রবিবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৭ ০২:৫২:১০ পিএম

লবণের কারনে বিপর্যয়ে জীবন, খুলনা-সাতক্ষীরার মানুষের

জেলার খবর | সাতক্ষীরা | সোমবার, ৫ জুন ২০১৭ | ১০:৫৮:৪১ এএম

খুলনা শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার পথ পেরোলে দাকোপ উপজেলার শেষ সীমানার গ্রাম গুনারি ও কালাবগি। সেখানে যাওয়ার অবশ্য সরাসরি কোনো পথ নেই। নৌকায় তিনটি নদী পেরিয়ে, আঁকাবাঁকা সরু মাটির পথ দিয়ে সেখানে যেতে হয়। এই গ্রাম দুটির পরই সুন্দরবন।
শিল্পোন্নত দেশগুলোর বিপুল কার্বন নিঃসরণের ফলে বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর বিস্তীর্ণ উপকূলে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। খুলনা-সাতক্ষীরার মতো জেলাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ আস্তে আস্তে বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে।
এর ফলে জেলা দুটির পাঁচটি উপজেলার (খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর) ভূমির ধরনের কী বদল হয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন একটি গবেষণা করেছে। তাতে দেখা গেছে, ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এই পাঁচ উপজেলার কৃষিজমি কমেছে ৭৮ হাজার ১৭ একর। লবণ পানিনির্ভর চিংড়ি চাষের জমি বেড়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৯ একর।
এ বিষয়ে সংস্থাটির এদেশীয় পরিচালক হাসিন জাহান বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ওই পাঁচ উপজেলায় মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। খাওয়ার পানির সংকট থেকে শুরু করে শিক্ষাতেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সেখানে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওই পাঁচ উপজেলায় পাল্টে যাচ্ছে জীবন-জীবিকা। বর্তমানে তা কী অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, সেটা দেখতে গত শুক্রবার হাজির হই গুনারি গ্রামে। একে গ্রাম বললে অবশ্য ভুল হবে। প্রবল স্রোতের দুই নদ পশুর ও শিবসার মাঝখানে দ্বীপের মতো ওই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ বছরে তিন মাস কাজ পান। বাকি সময় এগ্রাম-ওগ্রাম এটা-ওটা করে তাঁদের চলে। বছরে একটা ফসল হয়, তা দিয়ে সাত-আট মাসের খোরাকি হয়। বাকি সময় এক-দুই বেলা খেয়ে কোনোমতে চলে।
বাড়ির উঠানে বসে কথা হয় গুনারি গ্রামের পূর্বপাড়ার মিস্ত্রিবাড়ির মুরব্বিদের সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, তাঁদের মিস্ত্রি বংশে ৫৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও ৬০ জন নারী বসবাস করেন। এর মধ্যে তিনজন পুরুষ শহরে স্থায়ী চাকরি করেন। অন্যরা বছরের তিন মাস নিজেদের ও অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেন। অন্য সময় মাসের ২০ দিন কোনো কাজ থাকে না। ১০ দিনের মতো এলাকায় কোনো সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মাটি কাটার কাজ পান। তাতে যা পান তা দিয়ে মাস চলে।
মোহন মিস্ত্রি বলেন, তাঁদের পাঁচজনের পরিবারের জন্য দিনে ৫০ টাকার বাজার করেন। ঘরে খোরাকির চাল ও নদী থেকে মাছ ধরে পেট চলে।
পাশে বসে থাকা প্রফুল্ল মিস্ত্রি একটি গোলপাতার কুঁড়েঘর দেখিয়ে বলেন, ‘পেটের জ্বালা সহ্য করতি না পেরে ওই বাড়ির নিতাই মিস্ত্রি ও তপন মিস্ত্রি পিতৃপুরুষের ভিটা ফেলে চলে গেছে।’
কোথায় গেছেন জানতে চাইলে তাঁরা কিছুক্ষণ মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন। একপর্যায়ে জবাব দেন, ‘ওই পারে।’
এ বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আইনুন নিশাত বলেন, ‘আমাদের নিজেদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকে ভারতে, কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্যে বা ইউরোপেও যাচ্ছে। আর দেশের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামেও খুলনা-সাতক্ষীরার মানুষকে আমরা যেতে দেখেছি। এই সবকিছুর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অন্যতম দায়ী।’
সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সব সংস্থার নানা গবেষণা, জরিপ, পরিসংখ্যান ও পর্যবেক্ষণ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বিশ্বের অন্যতম বিপন্ন এলাকায় পরিণত হয়েছে। সেখানে ২০০৫ সাল থেকে প্রায় দুই বছর পরপর একটি করে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও জাতিসংঘের আন্তসরকার জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেল (আইপিসিসি) বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে করা গবেষণায় এসব কথার প্রমাণ মিলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ১০ বছর ধরে দেশের অর্থনীতিতে গড়ে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এতে বছরে দারিদ্র্য কমছে সোয়া ২ শতাংশ হারে। জনসংখ্যা ১ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়ছে। কিন্তু খুলনায় উল্টো চিত্র। ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে সেখানে জনসংখ্যা কমেছে ৬০ হাজার। লবণাক্ত হয়ে ওঠা জমিতে ফসল হচ্ছে না।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ও বিবিএসের সর্বশেষ ২০১৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সাতক্ষীরা জেলার ৫৫ শতাংশ মানুষই অতিদরিদ্র, খুলনায় তা ৫০ শতাংশ।
গবেষকেরা বলছেন, একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লোকজন তাঁদের পিতৃপুরুষের পেশা কৃষিকাজ ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিয়মিত ঝড়ে ষাটের দশকে নির্মিত উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ভেঙে কৃষিজমিতে লবণ পানি প্রবেশ করে। এতে লবণাক্ত হয়ে ওঠা মাটিতে কৃষির বদলে চিংড়ি চাষের দিকে তাঁরা ঝুঁকে পড়েন। পরে প্রভাবশালী চিংড়িচাষিরা বাঁধ কেটে ঘেরে নোনাপানি ঢুকিয়ে বাগদা চিংড়ি চাষে ঝুঁকে পড়েন।
তবে চিংড়ি চাষ বেড়ে যাওয়াকে মৎস্য অধিদপ্তর সব সময় ‘উন্নয়ন’ হিসেবে দেখে আসছে। তাদের মতে, এতে দেশে চিংড়ির উৎপাদন বাড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ছে।
খুলনা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা ও সাতক্ষীরায় ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে নোনাপানির বাগদা চিংড়ি চাষের জমি বেড়েছে প্রায় ১ লাখ হেক্টর।
খুলনাভিত্তিক সংস্থা উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদি বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯ সালের পর খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ অন্যত্র চলে যায়। এর দুই বছর পর আবার ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ বাড়িতে ফিরে আসে। বাকি ১৫ হাজার আর ফেরেনি।’ এখনো যারা বেড়িবাঁধে উদ্বাস্তু হিসেবে মানবেতর জীবনযাবন করছে, তাদের এখন উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এই এলাকার মানুষ কোথায় যাবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন