শনিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৭ ১০:০২:০১ পিএম

সম্পর্ক যেন শিতল ছায়া - কবিতাচক্রে আগামির বার্তা

সাহিত্য | শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭ | ০২:১৮:২১ পিএম

 লুসি দিলরুবা খানের নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ বইখানি মূলত স্মৃতি বিজড়িত কবিতামালা। জীবনের বাকেঁ বাকেঁ চলতে গিয়ে নানান উত্থান আর পতনের ভেতর যাদের আকঁড়ে একজন মানুষ আবার দম নেয়ার সাহস পায় আবার সামনের দিকে যেতে শক্তি অর্জন করে তাদেরই সে মনে করে নতুন কোন শুন্যতার মাঝে ।

যেন এক আশ্রয়ের খোজেঁ ছোট্ট শিশু মন ছুটে আসে কোন এক স্নেহের আচঁলের তলে । আশির দশকের এই কবি তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে ঠিকঠাক ভাবে সরল ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন কিভাবে চারপাশের মানুষকে নিয়ে, সম্পর্কগুলোকে জিয়িয়ে জীবনটাকে এগিয়ে চলতে হয় যা এযুগের ছেলেমেয়েদের মাঝে একদম দেখা যায় না। ওরা স্ট্রেসের ভেতর পড়ে যায় একটুতেই।ওরা পাশের মানুষের চোখের আবেদন,মনের নিবেদন টা বুঝতে চায় না ।

কবি ছাত্রজীবন থেকে নজরুল একাডেমী পন্ঞবার্ষিকী সমাপনী পরীক্ষায় নজরুল ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে কৃতিত্ব রাখেন,পান জাতীয় শিশু শিল্পী পুরস্কার,শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার,ভাস্কর ও শিশু কিশোর পুরস্কার,ইসলামী ফাউন্ডেশন পুরস্কার,আশরাফ সিদ্দিকী ফাউন্ডেশন সম্মাননা পুরস্কার,নবকল্লোল শিল্প সাহিত্য পুরস্কার,নন্দিনী সাহিত্য পদক সহ নানান পুরস্কার ।‌

এত অর্জনের মাঝে তবু আজকের তৃষিত হৃদয় এ সকল অর্জন যার পায়ে অর্পন করেছেন তিনি হলেন তার ছোট্টবেলা থেকে দেখাশুনা করতেন যিনি সে আয়েশা বু’কে।

সবশেষে বইটাতে তার ই নামে নিবেদিত কবিতা ‘তুমি ছিলে তাই ‘। যার উপস্থিতিতে কবি নিজেকে ঋষি মনে করতেন। নিজের সংসারের সব কিছু রুটিন মাফিক চালাতে সকল দায়িত্ব তাঁর ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত কবি কবিতার প্রহরে উদাসী থেকেছেন। সে আয়েশা বু আজ আর নেই তাই যাপিত জীবন এখন ক্লান্ত আর ঘামে ভেজা।

কবি লিখেছেন- “কোনো অবকাশ নেই আমার ,রেসের ঘোড়ার মত কেবলি ছুটে চলেছি দু:সহ একাকী পথে।“ ‘যোগমায়া’ কবি যে স্কুলের শিক্ষিকা সেখানকার একসময়ের আয়া ।

পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছে ।আজ এত অর্জনের মাঝেও সেই যোগমায়ার ভক্তির জন্য কবির মন কাদেঁ। সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে কবির যে গুন তা যেন একমাত্র যোগমায়ার ভক্তিতেই অনেক ওপরে স্থান পেয়েছে ।

জানা গেল ‘তোমার স্মৃতির পরশ’কবিতায় । সেখানে যোগমায়া বলেছে-“সবাই কি গাইবার পারে ?”

কবি মনে করেন- “যোগমায়া জানি তুমি ভক্তি দিতে সুরকে আমাকে নয় - শিল্পকে যে শিল্প জীবনে প্রদীপ জ্বালায় । “হয়ত অন্যের সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন বলে কবি জীবনে অনেক সম্মানীয় মানুষের সম্মান অর্জন করেছেন ।অনেককেই গুনগ্রাহী হিসেবে পাশে পেয়েছেন।

বেগম পত্রিকার নুরজাহান বেগম যার ছায়াতলে নিজেকে এক কলম সৈনিক দাবী করে কবি বলেছেন- “আমাদের মর্মবেদনা আপনার মত করে কেউ বোঝেনি ।“

আবার সওগাত পত্রিকার মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন যার সাথে সাহিত্যপাতার নানা লেখা নিয়ে বাক্য বিনিময় কিংবা আড্ডা কবি হৃদয়ে দোলা দেয়- “ দক্ষিনের জানালায় অসীম ভালোলাগা আর ভালোবাসার স্মৃতিময় সংলাপ ।“

নন্দিনী প্রকাশনীর সভাপতি রিজিয়া সুলতানার প্রতি কবির লেখা- “ একজন শিল্পিত মানুষের সাথে পৃথিবীর কিছুটা সময় ক্ষেপন বিরল সুখময় ।“

নান্দনিক মাসিক পত্রিকা চয়নের সম্পাদক লিলি হককে কবি বলেছেন- “মনে পড়ে তাকে যে আমার একান্ত কথার বিমূর্ত সংলাপ ।“

একটি সাংস্কৃতিক পারিবারিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা লুসি দিলরুবা খান মননে, চিন্তায় সাহিত্য,কবিতা,সংগীতে অর্জন করেছেন নিজের পরিবারের কিছু কাছের মানুষের কাছে ।বাবা সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন ভীষন সংগীত পাগল।

ছোটবোন শূচি,ভাই রওনক আর কবি লুসিকে নিয়ে ঘরের আঙিনায় তিনি মেতে উঠতেন গানের জলসায় । কখনো ঘুরতে বেড়িয়ে পড়েছেন যোগীনগর,ঠাটারী বাজার,নবাবপুর রোড,ওয়ারীর পথেপথে ।সিনেমা দেখতে নিয়ে চলে গেছেন হাত ধরে। কি মোহময় সে শৈশব ।আর কবির ভাষায়- “আমার কবিতার শাব্দিক সুখ।“

মা রোকেয়া খান এ সুখ দুচোখ ভরে দেখার আর গানের জলসার গান শোনার নিয়মিত শ্রোতা । কবিদের শৈশবের নিরবিছিন্ন আড্ডা দেবার প্রভাবক চা,ঝালমুড়ি সরবরাহক ।আবার জীবনের কঠিন সময়ে শক্ত হাতে আগলে রাখার বটবৃক্ষ।

কবি তাই বলে উঠেছেন- “বৈশাখী ঝড় এলে মা আঁচল দিয়ে তাঁর তিন সন্তানকে জড়িয়ে রাখতেন বুকে এখনো যেমন রাখেন যেন ঝড় আর ঘূর্ণি আমাদের স্পর্শ করতে না পারে কোনদিন । “

শুধু মা বাবার আদরেরই নন কবি অপরিসীম স্নেহ পেয়েছেন ফুপু কবি জাহানারা আরজুর কাছ থেকে । তাঁকেই সমর্পণ করেছেন নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ বইটি ।

এ স্নেহ এত গভীর যে কবি লিখেছেন- “যেটুকু সময় তার সাথে থাকি মনে হয় কাসালং নদীর গভীরতার সাথে আছি ।“

তাঁর স্বামী বিচারপতি ও সাবেক উপরাষ্ট্রপতি মরহুম এ কে এম নুরূল ইসলাম ,যার তত্তাবধানে কবি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন মেজর (অব:) আতাউর রহমানের সাথে ।

নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ন সময়গুলোতে যিনি অভিভাবক হিসেবে পাশে ছিলেন তারই শেষ বিদায় বেলায় পাশে থাকতে না পারার বেদনায় কবি অশ্রু ভরা নয়নে চিৎকার করে বলে উঠেছেন- “ অসুস্থ কাউকে দেখতে যেতে পারবো না আমি শেষবারের মত বিদায় জানাতেও পারবো না প্রিয়জনকে- এই বৈরী শহর,এই যানজট,এই ট্রাফিকের সন্ত্রাস আমাকে কুড়েঁ কুড়েঁ খায়-নিয়ত আজ তাই আমারও একটি পতাকাবাহী গাড়ি বড় বেশী প্রয়ো্জন-যা আমাকে নিশ্চিন্তে নিয়ে যাবে কাঙ্খিত গন্তব্যে । “

আরজু ফুপুর ছোট বোন মরহুমা রেহেনা সুলতানা এর সাথে কবি হাটখোলার শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ে একসাথে দীর্ঘদিন চাকুরি করেছেন । আরজু ফুপুর বড় মেয়ে অধ্যাপিকা মেরিনা জাহান ।রেহেনা সুলতানা আর মেরিনা জাহান ছিলেন বাংলার অধ্যাপিকা ।কবিকে তারা সাহিত্য চর্চা ও জ্ঞান দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন । রেহেনা সুলতানাকে নিয়ে কবি বিষন্নতায় লিখেছেন- “মৃত্যু হবে স্বর্ণোজ্বল ঠিক সূর্যাস্তের মত এই বিখ্যাত উক্তিটি আপনার বেলায় কেমন করে সত্যি হলো জানিনা ।“

বোন মেরিনা জাহান কবি যাকে ডাকেন আপামণি বলে , তিনিই কবিকে সংগীতে হাতে খড়ি দিয়েছিলেন ছোটবেলায় যখন তার বয়স মাত্র ছয় ।তিনি যখন ফুঁল মোহাম্মদ ওস্তাদজীর কাছে তালিম নিতেন সাথে মদন দার তবলার রাগ শিখে নিতেন তখন কবি পাশে বসে সেগুলো মুগ্ধ নয়নে দেখতেন,শুনতেন ।বেড়ে উঠেছেন মেরিনা আপার কাছে রূপালী জ্যোৎস্নার গল্প আর ঘুম পাড়ানী গানের সুরে। মেরিনা আপার স্বামী প্রয়াত মেজর জেনারেল সৈয়দ বদরুজ্জামা।

বদরুজ্জামান (অবঃ) ছিলেন কর্মসূত্রে কবিপতির ডাইরেক্ট কমান্ডার। পারিবারিক আড্ডায় কবির পিতা আর এই দুলাভাই মেতে উঠেছেন শচীন দেবের গানে কিংবা পুরোনো দিনের গানে । মেরিনা আপার ছোট বোন কবি জাহানারা আরজুর কণিষ্ঠ কন্যা লেখিকা লুবনা জাহান (মিঠি আপা) কবির কাজলা দিদি ।যাদের সাথে কবির বেড়ে ওঠার গল্প কবি লিখে গেছেন কবিতার পাতায় পাতায় ।যাদের বিদায় যেন কবিকে একা ,নিঃসঙ্গ করে তুলেছে । এ নিঃসঙ্গতায় কখনো কবি লিখেছেন নিজের স্বামী,কখনো নিজের কন্যাদের,কখনো দাদীমা,নানাভাই,শ্বাশুড়ী,প্রবাসী মামা শ্বশুড় আরও লিখেছেন কবি, সাহিত্যিক , শিল্পী ও দেশবরেণ্য কয়েকজন বিশেষ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে।

নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ তাই কবির এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়া ফানুস ,যেখানে সম্পর্কগুলি উপেক্ষা করে যে জীবন সম্ভব নয় তারই ছায়া খুজেঁ পাই ।

রুমানা রশীদ রুমী,
লেখিকা।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন