মঙ্গলবার, ৩০ মে ২০১৭ ০৪:৪৭:৫৬ এএম

চট্টলশার্দুল এমএ গনি পাচ্ছেন বিবার্তা সম্মাননা

প্রবাস | রবিবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৭ | ০৬:০৩:৫৮ পিএম

যেভাবেই বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, সবশেষে
সিদ্ধান্তে আসতে হবে- নন্দিত চট্টলশার্দুল এমএ গনি তাঁর জীবনের বেশির ভাগ
সময় আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু মুজিব এবং দেশরত্ন শেখ হাসিনার তরে বিলিয়ে
দিয়েছেন। দলের বিশ্বস্ত এই লড়াকু সৈনিক এখন সর্বইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের
সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিই এবার প্রবাসে
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ক্যাটাগরিতে বিবার্তা স্বর্ণপদক পাচ্ছেন। আগামী ২ মে
জাতীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান মিলনায়তনে বিবার্তা গুণীজন সম্মাননা
অনুষ্ঠান হবে।

প্রাপ্ত তথ্য ও
ডকুমেন্টে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের দুই দিন আগে ১৯৭২
সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডনের ক্লারিজ হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন। সেই
সংবাদ সম্মেলনে এমএ গনি উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা
সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ওই সম্মেলনের যে ছবি ফেসবুকে আপলোড করেছেন সেখানে এম এ
গনির উপস্থিতি সম্পর্কে নিন্দুকরাও নিশ্চিত হতে পেরেছেন।

চট্টগ্রামে
মহাপ্রতাপশালী সেনাশসক আইয়ুব খানকে জুতা মেরে পুলিশী নির্যাতনের শিকার
হয়েছিলেন এমএ গণি। পরে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন। এক সময় সাজেদা চৌধুরী পরম
স্নেহে তাকে লন্ডন চলে যেতে সাহায্য করেছিলেন।

১৯৫৪
সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে প্রচারের জন্য শেরেবাংলা এক ফজলুল হক, শহীদ
হোসেন সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানীর সাথে বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রাম গেলে এমএ
গনির সর্বপ্রথম পরিচয় ঘটে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে।
সেই থেকে আজ পর্যন্ত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আদর্শকে ধারণ
করে জাতির জনকের দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার নির্দেশ পালনে কঠোর
পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

১৯৬৩
সালে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সর্বপ্রথম কমিটির সভাপতি মরহুম জানে
আলম দোভাষ এবং সাধারণ সম্পাদক জহুর আহমেদ চৌধুরীর সাথে যুগ্ম-সাধারণ
সম্পাদক হয়েছিলেন এমএ গনি।

১৯৬৫ সালে
স্বতন্ত্র নির্বাচন করে মুসলিম লীগের শক্তিশালী প্রার্থীকে হারিয়ে এমএ গনি
অল্প বয়সে বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন হয়েছিলেন। একই সালে নিখিল
পাকিস্তান যুব আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়ে বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধিত্ব
করার গৌরব অর্জন করেছিলেন। খুব অল্পবয়সে চট্টগ্রাম এর সেই সময়ের ১০০ বছরের
পুরনো চট্টগ্রাম কো-অপারেটিভ ব্যাংকের পরিচালক হন।

পাকিস্তানি
শাসকদের ইঙ্গিতে পুলিশের নির্মম নির্যাতনে গুরুতর আহত হওয়ার চিকিৎসার জন্য
১৯৬৯ সালে লন্ডন আসলে সুস্থ হওয়ার পর লন্ডনের বিখ্যাত হ্যারো কলেজ থেকে
ব্যবসা প্রশাসনে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। বাংলাদেশে হুলিয়া থাকার কারণে দেশে না
গিয়ে ইংল্যান্ডে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে কাজ করার জন্য নির্দেশ
পেয়েছিলেন। বার্মিংহাম থেকে বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের অ্যাকশ্যান
কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন।

১৯৭৮ সালে
কিছুদিন আমেরিকার তেল কোম্পানির ম্যানেজার হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে গেলেও সেখানে
আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার কাজ করেছেন নিরলসভাবে। পরে একসময় দায়িত্ব পালন
করেন ইউকে আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির।

বয়স
হলেও এমএ গনি মানসিকভাবে প্রাণবন্ত তরুণ। এই জন্য এখনো ইউরোপের এক প্রান্ত
থেকে অন্য প্রান্ত থেকে ছুটে বেড়ান আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে। সময়
সুযোগ পেলে মধ্যপ্রাচ্য গিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের উজ্জীবিত করে আসেন।

এমএ
গনির জন্ম চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ এলাকায় এক জমিদার পরিবারে। তার বাবা
কোলকাতায় সুলতানিয়া পারফিউমারি ওয়ার্ক্সের মালিক ছিলেন। সেই সুবাদে কলকাতায়
কেটেছে তাঁর শৈশব। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। ভর্তি
হন চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাই স্কুলে। কিন্তু সেখানে বেশিদিন পড়া হয়নি
তার। উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিলেন নটরডেমে। কিন্তু ক্রিকেটপ্রেমের কারণে
সেখানেও বেশিদিন থাকা হয়নি তার। পরে তিনি করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি
মাড়িয়েছেন।

১৯৬৬ সালের দিকে
চট্টগ্রাম সফরে আসেন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। সার্কিট হাউসে জরুরি বৈঠক। সেই
অনুষ্ঠানে অন্যদের মতো আমন্ত্রিত হয়ে আসেন ওয়ার্ড কমিশনার এমএ গনি।
প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বক্তৃতা শুরু করেন এভাবে ‘ইউ পিপল টু মাচ
পলিটিক্যালি মোটিভিটেড অ্যান্ড বিহেভ লাইক অ্যা ডগস ফর দ্যা পিস অব বোন’।
তুমুল করতালি সার্কিট হাউজের পুরো হলরুমে।

আইয়ুব
খান ভেবেছিলেন এর মর্মার্থ কেউ বুঝতে পারবেন না। ততক্ষণে অন্যরকম এক
উন্মাদনা তৈরি হয় এমএ গনির ভেতরে। ক্ষোভে, অপমানে রীতিমতো অগ্নিশর্মা তিনি।
আর দেরি নয়, সাড়ে আট টাকা দামের জুতা ছুঁড়ে মারলেন আইয়ুব খানের দিকে। জুতা
খেয়ে অধস্তনদের হতবিহ্বল আইয়ুব খানের তাৎক্ষণিক নির্দেশ ‘শুট হিম’। এ
অবস্থায় এমন লাফ দিলেন গনি, একেবারে গিয়ে পড়লেন নিজ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে।


স্বাধীন
বাংলাদেশের জন্য ব্রিটেনের স্বীকৃতি আদায়েও কাজ করেন এমএ গনি। এই দাবিতে
টেমস নদীর পাড়ে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন এবং আমরণ অনশন শুরু করেন সহকর্মীদের
নিয়ে। এক পর্যায়ে স্বীকৃতির বিষয়টি ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ভোটাভুটিতে তোলা
হয় এবং তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয় বাংলাদেশের স্বীকৃতি।

লন্ডনে
বসে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদকারী হিসেবে বাঙালি কমিউনিটির কাছে
আজও পরিচিত নাম এমএ গণি। তিনিই লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর খুনীচক্রের গোপন বৈঠক
ফাঁস করে দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

চমৎকার
চেহারা সৌষ্ঠবের এই মানুষটির আরও কিছু পরিচয়; তিনি স্মার্ট, সজ্জন সূক্ষ্ম
রুচিবোধের মানুষ, সৌখিনতার শ্রেষ্ঠতম পুরুষ। অসাধারণ এক সম্মোহনী শক্তি
তাঁর।

এমএ গনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু
ছিলেন বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক। সেরা মুক্তিসংগ্রামী, সেরা
রাষ্ট্রনায়ক। জননন্দিত নেতা হিসেবে তার তুলনা ছিলেন নিজেই।’


খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন