সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭ ১১:৫৯:০২ এএম

প্রতিটি রোহিঙ্গার সব গল্প শুধুই কষ্টের, দুঃখ-দুর্দশার

জাতীয় | বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ০৫:৫৩:৫৫ পিএম

৭৩ বছর বয়সী আবুল বাসেত। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুচিডং জেলার টংবাজার এলাকার বাসিন্দা তিনি। ২৫ আগস্টের পর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়ে গেলে প্রাণ বাঁচাতে মানুষ এদিক-ওদিক পালাচ্ছিল। স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, নাতি-নাতনিসহ ১৬ জনের পরিবার ছিল তাঁর। কিন্তু বৃদ্ধ হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা কোথায়ও লুকিয়েছে না-কি রাখাইন সন্ত্রাসীর হাতে বলি হয়েছে-তাও বলতে পারছেন না তিনি।

গত শুক্রবার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে কথা হয় আবুল বাসেতের সঙ্গে। লাঠির ওপর ভর করে চলেন তিনি। এর আগে বুধবার বিকেলে তিনি এপারে ঢুকে পড়েন। সেখানে বর্তমানে ১২৮০টি রোহিঙ্গা পরিবার অবস্থান করছেন। এর মধ্যে আবুল বাসেতও রয়েছেন।

এ সময় তাঁর কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয় আপনিসহ কতজন এসেছেন এখানে? এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘অঁবাজি আঁই বড়ই অভাগা, এডে আঁরার পাড়ার বউত কেউ আইস্যে।

তারা পুত-নাতি লই আইত পাইল্যেও আঁই কেউরে আনিত ন পারি। ’ অর্থাৎ ‘আমি বড়ই অভাগা। এখানে আমার পাড়ার অনেকেই এসেছেন। তারা তাদের পুত্র, পুত্রবধূ, নাতি-নাতনি নিয়ে আসতে পারলেও আমি কাউকে আনতে পারিনি। ’
চলত্শক্তিহীন বৃদ্ধ আবুল বাসেত বলেন, ‘টংবাজার থেকে তুমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে আসতে পায়ে হেঁটে অন্তত ৭-৮ দিন সময় লাগে। কিন্তু আমি বুড়ো হওয়ায় হেঁটে এখানে আসতে লেগেছে ১৫ দিন। তাও লাঠির উপর ভর করে দুর্গম ও বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক কষ্ট পেয়েছি। ’

তিনি বলেন, ‘এই ১৫ দিনর মধ্যে যিঁঅত রাইত হইয়্যে য়িঁঅত কাইত হইয়্যি। খানা-পিনাও য়েন বর হাইত ন পারি। আইবার সমত যারে দেখ্যি তাত্তুন কিছু খুঁজি লইয়্যেরে হাইয়্যি। ’ অর্থাৎ ‘এ ১৫ দিনের মধ্যে যেখানে রাত হয়েছে, সেখানেই শুয়ে পড়েছি। তেমন খাবার-দাবারও খেতে পারিনি। যাকে দেখেছি তার কাছ থেকে চেয়ে কিছু খাবার খেয়েছি। ’

বৃদ্ধ আবুল বাসেত বলেন, ‘গত ১৫দিন আগে আমি একটি ভুচাল (ভূমিকম্প) দেখেছি। এদিন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা যেভাবে পাড়ার মানুষের ওপর বর্বরতা, পৈশাচিকতা, নৃশংসতা চালিয়েছে তা আমি কোনোদিন ভুলব না। ’

তিনি নিজের ভাষায় বলেন, ‘এদিন আঁই ইন কি দেখ্যিদে, লুণ্ঠিনে (বিজিপি) গুলি গরের, আর মগ অঁলে কিরিচ দিয়্যেরে মাইনষ্যরে কোবার। মগঅঁলর কিরিচ ইন দেইতে ঝিলিক মারের। এই কিরিচর পোচ যিন্দি যাইব ইন্দি লোয়া উদ্দা হাডি যাইবই। ’ অর্থাৎ ‘সেইদিন আমি কি দেখেছি, বিজিপি গুলি ছুড়ছে আর রাখাইন সন্ত্রাসীরা ধারালো কিরিচ দিয়ে মানুষকে কোপাচ্ছে। কিরিচগুলো দেখতে ঝিলিক মারে। সেই কিরিচের কোপে লোহা পর্যন্ত কেটে যাবে। ’

তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমার আদরের দুটি নাতি ছিল। এরা সারাক্ষণ আমাকে জড়িয়ে খেলা করত। আমার দুই পায়ের হাঁটু ধরে ঝুলে থাকত। এখন আমি পরিবারের কাউকেও দেখছি না। আল্লাহ আমার পরিবারের এত সদস্যকে কোথায় নিয়ে গেলে? তারা কি বেঁচে আছে, নাকি তাদের মিয়ানমার সেনাবাহিনী, বিজিপি ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা খতম করে ফেলেছে তাও জানি না। সকলকে নিয়ে যাও এর পরেও আমার কলিজার টুকরো দুই নাতিকে ফিরিয়ে দাও। ’ পরিবারের সব সদস্যকে হারিয়ে নির্বাক ও শোকে কাতর বৃদ্ধ আবুল বাসেত প্রতিদিন সীমান্তের ঢেকিবুনিয়ার উঁচু পাহাড়ে উঠেন। সেখান থেকে তিনি দেখেন এখনো জ্বলছে তমবাজার। আর তখনই তিনি ভাবতে থাকেন, আগুনের মধ্যে তাঁর সহায়-সম্পদ, ছেলে-সন্তান, নাতি-নাতনিও পুড়ছে।

পুত্রশোকে বাকরুদ্ধ মর্জিয়া
মিয়ানমারের মংডুর বলির বাজারের বাসিন্দা মর্জিয়া বেগম (৫৫)। তাঁর চোখের সামনেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা একসঙ্গে তিন ছেলে সন্তানকে গুলিতে ও নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে। প্রথমে কাছে পেয়ে হত্যা করা হয় ছোট ছেলে আমিনকে। তাঁকে কুপিয়ে শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল ওরা। -এ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তাঁকে বাঁচাতে ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকা অপর দুই ছেলে বেরিয়ে আসলে তাঁদেরকেও গুলিতে হত্যা করে সেনাবাহিনী। এভাবে তিন সন্তানকে নিজের চোখের সামনে নৃশংসভাবে হত্যার দৃশ্য দেখে এখনো বাকরুদ্ধ মর্জিয়া বেগম।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে তাঁরা মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে এপারে এসে পৌঁছান। সেখান থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত লাগে উখিয়ার থাইংখালী এলাকায় আসতে। মর্জিয়া বেগম তিন পুত্রবধূ ও ১০ নাতি-নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। দীর্ঘ একসপ্তাহ ধরে দুর্গম ও বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা অনুপ্রবেশ করেন। দীর্ঘপথ হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়েন। ওই দিন তাঁরা উখিয়া উপজেলার থাইংখালী এলাকায় সড়কের ধারে গাছের ছায়ায় একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থানের পর তাঁদের যাওয়ার কথা ছিল উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে। এ সময় কথা হয় মর্জিয়া বেগম ও তাঁর পুত্রবধূদের সঙ্গে। মিয়ানমারের রাখাইনে কোন অবস্থায় ছিলেন-এমন প্রশ্ন করতেই মর্জিয়া বেগম হাউমাউ করে কেঁদে উঠার পর নির্বাক হয়ে পড়েন।

কিছুক্ষণ পর মর্জিয়া বলেন, ‘মংডুর বলির বাজারে যে কয়েকটি সচ্ছল পরিবার ছিল, সেখানে আমাদের পরিবারটিও অন্যতম। সহায়-সম্পদ বলতে আমাদের ছিল ২২ একর ফসলি জমি, ২৫টি গরু ও ৩০টি ছাগল। ছিল গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ। এখন আর সহায়-সম্পদ বলতে অবশিষ্ট কিছুই নেই। সবকিছুই ছারখার করে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা। ’

তিনি আরো বলেন, ‘১৫ দিন আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা একসঙ্গে আমার তিন ছেলে সন্তানকে চোখের সামনে গুলিতে ও জবাই করে হত্যা করেছে। ধারালো রামদা, কিরিচ দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে ছোট ছেলে আমিনকে। ’ নৃশংসভাবে হত্যার সেই দৃশ্য মনে করে আবার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন মর্জিয়া।

মর্জিয়া বেগমের পুত্রবধূরা বলেন, ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা একযোগে এসে আমাদের পুরো পাড়া ঘিরে ফেলে। এ সময় ওরা বেছে বেছে সুন্দরী নারীদের একত্র করে। এর পর সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এতে অনেক কিশোরী মারাও যায়। এ অবস্থায় পাড়ার অন্যদের সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেই আমরা। পাহাড়ি ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এপারে এসে পৌঁছাতে লেগেছে প্রায় একসপ্তাহ।

সবকিছু হারানো মর্জিয়ার সঙ্গে প্রায় একঘণ্টা কথা হয় এ প্রতিবেদকের। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মাঝে মাঝে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। মর্জিয়া বেগম জানান, ২০১৬ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকেও রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এর আগে ২০১২ সালে তাঁর স্বামীকে হত্যা করে দেশটির সেনাবাহিনী।

মর্জিয়া বেগমের বড় ছেলের স্ত্রী জুলেখা বেগম জানান, মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাঁদের বাড়িঘর ঘেরাও করে ফেলে। এ সময় ওরা বলে, তোমাদের বাড়িতে সন্ত্রাসী আছে, তাদেরকে বের করে দাও। নইলে কাউকে জীবিত রাখব না। আমাদের কাছে তথ্য আছে, তোমরা তাদের খাবার দাও, থাকতে জায়গা দাও।

জুলেখা বেগম বলেন, এ অবস্থায় আমরা এসব বিষয় অস্বীকার করলেও ওরা প্রথমে হাত দিয়ে শিশুদের মারধর করছিল। তখন আমার ছোট দেবর আমিন ঘরের ভেতর থেকে বের হতে চাইলে তাকে ধরে রাখাইন সন্ত্রাসীরা (তাঁদের ভাষায় মগ) এলোপাতাড়ি পশুর মতো জবাই এবং শরীর থেকে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে বীভৎসভাবে হত্যা করে। পরে আমার স্বামীসহ আরো দুই ভাইকেও গুলি করে হত্যা করে মিয়ানমার সেনারা। এর পর ভেতরে আটকে রেখে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে চলে যায় ওরা। তবে পেছনের একটি দরজা দিয়ে আমরা প্রাণে বেঁচে যাই। বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে রওনা দিই দুর্গম ও বিপদসঙ্কুল পাহাড়ি পথ দিয়ে।-কালের কণ্ঠ

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন