বৃহস্পতিবার, ২৫ মে ২০১৭ ০৮:১৩:৫২ পিএম

আজ কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ১২১তম তিরোধান দিবস

রোকনুজ্জামান | জেলার খবর | কুষ্টিয়া | মঙ্গলবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৭ | ১১:১৪:০৭ এএম

উনবিংশ শতাব্দির আলোকিত সাংবাদিক হিসেবে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজ ৫ বৈশাখ তাঁর ১২১তম তিরোধান দিবস। তিনি ১২৪০ সনের ৫ শ্রাবণ কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি পৌর এলাকার কুন্ডুপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। দেহত্যাগ করে ১৩০৩ সনের ৫ বৈশাখ। তাঁর বাবা হলধর মজুমদার ও মা কমলিণী দেবী। তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে প্রকাশিত ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার সম্পাদক।

পত্রিকাটি ১৮৬৩ সাল (বৈশাখ ১২৭০) থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে মোট প্রায় ২২ বছর প্রকাশিত হয়। গ্রামবার্ত্তা শুরুতে মাসিক হলেও পরে পাক্ষিক, সাপ্তাহিক এবং পুনরায় মাসিক রূপে প্রকাশ হয়। কাঙাল হরিনাথ গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা পত্রিকার মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন- ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সুসাহিত্যিক রায় বাহাদুর জলধর সেন, দীনেন্দ্র কুমার রায়, মীর মশাররফ হোসেন, শিব চন্দ্র বিদ্যার্নব-এর মতো প্রমুখ সাহিত্যিক। বিদ্যোৎসাহী কাঙাল হরিনাথ সমাজের বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে ৪০টি গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। অবশ্য সব প্রকাশিত হয়নি।

সামাজিক বিষয় ছাড়াও কাঙাল হরিনাথের সাহিত্যপ্রীতির পরিচয় পাওয়া যায় ‘কবিতা কৌসদী’ এবং ‘বিজয় বসন্ত’ (১৮৬৯) শীর্ষক উপন্যাসে। শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালিন বঙ্গসমাজ’ গ্রন্থে কুমারখালির হরিনাথ মজুমদারের প্রণীত ‘বিজয় বসন্ত’ ও টেকচাঁদ ঠাকুরের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

শৈশবে বাবা-মা হারিয়ে চরম দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে কাঙাল হরিনাথ লেখাপড়া শিখেছিলেন সামান্যই। পারিবারিক দৈন্যের কারণে বালক বয়সে কাঙাল হরিনাথ কুমারখালি বাজারের কাপড়ের দোকানে কাজ নিতে বাধ্য হন। দোকানের কর্মচারী হিসেবে তিনি বেতন পেতেন দৈনিক দুই পয়সা।

এরপর ইংরেজদের কুঠির হেড অফিস কুমারখালি নীল কুঠিতে (৫১টি নীল কুঠির প্রধান) শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন জীবিকার্জনের লক্ষ্যে। কিন্তু হরিনাথের পক্ষে অত্যাচারী ইংরেজের কুঠিতে বেশি দিন কাজ করা সম্ভব হয় নি। নীল কুঠির কর্মজীবনে হরিনাথ রায়ত-প্রজার ওপর কুঠিয়াল ইংরেজদের অত্যাচার নির্যাতন ও শোষনের স্বরূপ প্রত্যক্ষ করেন। গবেষকদের মতে শাসকগোষ্ঠীর শোষণ নির্যাতনের প্রতিকারের চিন্তা থেকেই পরবর্তী সময়ে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ সম্পাদনা করেন। এ পত্রিকাতেই বাউল সম্রাট খ্যাত লালন শাহ’র গান প্রথম ছাপা হয়।

গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা সে যুগে জমিদার, মহাজন, রক্ষাকর্তা পুলিশ, ব্রিটিশ সরকার এমনকি জোড়াসাঁকোর বাবু জমিদারদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিল। এজন্য তাঁর উপর প্রায়ই কোর্ট থেকে মানহানির সমন ও সতর্কতাপত্র আসতো এবং সরকারি নির্দেশে মাঝেমাঝে পত্রিকা বন্ধ রাখতে হতো।

গণসঙ্গীত শিল্পী কমরেড হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর এক লেখায় উলে¬খ করেন, ‘রবীন্দ্রনাথের আগে ঠাকুর পরিবারের যেসব সদস্য জমিদার হিসেবে শিলাইদহে এসেছিলেন, তারা প্রজাবৎসল ছিলেন না। তাদের অত্যাচারের কথা কাঙাল হরিনাথ গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় সাহসের সঙ্গে লিখতেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর হরিনাথকে শায়েস্তা করতে পাঞ্জাবি লাঠিয়াল বাহিনী পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন।

এই খবর পেয়ে বাউল সাধক লালন শাহ’র শিষ্য দল একতারা ফেলে সড়কি-বল¬ম নিয়ে পাঞ্জাবি লাঠিয়ালদের কোলকাতা হাকিয়ে দিয়েছিলেন।’ কাঙাল হরিনাথ ১৮৫৪ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি কুমারখালিতে একটি বাংলা স্কুল স্থাপন করেন এবং সেখানে অবৈতনিক শিক্ষকতায় নিযুক্ত হন। নারীশিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে তাঁর উদ্যোগে ১৮৬৩ সালে কুমারখালিতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। বর্তমানে সেটি ‘কুমারখালি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ হিসেবে পরিচিত। কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ সম্পাদনার আগে কবি ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় নানা বিষয়ে লিখে হাত পাকিয়েছিলেন।

বলা যায়, কবি গুপ্তের উপদেশ ও সহায়তায় কাঙাল হরিনাথ ক্রমে সুলেখক হয়ে ওঠেন। উলে¬খ্য, হরিনাথ ১৮৫৭ সাল থেকে দীর্ঘদিন হাতে লিখে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশ করেন। ১৮৭৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে গ্রামবার্ত্তার পাক্ষিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

১৮৭৬ সালে কুমারখালিতে মথুরানাথ মৈত্রের নামে কাঙাল হরিনাথের নিজ কুিঠরে একটি মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করা হয়; যার নাম দেয়া হয়, এমএন প্রেস। এই মুদ্রণযন্ত্র স্থাপনের পর থেকে গ্রামবার্ত্তা সাপ্তাহিক আকারে নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকে।

গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার ছাপাখানাটি আজও আছে কুমারখালির কুণ্ডুপাড়ায় কাঙাল কুঠিরে। যে কুঠিরে বাউল সম্রাট লালন শাহ বহুবার এসে হরিনাথের সাথে অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছেন। তিরোধান দিবস উপলক্ষে আজ বিকালে কুমারখালিতে শোভাযাত্রা আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন