরঘাট থেকে উত্তরা রুটে চলাচল করা লোকাল বাস হিসেবে খ্যাত সুপ্রভাত। অধিকাংশ সুপ্রভাতই রাতারাতি সিটিং সার্ভিস হয়ে গেছে। সর্বনিন্ম ভাড়া আদায় করছে ১০ টাকা। গুলিস্তান বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ থেকে আব্দুল্লাহপুর রোডের ৩ নম্বর লোকাল বাসটি বর্তমানে সিটিং হয়ে গেছে। স্পেশাল নামের এ বাসে সর্বনিন্ম ভাড়া ১৫ টাকা। একে একে সব লোকাল বাস সিটিং বা স্পেশাল সার্ভিসে পরিণত হচ্ছে। বিআরটিএর সচিব মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, আমরা বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারীদের জরিমানা করেছি। গণপরিবহনে নানারকম অনিয়ম ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত কাজ করছে।

বাস মালিকদের দিতে হয় চাঁদা

নগরীর বিভিন্ন বাস স্টপেজের চেকার ও ড্রাইভারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি আলাদা আলাদা চেকপোস্ট স্থাপনের জন্য আলাদা আলাদা বাস প্রতিষ্ঠানকে ওই এলাকার পুলিশ, মাস্তান ও অসাধু রাজনৈতিক নেতা বলে কথিত লোকজনদের সর্বমোট প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা প্রতিমাসে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা না দিলে রাস্তাঘাটে বাস আটকে রাখাসহ পোহাতে হয় নানা রকমের হয়রানি। ফলে যথেষ্ট পরিমাণ চেকপোস্ট স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে বাস ভাড়ার অসামঞ্জস্যতা বিরাজ করছে।

আইনে নেই তবু

মোটরযান অধ্যাদেশে বা বিআরটিএর নিয়মনীতিতে সিটিং সার্ভিস নামে কোনো সার্ভিসের উল্লেখ নেই। বাস মালিকরা তাদের সুবিধার্থে এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন। ‘সিটিং সার্ভিস’ বলতে তারা বোঝাতে চান, বাসে ওঠা প্রতিটি যাত্রীকে বসার সুবিধা করবেন তারা। কিন্তু বাস্তবে লোকাল কিংবা ‘সিটিং সার্ভিস’ বাসে যাত্রী ওঠানোর ব্যাপারে কোনো বাধা নিষেধ নেই। তাই অনেক যাত্রী সিটিং সার্ভিসকে ‘চিটিং সার্ভিস’ বলে অভিহিত করেন। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ন্ত্রণে নগরীতে বেশ কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে বিআরটিএ। পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি মনে করছে, খুব দ্রুতই ভাড়া নিয়ে সংকট কেটে যাবে। বাস-মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতউল্লাহ বলেন, বাস-মালিকেরা সিটিং বাস চালু করেন যাত্রীদের চাহিদার কথা ভেবেই। ভালো সার্ভিস দেয়ার লক্ষ্যেই, তবে বেশি ভাড়া নেয়াটা অনিয়ম।

তথসূত্র: যুগান্তর

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন