সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭ ১১:৫৮:২৬ এএম

চাটুকারিতা করে ইউএনওকে ফাঁসানোর ঘটনায় এবার নিজেই শক্তভাবে ফেঁসে যাচ্ছেন আ.লীগ নেতা

রাজনীতি | শনিবার, ২২ জুলাই ২০১৭ | ০১:২৬:৪১ পিএম

বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করবার অভিযোগ এনে মামলার পর বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা তারিক সালমানকে গ্রেফতারের ঘটনায় শেষ অবধি ‘অতি চাটুকারিতার’ দায়ে শক্তভাবেই ফেসে যাচ্ছেন মামলার বাদী আওয়ামী লীগের নব্য নেতা ওবায়েদ উল্লাহ সাজু। অতি উৎসাহ এবং উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে এই মামলার ঘটনা এখন অনেকটাই স্পস্ট।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিকৃত করে কার্ড ছাপানোর অভিযোগে ইউএনও’কে গ্রেফতারের ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে ব্যপক আলোচনার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। জবাবদিহিতাসহ প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বরিশালের ডিসি এসপি’র বিরুদ্ধেও।

আলোচিত এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইসাথে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায়অতি উতসাহী এই আওয়ামীলীগ নেতার কর্মকান্ডে তিরস্কার জানিয়ে বলেছেন, ‘এটি রীতিমত নিন্দনীয়’।

এর আগে বরিশালে আওয়ামী লীগের একজন নেতা এবং সেই জেলার আইনজীবী সমিতির সভাপতি ওবায়েদ উল্লাহ সাজু আদালতে মামলাটি করেন গত ৭ই জুন।

তাতে অভিয়োগ করা হয়েছে, জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলায় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের আমত্রণপত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিকৃত করে ছাপা হয়েছে।

অভিযুক্ত করা হয়েছে আগৈলঝাড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা তারিক সালমানকে।

বৃহস্পতিবার পত্র-পত্রিকায় এই খবর দেখে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের কর্মকর্তারাও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। ঘটনার পরপরই তারা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আনেন।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, “আমরা সবাই, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আজ যত কর্মকর্তা ছিলেন, এটি দেখে আমরা সকলেই বিস্মিত হয়েছি। যে ব্যক্তি এই মামলা করেছেন, আমরা মনে করি তিনি অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ করেছেন।”

এইচ টি ইমাম জানান, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রধানমন্ত্রীকে একজন ইউএনওকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার এই ছবিটি দেখান।

এইচ টি ইমাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে বলেন, ছবিটি দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। “প্রধানমন্ত্রী বললেন, ক্লাশ ফাইভের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এই অফিসার সুন্দর একটি কাজ করেছেন।এবং সেখানে যে ছবিটি আঁকা হয়েছে, সেটি আমার সামনেই আছে, আপনারা দেখতে পারেন। এবং এই ছবিটিতে বিকৃত করার মতো কিছু করা হয়নি। এটি রীতিমত পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। এই অফিসারটি রীতিমত পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। আর সেখানে উল্টো আমরা তার সঙ্গে এই করেছি, এই বলে প্রধানমন্ত্রী তিরস্কার করলেন। বললেন, এটি রীতিমত নিন্দনীয়।

এসময় প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীকে কিভাবে গ্রেফতার করা হলো কোনরকম অনুমোদন ছাড়া? এ প্রশ্নের উত্তরে এইচ টি ইমাম বলেন, এটি করা যায় না। কারণ ইউএনও হচ্ছেন উপজেলা পর্যায়ে সরকারের সবচেয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাকে কোন শাস্তি দিতে হলে বা তার বিরুদ্ধে কোন মামলা বা কোন রকম কিছু করতে হলে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন।

এই ঘটনার জন্য বরিশালের ডিসি, এসপিকে দায়ী করেন এইচ টি ইমাম ।

তিনি বলেন, “পুলিশ যে ব্যবহার করেছে এই ছেলেটির (ইউএনও) সঙ্গে, যেভাবে তাকে নিয়ে গেছে, এ নিয়ে আমি ওখানকার ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপার, এদের প্রত্যেককে আমি দায়ী করবো।এদের বিরুদ্ধেও আমাদের বোধহয় ব্যবস্থা নিতে হবে।”

কিভাবে পুলিশ এরকম একটি মামলা নিল আর জেলা জজই কিভাবে এই মামলা গ্রহন করলেন, সেটা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

এইচ টি ইমাম বলেন, এই ঘটনায় মাঠ পর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে তিনিও তাদের সঙ্গে একমত।

“আমাদের অফিসারটিকে যেন হেনস্থা করার জন্য পুলিশ যেভাবে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে, এই পুরো ঘটনায় যেরকম তীব্র ক্ষোভ ফেটে উঠেছে, আমি তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।”

এইচ টি ইমাম বলেন, ঘটনাটি শোনার পরপরই প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছিলেন, যে ব্যক্তি এই মামলা করেছে, সে কে?

মামলা দায়েরকারী ব্যক্তি সম্পর্কে সঙ্গে সঙ্গে তারা খোঁজ খবর নেন, একথা জানিয়ে এইচ টি ইমাম বলেন, এই লোক পাঁচ বছর আগেও আওয়ামী লীগে ছিল না। দলের ভেতরে ঢুকা পড়া এই ‘অতি উৎসাহীরাই’ এই কান্ড ঘটিয়েছে, এই চাটুকাররাই আমাদের ক্ষতি করছে’ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এইচ টি ইমাম বলেন, এই ঘটনার পেছনে তিনটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, এই অফিসারের বিরুদ্ধে হয়তো তাদের কোন ক্ষোভ ছিল। তাকে অপমানিত করা ছিল তাদের লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত বিভিন্ন সার্ভিসের মধ্যে একটি অসন্তোষ সৃষ্টি করা। আর তৃতীয়ত, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করা।

ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দলের মধ্যেও

এ ঘটনা নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং দলটির সমমনাদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
দলটির সমমনাদের অনেকে বলেছেন, এক শ্রেণীর চাটুকার বিভিন্ন সময়ই এ ধরনের মামলা করে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে।

অনেকে আবার বলেছেন, শেখ মুজিবের নাম ব্যবহার করে অতিউৎসাহী অনেক ব্যক্তি এবং অনেক ভূঁইফোড় সংগঠনের কর্মকান্ড তাদের দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।

এই মামলার ঘটনায় মামলার বাদির পক্ষের আইনজীবী এবং সেখানকার আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম খোকন জানিয়েছিলেন, “কার্ডের উপরে এবং ভিতরে বঙ্গবন্ধুর কোনো ছবি নাই। কার্ডের পিছনে একবারে নিচে ছবি ছাপা হয়েছে। এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে অবজ্ঞা করা হয়েছে বলে আমরা মনে হয়েছে। সে কারণে আমরা মামলা করেছি।”

এদিকে, বরিশালে এমন মামলা করার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগেরই সমমনাদের অনেকে সামাজিক নেটওয়ার্কে তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তুলে ধরছেন।

“বঙ্গবন্ধুর ছবিটা এঁকেছে একটা শিশু। একটা শিশুর ছবি যে স্বাভাবিকভাবে রিয়েলিস্টিক ছবি হয়না, এই ধারণাটাই তাদের নাই। এর সাথে চাটুকারিতার মিশ্রণে এই নব্য নেতা তার উদ্দেশ্যপুরনের জন্যই এই মামলা করেছেন বলেই অভিযোগ সবার ।”

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দেশের রাজনীতি নিয়ে দলের ভেতরে থাকা এমন চাটুকার ও অতিউৎসাহীদের শুধু দল থেকেই নয়, সমাজ থেকেই এদের বিতাড়িত করা প্রয়োজন, বলেও মন্তব্য করছেন অনেকেই।

বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আমন্ত্রণপত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিকৃত ও অবমাননা করেছেন। বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গাজী তারিক সালমান ওই অবমাননা করেন বলে অভিযোগ আনা হয়। ওই অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ সাজু। ওই মামলায় হাজিরা দিতে গেলে গত বুধবার বরিশালের এক আদালত প্রথমে তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে জেলহাজতে পাঠান। পরে ওই দিনই তাঁর জামিন মঞ্জুর করা হয়।

জানা গেছে, গাজী তারিক সালমান আগৈলঝাড়ায় ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গত ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবসে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শিরোনামে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও উন্মুক্ত রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় আগৈলঝাড়ার এসএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয় পুরস্কারের জন্য দুই শিশুর হাতে পুরস্কার তুলে দেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মোর্তজা খান। পুরস্কার পাওয়া দুটি ছবির মধ্যে একটি ব্যবহার করা হয় আমন্ত্রণপত্রে। সেটি নিয়েই বরিশাল আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ সাজু ইউএনও গাজী তারিক সালমানের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতির অভিযোগে মামলা করেন

দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সাধারণ নাগরিকরা বলছে, মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত করতে হলে শিশুদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ তুলে ধরতে হবে। এ জন্য চিত্রাঙ্কন, লেখালেখি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠসহ সাংস্কৃতিক আয়োজন দরকার। ইউএনও গাজী তারিক সালমান যা করেছেন তা খুবই ইতিবাচক। শিশুদের মধ্যে এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আরো বেশি হওয়া উচিত বলেও তারা মত দেয়।

জানা গেছে, ইউএনও গাজী তারিক সালমানের বিরুদ্ধে মামলার নেপথ্যে রয়েছে সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ সাজুর ব্যক্তিগত রোষ। তারিক সালমান আগৈলঝাড়ায় ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এতে বহু ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ পড়েন। নকল প্রতিরোধেও তিনি ছিলেন সোচ্চার। টেস্ট রিলিফ (টিআর) ও কাজের বিনিময় খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচিতে বেশ কিছু অনিয়মের বিষয়ে ছিলেন কঠোর। এসব নিয়ে সেখানকার বহু লোকের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন তারিক সালমান। সে কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ওই মামলা করেন আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়েদ উল্লাহ সাজু।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন