সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭ ০৫:৫৯:৩২ এএম

পুলিশের কু-প্রস্তাব, অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর আত্মহত্যার চেষ্টা!

যশোর সংবাদদাতা | জেলার খবর | যশোর | সোমবার, ৩ এপ্রিল ২০১৭ | ০৬:৫৩:২৩ পিএম

যশোরে এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ কীটনাশক পানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তার নাম সাবিনা বেগম। তার গর্ভস্থ শিশুর অবস্থা কী, ডাক্তাররা এখনো এ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি।

সাবিনা শহরতলীর বড় শেখহাটি এলাকার মাদক ব্যবসায়ী আব্দুল গফুরের স্ত্রী। তার অভিযোগ, পুলিশকে টাকা দিতে দিতে তারা ফতুর হয়ে গেছেন। সবশেষে বাড়ির ফ্রিজ-টেলিভিশনও বিক্রি করে টাকা দিয়েছেন পুলিশকে।

এখন পুলিশের এক কর্মকর্তা তাকে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দিচ্ছেন। ছেলেকেও ইয়াবাসহ চালানা দেয়ার হুমকি দিচ্ছেন। কোনো পথ না পেয়ে তিনি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন।

তবে, উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। বলছে ওই পরিবারের সবাই মাদক ব্যবসায়ী। নিজেদের রক্ষা করতে তারা প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে।

হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার ওবায়দুর কাদির উজ্জ্বলের বরাত দিয়ে সিনিয়র স্টাফ নার্স চামেলি বেগম জানিয়েছেন, রোগীর গর্ভের সন্তানের অবস্থা জানার জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে দেয়া হয়েছে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সাবিনা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তার স্বামী আব্দুল গফুর নেশাগ্রস্ত। সে কারণে ডিবি পুলিশের এএসআই আলমগীর হোসেন বেশ কয়েকবার গফুরকে আটক করেন। প্রত্যেক বারই ওই পুলিশ কর্মকর্তার হাতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দিতে হয়। বিনিময়ে তিনি গফুরকে পুরনো মামলায় চালান দেন।

পরিবারের চেষ্টায় গফুর মাদক ছেড়ে এক সময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। কিন্তু পুলিশের হয়রানি বন্ধ হয়নি। একবার এসআই বিপ্লব হোসেন, আরেকবার এএসআই আলমগীর হোসেন। দুইজনই তাকে পালাক্রমে কয়েকদিন পরপর ধরে নিয়ে যান এবং হাত-পা ভেঙে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করে।

সাবিনার অভিযোগ, এএসআই আলমগীর বাড়িতে গিয়ে তার কুপ্রস্তাবও দেন। বলেন, রাজি হলে তোর স্বামীর সব অপরাধ মুছে দেবো। আর রাজি না হলে তোদের সংসার লণ্ডভণ্ড করে দেবো।

সাবিনা জানান, এরই মধ্যে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে, মাদক ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরলে তাদের পুনর্বাসন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে গফুর আত্মসমর্পণ করেন। তার নামে দেয়া ৫-৬টি মামলায় জামিন থাকায় তাকে আটক করেনি পুলিশ। গত ২৪ মার্চ সকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এসআই বিপ্লব হোসেন এবং এএসআই আলমগীর হোসেন তার বাড়িতে যান। এসপি সাহেব ডেকেছেন, বলে গফুরকে বাড়ি থেকে নিয়ে যান তারা।

ওই দিন সন্ধ্যার দিকে আমাকে ফোন করে বলা হয়, তোর স্বামীর কাছে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া গেছে। তাকে বাঁচাতে হলে দশ লাখ টাকা নিয়ে আয়। তাদের দাবি মেটাতে পারিনি। তাই স্বামী গফুরকে ইয়াবা দিয়ে চালান দিয়েছে পুলিশ।

সাবিনার অভিযোগ, পর দিন ২৫ মার্চ এসআই বিপ্লব হোসেন ফোন করে ৯০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে গফুরের হাত-পা ভেঙে দেবেন বলে হুমকি দেন। বাধ্য হয়ে ২৬ মার্চ রাতে ঘরের ফ্রিজ ও টেলিভিশন বিক্রি করে ২০ হাজার টাকা দিই বিপ্লবকে। এইভাবে হুমকি-ধামকির মুখে পুলিশকে টাকা দিতে দিতে নিঃস্ব হয়ে গেছি। বিষিয়ে উঠেছে জীবন। আমাদের জীবন বিপন্ন।
সাবিনার দাবি, তিনি কয়েক দিন আগে এই বিষয়ে পুলিশ সুপারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেননি। পরে স্থানীয় প্রেসক্লাবে এসে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছেন।

এর পর গত রবিবার রাতে পুলিশ তার বাড়িতে ফের যায়। তারা কাছে টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে না পারলে তার ছেলে বিপুলকে ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে চালান দেয়ারও হুমকি দেন। সহ্য করতে না পেরে তিনি সোমবার সকালে কীটনাশক পান করেন। পরে বাড়ির লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

এ বিষয়ে কথা হয় ডিবি পুলিশের ওসি ইমাউল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, গতরাতে (রবিবার) ডিবি পুলিশ সাবিনার বাড়িতে যায়নি। এটা ভিত্তিহীন অভিযোগ। পুলিশ কখনো গফুরের কাছ থেকে টাকা নেয়নি।

পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেন, গফুর আত্মসমর্পণ করার পরও মাদক ব্যবসা করছিলেন। এই ধরনের প্রমাণ পুলিশের হাতে আছে। পুলিশের অত্যাচারের মুখে সাবিনা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সঠিক না। মাদক ব্যবসায়ী যেই হোক তার প্রতি অনুকম্পা নেই পুলিশের।

ওসি বলেন, গফুর ও তার পরিবারের সবাই মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত। মাদক বিক্রিতে সুবিধা নেয়ার জন্য এই ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হচ্ছে গণমাধ্যমকর্মীদের কাজে লাগিয়ে। এটা কৌশল।

তার কাছে কারা ফোন দেয় এই ধরনের প্রযুক্তিগত তথ্য আমাদের হাতে আছে। তার পরও কোনো পুলিশ যদি অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশ করা হবে, বলেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ডিবি ওসি বলেন, এএসআই আলমগীরের বিরুদ্ধে অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেয়ার অভিযোগ ঠিক না। কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। আর এসআই বিপ্লব হোসেন তাকে চেনেন না। ফলে তার এই অভিযোগ বানোয়াট, ভিত্তিহীন।

এদিকে, এসব বিষয়ে সাবিনার প্রতিবেশী কয়েক নারী সংবাদকর্মীদের জানান, একসময় গফুর মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৬ মার্চ যশোরে পুলিশের খুলনা রেঞ্জ ডিআইজির আরও কয়েকজনের সঙ্গে গফুরও আত্মসমর্পণ করেন। এরপর তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে নামাজ-কালাম পড়া শুরু করেন। কিন্তু পুলিশের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠছে না।

তারা জানান, পুলিশের কারণে সাবিনা সকালে কীটনাশক গুলিয়ে প্রথমে বাচ্চাদের খেতে দেয়। কিন্তু তারা সেই বিষ ফেলে দেয়। এরপর তিনি নিজে পান করতে চাইলে বাচ্চারা তাও ফেলে দেয়। কিন্তু কিছু অংশ তার পেটে ঢুকে যায়। সেকারণে তাকে সোমবার সকালে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন