মঙ্গলবার, ২৩ মে ২০১৭ ০৯:১৪:৫৬ এএম

নবীগঞ্জে পাচারকারীদের কবল থেকে যুবতী স্বপ্না ৩ বছরেও ফিরেনি বাড়ি

জেলার খবর | হবিগঞ্জ | শনিবার, ৮ এপ্রিল ২০১৭ | ০৬:২৪:০৪ পিএম

নবীগঞ্জে নারীদের বিদেশ পাঠানোর নামে একাধিক দালাল চক্র করছে রমরমা ব্যবসা। পাচারের শিকার হয়ে অনেকেই হয়ে যাচ্ছেন যৌন কর্মী, আবার বহু নারীর জীবনে ভয়ানক দুর্ভোগ নেমে এসেছে।

এদিকে উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের স্বপ্না বেগম মানবপাচারকারীদের পাল্লায় পড়ে লেবানন গিয়ে ৩ বছর ধরে রয়েছে নিখোঁজ। তার কোন খোঁজ খবর মিলছেনা। এ ব্যাপারে রয়েছে মামলা।

অপর দিকে, সম্প্রতি সৌদি আরবে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা নবীগঞ্জের পল্লীর এক যুবতীর তথ্য মতে সৌদি আরবে হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানের ১৯ নারী এক সাথে বন্দী ছিলেন। সে উদ্ধার হয়েছে কিন্তু বাকী ১৮ জন কোথায়? কি করছেন বা কেমন আছেন? জানেননা কেউই!

জানা যায়, সুন্দর ভবিষ্যত ও সোনালি দিনের স্বপ্ন এবং দরিদ্র পিতা-মাতার মুখে হাসি ফুটাতে ৩ বছর আগে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে সূদুর লেবাননে পাড়ি জমান নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের কান্দিগাঁও গ্রামের নুর ইসলামের ২১ বছর বয়সী যুবতি কন্যা স্বপ্না বেগম। সেখানে তাকে গৃহকর্মীর চাকুরী দিবেন এবং প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা রোজি করার প্রলোভন দেখিয়ে ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে স্বপ্না কে সাথে করে নিয়ে যায় মানবপাচারকারীরা।

সেখানে যাওয়ার পর তার মা বাবার সাথে ১ দিন মোবাইল ফোনে কথা বলেছিল স্বপ্না। এর পর থেকেই যোগাযোগ নেই। এভাবেই একে একে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও হদিছ মিলছেনা স্বপ্নার। সে বেচে আছে কিনা কোন কিছু হয়েছে তাও জানেননা কেউ। দালালদের ধারে গেলে দালালরা শুধু আশ্বস্থ করেন স্বপ্না ভালো আছে, কয়েক দিনের মধ্যেই দেশে ফিরে আসবে। কিন্তু তিন বছর ধরে দালালদের এমন আশার বাণী শুনে আসলেও তার কোন সন্ধান মিলেনি বলে জানান স্বপ্নার মা সুফিয়া বিবি।

এদিকে, গেল জানুয়ারী মাসে স্বপ্নাকে লেবাননে পাচারকারী জিলু দেশে আসার খবর পেয়ে স্বপ্নার স্বজনরা খোঁজ খবর নিতে দালাল জিলুর বাড়িতে যান। এ সময় জিলু মিয়া স্বপ্না বেগমের মা বাবাকে তার মেয়ের আশা বাদ দিয়ে দিতে বলেন। এমটাই কান্না জরিত কন্ঠে এ প্রতিবেদকে জানান স্বপ্নার মা সুফিয়া বিবি।

তিনি আরো জানান, জিলুর এহেন কথাবার্তায় তাদের সন্ধেহ হলে বিষয়টি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ এলাকাবাসীকে অবগত করেন। অবশেষে কোন রাস্তা না পেয়ে নবীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন স্বপ্নার মা সুফিয়া বিবি। এরই প্রেক্ষিতে পিতা পুত্রকে গ্রেফতার করে নবীগঞ্জ থানা পুলিশ। তারা বর্তমানে জামিনে আছে।

অপর দিকে, সম্প্রতি নবীগঞ্জের এক নারী সৌদিতে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসে নানা অজানা তথ্য দিয়েছে। নির্যাতিত মেয়েটির নাম কল্পনা বেগম। সে হবিগঞ্জে জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের কায়স্থগ্রামের মৎস্যজীবি এবাদ আলীর কন্যা। গেল বছরের গত ৬ ডিসেম্বর সে গৃহকর্মীর চাকুরী নিয়ে সৌদি আরবের দাম্মামে যায়। এরপর তার উপর শুরু হয় শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতন। সেখানকার দালাল তাকে টাকার বিনিময়ে তিন/চার দিনের জন্য একেকজন আরব নাগরিকের কাছে ভাড়া দেয়। তখন শুরু হয় তার উপর পাশবিক নির্যাতন। বিষয়টি টেলিফোনে মা-বাবাকে জানিয়ে তাকে উদ্ধার করার আকুতি জানায় মেয়েটি। অতঃপর এমপি কেয়া চৌধুরী প্রচেষ্টায় সিআইডি পুলিশ সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে কল্পনাকে উদ্ধার করে।

এদিকে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনার পর কিছু দিন মানবপাচারকারী চক্রটি আত্মগোপন করে পালিয়ে বেড়ায়। এবং কিছু দিন মানব পাচার বন্ধ থাকলেও স্থানীয় দালালরা ফের শুরু করেছেন তাদের তৎফরতা। নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুরসহ বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় দালাররা, বেকার নারীদের সোনালী স্বপ্ন এবং মোটা অংকের টাকা আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সৌদি আরবে পাঠানোর নামে প্রতারনা করে আসছেন। এভাবে বিদেশে গিয়ে নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন গ্রাম গঞ্জের বিভিন্ন নারীরা।

সচেতন সমাজের নাগরিকদের ভাষ্য, দেশে নারী পাচারের আইন থাকলেও এর প্রয়োগ হচ্ছেনা। যদি কোন স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে নতুন দালালদের সৃষ্টি হতো না।

এ প্রসঙ্গে নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি নাজমা বেগম বলেন, ‘নারী পাচার হচ্ছে এক ধরনের সহিংসতা। সারা বিশ্বের ন্যায় আমাদের দেশেও নারী পাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী পাচারের ফলে বিদেশে গিয়ে নারীরা শারিরিক মানবিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নারী পাচার রোধে আইন হয়েছে কিন্তু আইনের কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হচ্ছেনা বলেও জানান তিনি।’

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘নারী পাচার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং দেশে নারীদের জন্য আরো কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে’।

নবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ এস.এম আতাউর রহমান বলেন, ‘নারী পাচারের বিষয়ে অভিযোগের প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নবীগঞ্জে মানব পাচারকারী কাউকে ছাড় দেওয়া হবেনা। ইতিমধ্যে একাধিক মানবপাচারকারী চক্রকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরন করা হয়েছে।’’

ওসি আরো বলেন, ‘সচেতনতাই পারে নারী ও শিশু পাচার বন্ধ করতে। এজন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি পাশাপাশি বেশি ভূমিকা রাখতে হবে গণমাধ্যমকে’।

এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তাজিনা সারোয়ার বলেন, ‘নারী ও শিশু পাচার একটি জঘন্য অপরাধ এবং পাচারের ফলে নারী ও শিশুরা চরম নির্যাতনের শিকার হয়। আর পাচার হওয়া শিশু বাধ্যতামূলক শ্রম, নারীরা গৃহপরিচালিকা ও যৌন কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই মানব পাচার রোধে সকলকে সচেতন থাকতে হবে।’

ইউএনও আরো বলেন, ‘সুখী, সমৃদ্ধ ও সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে সর্বক্ষেত্রে সকল শিশুকে পুর্ণ মর্যাদাবান মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার নানাবিধ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।’ তাই এ ব্যাপারে সকলকে সচেতন থাকার আহবান জানান তিনি।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন