বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ০৭:১৮:১৮ এএম

হাইব্রিড-কাউয়াদের থেকে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করুন

প্রভাষ আমিন | খোলা কলাম | শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭ | ০৬:০১:৩৪ পিএম



আমি অনেকবার স্কেচটি দেখেছি, বড় করে দেখেছি; আমার চোখে কোনো বিকৃতি ধরা পড়েনি। কারণ আমি জানি এটা কাইয়ুম চৌধুরী বা শাহাবুদ্দীনের আঁকা নয়, বঙ্গবন্ধুর ছবিটি এঁকেছে ক্লাশ ফাইভে পড়ুয়া অদ্রিতা কর। আমি বরং মুগ্ধ হয়েছি, একটি শিশু বঙ্গবন্ধুকে হৃদয়ে ধারণ করে তা আবার রং তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছে দেখে। বঙ্গবন্ধুর স্কেচের ব্যাকগ্রাউন্ডে জাতীয় পতাকার ব্যবহারও আমার চমৎকার লেগেছে। একটি শিশু মনের সৃজনশীলতার দারুন প্রকাশ আছে এখানে।

বরিশালের আগৈলঝরা সরকারি মডেল স্কুলের ছাত্রী অদ্রিতা এই ছবিটি এঁকেছিল গত ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায়। বিচারকদের রায়ে অদ্রিতার আঁকা বঙ্গবন্ধুর ছবিটি প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েছিল। এই ছবিটি ব্যবহার করে গত ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে আগৈলঝরার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী সালমান তারেক আমন্ত্রণপত্র তৈরি করেন।

আগে জানলে অদ্রিতাকে উৎসাহ দেয়ায় আমি সালমান তারেককে ধন্যবাদ জানাতাম। দেরিতে হলেও এখন তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তবে এখন বেচারার ধন্যবাদ নেয়ার মত মানসিক অবস্থা আছে বলে মনে হয় না। বঙ্গবন্ধুর ছবি ‘বিকৃত’ করার অপরাধে তিনি জেল খেটে এসেছেন। তার এখন চাকরি যায় যায় অবস্থা। তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট ওবায়দুল্লাহ সাজু।

অদ্রিতার আঁকা বঙ্গবন্ধুর স্কেচটি দেখে নাকি তার হৃদকম্প শুরু হয়ে গিয়েছিল। আর মামলার কথা শুনে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি। বঙ্গবন্ধুকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য যার পুরস্কৃত হওয়ার কথা, তার এখন চাকরি নিয়ে টানাটানি। আঁকা ছবি দিয়ে আমন্ত্রণপত্র তৈরির এই আইডিয়া গাজী সালমান তারেক কোথায় পেলেন? আমার ধারণা তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আইডিয়াটি ধার নিয়েছেন।

কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেকদিন ধরে নববর্ষ, ঈদ বা এ ধরনের উৎসবে আমন্ত্রণপত্র বা শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করেন স্পেশাল চাইল্ডদের আঁকা ছবি দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী চাইলে দেশের সেরা শিল্পীদের আঁকা ছবি দিয়ে কার্ড বানাতে পারতেন। কিন্তু তিনি বিশেষ শিশুদের উৎসাহ দেয়ার জন্যই তাদের ছবি ব্যবহার করেন। প্রতিটি কার্ডে ক্ষুদে শিল্পীদের নাম উল্লেখ করা থাকে।

প্রধানমন্ত্রীর এই ছোট্ট আয়োজন যে সেই বিশেষ শিশুদের জন্য কতটা অনুপ্ররণার তা অনুধাবনের ক্ষমতা অনেকেরই নেই। প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগটিই ছোট পরিসরে অনুসরণ করেছেন আগৈলঝরার ইউএনও। আমি নিশ্চিত সেই কার্ডটি প্রধানমন্ত্রীর চোখে পড়লে তিনি অদ্রিতাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতেন।

এখন বাংলাদেশে লাখ লাখ বঙ্গবন্ধুপ্রেমিক। কিন্তু ৭৫এর ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করার মত মানুষ ছিলেন না। ২১ বছর বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা হয়, তখন দেশজুড়ে দারুন এক আবেগের ঢেউ খেলে গিয়েছিল।

সময়ের কারণে সেই আবেগ অনেকটাই থিতিয়ে এসেছে। আওয়ামী লীগের অতি ব্যবহার আর দলীয়করণে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সেই আবেগ থিতিয়ে আসার জন্য কিছুটা দায়ী। তবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা কমেনি। বঙ্গবন্ধুর দুটি বই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ও ‘কারাগারেরর রোজনামচা’প্রকাশের পরও আমরা দেখেছি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সর্বস্তরের মানুষের আবেগ কতটা শুদ্ধ।

ইদানিং আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা বুঝতে পেরেছেন, বঙ্গবন্ধুকে দলীয় আবর্তে কুক্ষিগত রাখা তাদের জন্যই ক্ষতি। তাই নানামুখী চেষ্টা চলছে বঙ্গবন্ধুকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়ার। এমনকি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কমিকস পর্যন্ত বানানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, শিশুদের কাছে নিয়ে যাওয়া। তাহলেই বঙ্গবন্ধু যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন।

আর এটা করার জন্য শিশুদের বঙ্গবন্ধু পাঠ বাড়াতে হবে, তাদেরকে বঙ্গবন্ধুর গল্প শোনাতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাতে হবে। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকাকে উৎসাহিত করতে হবে। কিন্তু বরিশালে ঘটলো উল্টো ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার করে কার্ড বানানোর অপরাধে যদি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে কারাগারে যেতে হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশু বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকবে না।

প্রথম কথা হলো, আলোকচিত্র আর আঁকা ছবির পার্থক্য কি বোঝেন বরিশাল আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক? যদি না বোঝেন, সেটা তার সীমাবদ্ধতা। তার উচিত রাজনীতি ছেড়ে ঘরে বসে থাকা। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অ্যাডভোকেট সাজুর যে টনটনে অনুভূতি দেখলাম, তাতে শিল্পী শাহাবুদ্দীনের আঁকা বঙ্গবন্ধুর অনেক পোট্র্রেট দেখলে তো তার এতদিনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা।

সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধুর ছবিকে বিকৃত যদি কেউ করে থাকেন তো চট্টগ্রামের আওয়ামী লগের সাংসদ এম এ লতিফ। তিনি নিজের শরীরে বঙ্গবন্ধুর মুখ বসিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সাংসদকে কিন্তু কারাগারে যেতে হয়নি। বরং এখনও তিনি বহাল তবিয়তে নানা বাণী দিয়ে যাচ্ছেন।

সর্বশেষ তিনি rabএর নতুন নামকরণ করেছেন- rahmat of allah for Bangladesh. এইরকম সাংসদরা বঙ্গবন্ধুর ছবি অবমাননা করে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াবে আর গাজী সালমান তারেকের মত সরকারি কর্মকর্তা কারাগারে যাবেন, এটা অসঙ্গতিপূর্ণ। অদ্রিতা নাকি ভুল করে বঙ্গবন্ধুর চুল এলোমেলো করে দিয়েছে, বঙ্গবন্ধুর মুখে তিল বসিয়েছে।

অথচ বঙ্গবন্ধুর মুখে কিন্তু একটি তিল আছে। এই ডিটেইলও সেই শিশুটির চোখ এড়ায়নি। আচ্ছা, অ্যাডভোকেট সাজু কি অদ্রিতার চেয়ে ভালো একটি বঙ্গবন্ধুর স্কেচ আঁকতে পারবেন? নব্বইয়ের দশকে ভাস্কর রাশা বঙ্গবন্ধুর একটি আবক্ষ মূর্তি বানিয়েছিলেন, যেটি ঠাঁই পেয়েছিল আজকের কাগজের ঝিগাতলার অফিস প্রাঙ্গণে।

বঙ্গবন্ধুর একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবি অবলম্বনে বানানো সেই আবক্ষ মূর্তিটি একদম ভালো হয়নি, অনেকটা হাস্যকর হয়েছিল। অ্যাডভোকেট সাজু যদি সেই মূর্তিটি দেখতেন, তাহলে কাজী শাহেদ আর ভাস্কর রাশাকে কারাভোগ করতে হতো। একেক শিল্পীর দক্ষতা একেকরকম। একেকজন বঙ্গবন্ধুকে একেকভাবে আঁকবেন। কারোটা ভালো হবে, কারোটা খারাপ।

কিন্তু খারাপ হলেই যদি শিল্পী বা পৃষ্ঠপোষকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হয়, তাহলে তো ভয়ে কেউ বঙ্গবন্ধুর ছবিই আঁকবে না। অথচ বঙ্গবন্ধু সব শিল্পীরই প্রিয় বিষয়। সবাই একবার না একবার বঙ্গবন্ধুকে আঁকেন। বয়স এবং গ্রামের একটি স্কুলের শিক্ষার্থীর বিবেচনায় অদ্রিতা করের স্কেচটি আমার কাছে যথেষ্ট ভালো লেগেছে। এই শিশুটি ভালোবেসেই বঙ্গবন্ধুর ছবি এঁকেছে।

তারপরও কথা থাকে, যদি কেউ সত্যি সত্যি বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করে বা কার্টুন আকেঁ, তাকে কি কারাগারে যেতে হবে? বঙ্গবন্ধুর কার্টুন করা কি অপরাধ? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যে দলে হাইব্রিড আর কাউয়াদের নিয়ে আক্ষেপে করেন। শিক্ষিতরা রাজনীতিতে আসছে না বলে যে আফসোস করেন। কেন করেন, সেটা বোঝা গেল অ্যাভোকেট ওবায়দুল্লাহ সাজুর বঙ্গবন্ধু প্রেম দেখে।

আচ্ছা, শিল্প আর আলোকচিত্রের পার্থক্য না বোঝা অ্যাডভোকেট সাজু না হয় মানহানির মামলা করলেন। কিন্তু বরিশালের মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক আলী হোসাইন কেন তা আমলে নিলেন? কেন তাৎক্ষণিকভাবে মামলাটি বাতিল করে দিলেন না? কেন জামিনযোগ্য মামলায় প্রথমে জামিন দিলেন না?

বরিশালের সেই অতি উৎসাহী আওয়ামী লীগ নেতাকে বলছি, ভাই বঙ্গবন্ধু আপনার বা আওয়ামী লীগের একক সম্পত্তি নয়, বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা, তিনি সকলের। আর কোনটা ছবি আর কোনটা শিশুর আঁকা স্কেচ- এই পার্থক্য ধরতে না পারলে, আপনি বরং রাজনীতি ছেড়ে ঘরে বসে থাকুন।

আমি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে দাবি জানাচ্ছি, সর্বস্তরে বঙ্গবন্ধুকে ছড়িয়ে দেয়ার পথে বাধা সৃষ্টি, বঙ্গবন্ধু সস্পর্কে শিশু মনে ভয় ধরিয়ে দেয়া এবং একজন সরকারি কর্মকর্তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার দায়ে অ্যাডভোকেট ওবায়দুল্লাহ সাজুর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হোক। সুযোগ থাকলে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হোক। বাড়াবাড়ি কখনোই ভালো ফল আনে না।

আর দেশে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এত বঙ্গবন্ধু প্রেমিক থাকলে তো সমস্যা। বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের নেতা ছিলেন, তাকে তাই থাকতে দিন। বঙ্গবন্ধুকে ফেরেশতা বানানোর চেষ্টা করলে তাকে বিচ্ছিন্নই করা হবে শুধু। জোর করে বা ভয় দেখিয়ে ভালোবাসা আদায় করা যায় না।

বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে। আওয়ামী লীগের কোনো অর্বাচীন নেতা যেন সেই ভালোবাসার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ।
[email protected]


[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। ইউরোবিডিনিউজ.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে ইউরোবিডিনিউজ.কম -এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

-পরিবর্তন ডটকম

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন