মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৭ ০৬:৫৭:৫২ পিএম

অসুখ সারাবে কে!

খোলা কলাম | সোমবার, ৮ মে ২০১৭ | ০১:৪৪:৫৭ পিএম

২০০৬ সালে ভারতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যাওয়ার আগে আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের স্পন্সরশীপ পেয়েছিলো ইপিলিয়ন গ্রুপ। টাকার অংকটা ছিলো ১৫ লক্ষ। দুয়ারে ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। এবার টুর্নামেন্টের দূরত্ব বেড়ে যেমন হয়েছে বিলেত, তেমনি টিম স্পন্সরশিপের টাকার অংকটা লক্ষ ছাড়িয়েছে বহু আগেই।

স্পন্সরশিপ পেতে এবার রবির গুনতে হয়েছে ৬১ কোটি টাকা। অংক যদি আপনার প্রিয় বিষয় হয়, হয়তোবা এর মাঝেই বের করে ফেলেছেন, ১১ বছরের পরিক্রমায় টাকার পরিমাণ বেড়েছে ৪০ গুণেরও বেশি।

মাঠের খেলায় উন্নতির গ্রাফটা হয়তোবা এর চেয়েও বেশি ঊর্ধ্বমুখী। তখনকার প্রবল প্রতিপক্ষ কেনিয়া ওয়ানডে স্ট্যাটাস হারিয়েছে, বাংলাদেশ এখন লড়াই করে ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের ছয়ে উঠতে। টেস্ট আঙিনায় পায়ের তলায় শক্ত জমিন এই এলো বলে, আর কিছু বসন্তেরই অপেক্ষা।

কিন্তু, যদি প্রশ্ন ওঠে, মাঠের ক্রিকেটের সাথে ক্রিকেট পরিচালনায় বাংলাদেশের সংগঠকেরা কতটা দক্ষ হয়েছেন, নতুন ক্রিকেটার উঠে আসার প্লাটফর্মই বা কতটা মসৃণ হয়েছে, তার উত্তরে আপনি চোখে সরষে ফুল দেখলে এই লেখক দায়ী নন।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি দরজায় কড়া নাড়ছে। কিন্তু কি আশ্চর্য দেখুন, টেলিভিশন, পত্রিকা কিংবা অনলাইন মিডিয়া, সে আলোচনা একটু আড়ালেই রয়েছে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির জন্য আরো ২৪ দিনের অপেক্ষা বলে হয়তো, কিন্তু দেশের শীর্ষ ক্রিকেট লিগ যে দারুণ মোড়ে দাঁড়িয়ে, সে খবরও খেলার পাতার ২য় কলামের পূর্বে দেখা যায় না।

তার বদলে এখন ক্রিকেট মহল ব্যস্ত সদ্যই শেষ হওয়া দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগ নিয়ে। দুই বোলারের বাজে আম্পায়ারিংয়ের প্রতিবাদ অতঃপর ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা, দুই ক্লাবের নিষিদ্ধ হওয়া এবং এর পারিপার্শ্বিক সব গল্প মিলিয়ে কোনো এডভেঞ্চার সিরিজই বোধ হচ্ছে।

বিমারসহ চার বলে ৯২ রান বিলানোর কথা যদি রূপকথাতেও বলা হয়, তবে সেই রূপকথার গল্পকারকে আপনি হয়তো ক্রিকেটের প্রাথমিক পাঠ নিতেই পাঠাবেন। কেননা, দুইয়ের অধিক বিমারের পরও কিভাবে উনি চার বল পর্যন্ত যেতে পারলেন, তা রহস্য বৈকি। কিন্তু, ২য় বিভাগ ক্রিকেট সেই রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছে। সুজন আহমেদ, চার বলে ৯২ রান দেয়ার রেকর্ড গড়েছেন। ব্যাপারটা প্রথম হলেও কথা ছিলো। এর আগেই, ১.১ ওভারে তাসনিম নামের আরেক বোলার ৬৯ রান বিলিয়েছেন।

তা এই রান বিলানোর রহস্যের মাঝেই আসলে দেশের ক্রিকেটের সমস্যা লুকিয়ে। ওভারে দুয়ের বেশি বিমার করলেই যেখানে বোলারের সেদিনের বোলিং থেকে অব্যাহতি নেয়ার কথা, সেখানে তিনি কিভাবে বোলিং করে যেতে পারলেন চার বল পর্যন্ত। বিসিবি এই রান বিলানো প্রসঙ্গে যেই বক্তব্য দিয়েছে, ‘দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে সুজন- তাসনিম', সেই আলোচনার আগে তো এই আলোচনা ওঠা উচিৎ, আম্পায়ার ক্রিকেট বিষয়ক রুলস জেনে মাঠে এসেছিলেন তো! দুয়ের অধিক বিমারের পরও তিনি কিভাবে সুজনকে বোলিংয়ে রাখলেন?

সুজনের অভিযোগ আমলে নিলে তো ব্যাপারটি আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। ব্যাটিংয়ের সময় আম্পায়ার নাকি তাদের ব্যাটসম্যানদের হুমকি দিয়েছেন, তোমরা আউট হবা, না আমরা দেবো? তার বোলিং নাকি এরই প্রতিবাদ।

দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে, এই অযুহাতে তদন্ত কমিটি সুজন আর তাসনিমকে নিষিদ্ধ করেছেন ১০ বছর। (ফিক্সিংয়ের দায়ে দায়ী ক্রিকেটারের সাজা যদি হয় পাঁচ বছর, তবে কি অন্যায়ের প্রতিবাদ ফিক্সিংয়ের চেয়েও বড় কোনো পাপ! ১০ বছর সাজা দেয়ার আগে বিসিবির তদন্ত কমিটি সুজন আর তাসনিমের পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করেছিলেন নাকি সেই প্রশ্নও রইলো।)

সাথে বলেছেন, বাজে আম্পায়ারিং নিয়ে কোনো ক্লাব তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেনি। তদন্ত কমিটির প্রতি প্রশ্ন রাখা যায়, স্কোরকার্ডে বোলারের নামের পাশে দুয়ের অধিক বিমার থাকার পরও আম্পায়ারদ্বয় যে তাকে বোলিং থেকে সরালেন না, এটা কি বাজে আম্পায়ারিংয়ের নমুনা নয়! বিসিবি এরপরও তাদের ৬ মাসের দীর্ঘ সাজা কিভাবে দিলেন! ( শোনা যায়, তাদের সাজার বাস্তব প্রতিফলন এখনও ঘটে নি।)

'ব্যক্তির চেয়ে দল বড়' এই আপ্তবাক্য মেনেই হয়তোবা সুজন- তাসনিমের চেয়ে তাদের ক্লাবের শাস্তিও বেশি। ক্লাব দুইটি আজীবন নিষিদ্ধ হলো। সুজন- তাসনিমের মদদদাতা তারা, এই যুক্তিতে। কিন্তু, সবার আঙুল উঠার কথা যেই ক্লাবের দিকে, সেই অ্যাক্সিওম ক্রিকেটার্স রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা সব শাস্তির ঊর্ধ্বে।

অ্যাক্সিওম ক্রিকেটার্সের এবারের দ্বিতীয় বিভাগের সব ম্যাচেই জয়ী দলটি অ্যক্সিওম ক্রিকেটার্স এবং প্রত্যেক ম্যাচের স্থায়িত্বকাল ছিলো চার ঘণ্টারও কম এবং ম্যাচের স্থায়ীত্বকাল যেমন রহস্য বাড়ায়, ম্যাচের অদ্ভুতুড়ে ঘটনাবলি রহস্যে কেবল বারুদই যুগিয়েছে। কোনো ম্যাচে এক্সিওমের বোলার ২৪ বলে ৯ উইকেট নিয়েছেন তো কোনো ম্যাচে এক্সিওমের কিপারের ঝুলিতে জমেছে ৫ টি স্ট্যাম্পিং।

যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশে অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যায়ের এক ক্রিকেটার হাজার রান করলে পত্রিকার পাতা সরগরম হয় এই সংবাদে, ‘কে এই ধানওয়াড়ে!’, সেখানে দ্বিতীয় বিভাগের চার ওভারে ৯ উইকেটের রেকর্ড নিয়ে তো গিনেস রেকর্ডের জন্য কাগজপত্র তৈরি করার কথা! তবে আলোচনা এই রেকর্ড নিয়েও হচ্ছে এবং তা অতিঅবশ্যই নেতিবাচকভাবে। উইকেট প্রাপ্তির চেয়ে যেখানে আম্পায়ারের দানকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, উপস্থিত সবার এই সাক্ষ্য থাকার পরও, কেন এক্সিওম ক্রিকেটার্স কোনো শাস্তির আওতাতেই পড়েনি? ক্লাব রাজনীতির দৌড় আসলেই কতদূর বিস্তৃত, সে প্রশ্নও বড্ড প্রাসঙ্গিক!

মেয়েদের ক্রিকেট লিগে ৬০০ টাকা ম্যাচ ফি রেখে, ছেলেদের ৩য় বিভাগ ক্রিকেট লিগে ৫ লক্ষ টাকা এন্ট্রি ফি নেয়া কি উঠতি ক্রিকেটারদের উঠে আসার দরজা বন্ধ করতেই? দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটাই বা কতটা যুক্তিযুক্ত?

একজন উঠতি ক্রিকেটারের ভালো পারফরমেন্স যদি নেতিবাচকভাবে আলোচনার টেবিলে উঠে আসে, মানসিকভাবে একজন ক্রিকেটারকে তা অনেকখানিই নিঃশেষ করে দেয়, সেখানে দিনের পর দিন কখনো আবাহনীচক্র কখনোবা এক্সিওম ক্রিকেটার্সের ক্রিকেটার রূপে তা আমাদের খেলোয়াড়দেরই বহন করতে হচ্ছে, এই সমস্যার সমাধানই বা কবে?

প্রশ্নগুলো আমিই প্রথম উত্থাপন করলাম, ব্যাপারটা এমন নয়। বহুদিন ধরেই দেশের ক্রিকেট লেখক কিংবা সাংবাদিক ভাইয়েরা তুলে ধরছেন দেশের ক্রিকেটের এই ভাইরাস। কিন্তু সেই ভাইরাসকে উপড়ে ফেলার দায়িত্ব যেই সংগঠনের, সেই সংগঠনই যদি হয় ভাইরাসের আশ্রয়- প্রশ্রয়দাতা, সমস্যা বাড়ে বৈ কমে না।

ম্যালেরিয়া সারাবে কুইনিন কিন্তু সেই কুইনিন সারাবে কে!-খেলাধুলা

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন