সোমবার, ২০ নভেম্বর ২০১৭ ১১:২৮:২৫ পিএম

খালেদা জিয়ার বাসায় মদ! আর ফরহাদ মজহারের ব্যাগ!!!

খোলা কলাম | মঙ্গলবার, ৪ জুলাই ২০১৭ | ০৭:১৬:২২ পিএম

বাংলাদেশ কী একটি নীতিহীন রাষ্ট্র? বাংলাদেশ কী সার্বভৌম? কবি ও দার্শনিক ফরহাদ মজহারকে গুমের চেষ্টা এবং গ্রেফতারের ঘটনায় - এই দু’টি প্রশ্ন দেশবাসীর মনে জাগ্রত হয়েছে। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে অনেক বছর আগেই আমার মনে এ প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে। সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকদের আচরণ বিশ্লেষণ করলে আমাদের ভববিষ্যত নিয়ে নিরাশার দোলাচলই কেবল উঁকি দেয়!!

২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বাসভবন থেকে টেনে-হিচড়ে বের করা হয়েছিল। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমি পুরো ঘটনা ফলো করেছিলাম। প্রতিবাদে পরের দিন ১৪ নভেম্বর হরতাল ডাকে বিএনপি। ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এম.ফিল. পরীক্ষা ছিল। কিন্তু, আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ ভিসি আআমস আরেফিন সিদ্দিক হরতালের মধ্যেই পরীক্ষা অনুষ্ঠানে বাধ্য করেন শিক্ষক-কর্মকর্তাদের। টানা ৩৬ ঘন্টা সংবাদ সংগ্রহের পর আমিও পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য হই। কারন এটাই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দেখা হরতাল/ধর্মঘটে প্রথম পরীক্ষা অনুষ্ঠান। আর এর মাধ্যমেই ‘জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’ নামক ছাত্রসংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ হারায়। এরপর এই সংগঠনকে ক্যাম্পাসে ভালভাবে কখনো দেখা যায়নি। কার্যকর কোনো চেষ্টাও চোখে পড়েনি তাদের।

আসল কথায় আসি, পরীক্ষা শেষ করেই আমি ছুটে গিয়েছিলাম ক্যান্টনমেন্টে বেগম খালেদা জিয়ার উচ্ছেদকৃত বাড়িতে। জাহাঙ্গীরগেইট থেকেই এক সেনা কর্মকর্তা জানালেন, আমার দেশ, এনটিভি, নয়াদগিন্ত, দিনকালের সাংবাদিকরা থাকলে একপাশে দাড়ান। অন্যরা পৃথক সারিতে। সামান্য জ্ঞান কাজে লাগিয়ে আমি ভিন্ন লাইনে না গিয়ে ক্যাম্পাসের বড় ভাই বোরহানুল হক সম্রাটের (এটিএন নিউজ) গাড়িতে উঠে বসি। কিছুক্ষণ পর গাড়ি ছাড়ে মইনুল রোডের বাড়ির উদ্দেশ্যে, কিন্তু আমার দেশ সহ ভিন্ন লাইনের সাংবাদিকদের ওই গেইট থেকেই ফেরত যেতে হয়। অর্থাৎ তারা নিষিদ্ধ। এরপর বাড়ির গেইটে গিয়ে দ্বিতীয়বার আইডি চেক। আমি তখন নিউজবিএনএন নামক একটি অনলাইনের সম্পাদনা করি। সেই পরিচয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেও বাধাগ্রস্ত হই। পরে ইত্তেফাকের ক্রাইম রিপোর্টার আবুল খায়ের ভাইয়ের হস্তক্ষেপে বাড়িতে প্রবেশ করলাম।

খালেদা জিয়া বাড়ি ছাড়া। আর ওই বাড়িতে ঢুকে আমাদের সাংবাদিক সহকর্মীদের সে-কি উল্লাস!! এটিএননিউজ এর বোরহানুল হক সম্রাট, আর নিউএজ-এর মুকতাদির রোমিও ছাড়া সবাই ছিলেন উল্লসিত। ভোরের কাগজের শ্যামল দত্ত আর এটিএন নিউজের জ.ই মামুনকে মনে হয়েছে তাদের ভাগ্যে লটারি লেগে গেছে!! বিলিয়ন ডলারের লটারি! উচ্ছসিত তারা!

এরই মধ্যে সবাইকে বেগম খালেদা জিয়ার বেড রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে গিয়ে দুই পা উপরে তুলে নাচার চেষ্টা শ্যামল দত্তের! আর সেনা বাহিনীর এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বারবার টয়লেট দেখার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন। টয়লেটে রাখা ছোট একটি ফ্রিজ খুলে ছবি নিতে বলেন জ,ই মামুনকে। ফ্রিজটি খুলে দেখা যায় উপরেই পাঁচ টাকা দামের তিনটি মিস্টি বিস্কুট। আমি প্রশ্ন রাখি, ‘খালেদা জিয়া এতো রুচিহীন? এই বয়সে এতো মিস্টি ও কম দামি বিস্কুট খান তিনি?’ সেনা কর্মকর্তা বললেন, ‘আরো ভালোভাগে দেখেন। অনেক কিছুই পাবেন।’ আমরা যখন আর কিছু পাচ্ছি না, তখন সেনা কর্মকর্তা নিজেই ফ্রিজ থেকে একটি বোতল হাতে নিলেন। মদের বোতল। বললেন, উনি (খালেদা জিয়া) মদও খান!! এরপরের উল্লাস কার কে দেখে! জ,ই মামুন (উনি সাংবাদিক!!) নিজেই ক্যামেরা হাতে তুলে নিলেন। নানা অ্যাঙ্গেলে ছবি নিচ্ছেন। তবে সেদিন, আমি সহকর্মী সম্রাটের পেশাদারিত্ব দেখেছি। ঘৃনার চোখে তার শ্যামল দত্ত ও জ,ই মামুনদের দিকে তাকানোর দৃশ্যে আমি সাহস পেয়েছিলাম, সেনা বাহিনীর এসব ঘৃন্য কর্মের প্রতিবাদ করতে। আমি তখন বলে উঠেছিলাম, আপনারা এসব না করলেও পারতেন। আর এর জবাবে শ্যামল দত্ত আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি কে? এসব প্রশ্ন করছেন কেনো?’ পাল্টা জবাবে আমি জানতে চেয়েছিলাম, একজন সম্পাদক হয়ে আপনি এখানে এসেছেন কেন? উল্লাস করতে?

যাই হোক, এ দৃশ্যের পরই আরেকজন সেনা কর্মকর্তা (কর্নেল ওয়ালি) এসে খালেদা জিয়ার বেড রুম থেকে সাংবাদিকদের বের করে নিয়ে গেলেন। অন্যসব রুম দেখাচ্ছেন। জাইমা কোন রুমে থাকতো। কোন রুমে কি হতো। দামি দামি চেয়ারের গল্প শুনছিলাম আমরা। আর চলছিল ফটো শ্যুট। এরই মধ্যে বারান্দা দিয়ে এক বৃদ্ধ হেঁটে যাচ্ছিলেন। লোকটিকে দেখে আমার ইনোসেন্ট মনে হলো। আমি গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কী এ বাসায় কাজ করেন? উনি বললেন, না। আমি আমার স্যারের বাসায় কাজ করি। স্যার এই ব্যাগটি পাঠিয়েছে কর্নেল স্যারকে দিতে। ‘কি আছে ব্যাগে’ জানতে চাইলে তিনি বললেন, আমি জানি না। প্যাকেট করা। কর্নেল স্যার ছাড়া খুলতে নিষেধ করেছেন। এই বলে বৃদ্ধ লোকটি খালেদা জিয়ার বেডরুমের দিকে চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ পরেই কর্নেল ওয়ালি এসে আবার সাংবাদিকদের ডাকলেন। বললেন, আপনারা মনে হয় অনেক কিছু মিস করেছেন। শুধু টিভি ক্যামেরাগুলো নিয়ে আসেন। সন্দেহ হওয়ায় আমি আর রোমিও তাদের পিছু নিলাম। গন্তব্য খালেদা জিয়ার বেডরুম। একজন মেজর (কর্নেল ফারুকের মেয়ের জামাই) এসে খালেদা জিয়ার বেডের ম্যাট্রেস তুললেন এবং পাশের ড্রয়ার খুলে দিলেন। বললেন, এগুলো ভালো করে দেখেন। এসব কি? মহিলার (খালেদা জিয়া) টেস্ট দেখেন!!! জ,ই মামুন এগিয়ে গিয়ে কিছু পর্নো ম্যাগাজিন বের করলো। ক্যামেরাম্যানকে ছবি নিতে বললো। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আমি অবাক হলাম। ওই বৃদ্ধের প্যাকেট করা ব্যাগের সাথে মিলালাম। সেনা কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করলাম, একটু আগেতো এগুলো ছিল না। আমরা তো বেডের নিচও দেখেছি। আমি একটি চিঠিও পেয়েছিলাম বেডের নিচ থেকে। রোমিও আমার কথায় সায় দিলো। এবার রেগে গেলেন, কর্নেল ওয়ালি। তিনি আমাকে পাশে ডেকে জেরা শুরু করলেন। আমি ভীত হলেও জোরালো কন্ঠেই জবাব দিলাম। এসব নাটকের কি দরকার জানতে চাইলে তিনি আমাকে দেখার দায়িত্ব দিলেন ওই মেজরকে (কর্নেল ফারুকের মেয়ের জামাই)। তার সাথেও যখন বিতর্ক হচ্ছিল, তখন ছুটে এলেন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল হাসান। তিনি আমাকে কাছে ডেকে নিজের পরিচয় দিলেন এবং বললেন, ‘ভাই, আপনি এতো কথা বলেন কেন? কি দরকার। যা হয়, দেখে যান। আমিও তা-ই করছি। আমার অধিনেই এখন এই বাড়ি। কিন্তু উনারা যেভাবে যা বলেন তা-ই করছি।’ আলোচনায় জানা গেল, উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। সেই সুবাদে আমার ভয় কিছুটা কাটলো।

পাঠক, এরপর আমার ভাগ্যে কি ঘটেছিল - তা নিয়ে আরেকদিন বলা যাবে। তবে ফরহাদ মজহারকে নিয়ে সাজানো সরকারের নাটকটি নিয়ে এমন-ই সব প্রশ্ন হাজির হচ্ছে সবার মনে।

কেনান সরকারের ভাষ্যে ফরহাদ মজহার অভিমান করে ভোর ৫টায় বাসা থেকে বের হয়ে যান! কিন্তু সিসিটিভির ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, শুধু পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি পড়ে বের হন তিনি। হাতে কোন ব্যাগ বা কিছুই ছিল না। কিন্তু আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার কাছে একটি ব্যাগ আবিষ্কার করেছে। মোবাইল ফোনের চার্জার পেয়েছে। শার্টও পেয়েছে। অথচ কস্মিনকালেও তিনি শার্ট পরেন না। ফরহাদ মজহারের মেয়েকে ব্যাগ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘ব্যাগ সঙ্গে নিয়েছেন কিনা তা তো জানি না। বাট উনি প্রায়ই একটা ব্যাগ সঙ্গে রাখেন বই পড়ার জন্য। তবে তার কাছে যেমন ব্যাগ দেখা গেছে তেমন ব্যাগ উনি ইউজ করেন না। এ ব্যাগ কোথায় থেকে আসলো জানি না।’

ফরহাদ মজহারকে যে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত হানিফ পরিবহণ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, সেই বাসের সর্বমোট যাত্রী ছিলেন উনিসহ তিনজন মাত্র। ঈদের মৌসুমে যেখানে বাসের টিকিটের হাহাকার, সেখানে ফাঁকা বাস ঢাকায় যাচ্ছিল!! এখন আষাঢ় মাসে আষাঢ়ে গল্প বলছে পুলিশ।

কত রঙ্গ ! দেশের মানুষকে কত হাদারাম বোকা ভাবে পুলিশ। আকাশের যত তারা পুলিশের তত ধারা!!

এরপরও সাংবাদিক সহকর্মীদের মতো আমারও প্রশ্ন-
ফরহাদ মজহার:
১. মাইক্রোবাসে করে গিয়ে বাসে ফিরলেন কেন?
২. সেই মাইক্রোবাসটি কার? কে চালিয়েছিল? কোথায় তা এখন?
৩. সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর চোখ বাঁধা ছিল কেন? (যুগান্তর)
৪. যিনি ফিরে আসছেন বা যাঁকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে, তিনি/তাঁকে কেন ছদ্মনামে লুকিয়ে বাসে ওঠানো হলো? আবারো, ওই মাইক্রোবাসে কেন ফিরলো না?
৫. গ্রিল হাউজে কবে থেকে ভাত-ডাল-সব্জি বিক্রি হয়?
৬. তাঁকে র্যাব ক্যাম্পে নেয়া হয়েছিল কেন? তখনই তো তাঁকে পরিবারে বা হাসপাতালে পাঠিয়ে চেকাপ করানোর কথা।
৭. কার ফোন পেয়ে তিনি বের হন?
৮. সিসিটিভি ফুটেজে এক-বস্ত্রে বের হওয়া ব্যক্তি কীভাবে ব্যাগসহ 'উদ্ধার' হন?
৯. ৩৫ লাখ টাকার মুক্তিপণের ফোন কেন করানো হয়েছিল? ওই নম্বরটি কার?
১০. ভারতে মুসলিম নিধন নিয়ে প্রতিবাদের পরপরই কেন এটা ঘটলো?
১১. নিজেকে 'গুম' দেখিয়ে ওনার কী লাভ?
১২. অসুস্থ, বিভ্রান্ত ও নির্বাক দেখাচ্ছিল কেন তাঁকে?
১৩. অতীতের নিখোঁজেরা ফিরে এসে কেন চুপ হয়ে যান?
১৪. অতীতের ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের সরকারি গল্পগুলো কী এবারের গল্পের মতোই?
১৫. বেলার রিজওয়ানা হাসানের স্বামীর অপহরণ ও উদ্ধারের সঙ্গে এবারের ঘটনা মিলে যাচ্ছে কি?
১৬. এখন ফরহাদ মজহার কোথায়? এরপর কী তাকে রিমান্ডে নেয়া হবে?
১৭. আসলে কী অন্য কোনো পক্ষ তাকে গুম করার চেষ্টা করেছিল? সরকার নেগোশিয়াসন করে তাকে অ্যারেস্ট করলো?
১৮. না-কি ভারতের প্রেসক্রিপশনটাই এমন ছিল? গুমের নাটকের মাধ্যমে গ্রেফতার!! সবাই জীবিত ফেরতের প্রত্যাশায় থাকতে থাকতে তিনি কারাবাসে চলে যাবেন!!!!

লেখক : রয়টার্সের লন্ডন অফিসে কর্মরত;
*ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, দ্যা গার্ডিয়ান;
*সম্পাদক, আমারদেশলাইভ;
*সাবেক রাজনৈতিক প্রতিবেদক, দৈনিক আমার দেশ;
*সাবেক সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন