শনিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৭ ১০:০০:৫৭ পিএম

শিশুর অপরাধপ্রবনতা রোধে মায়ের সাথে বাবার ভূমিকা

খোলা কলাম | শনিবার, ২৮ অক্টোবর ২০১৭ | ১১:৫৪:২৫ এএম

শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য মায়ের পাশাপাশি বাবারও সময় দেবার প্রয়োজন হয়। এটা এখন আর প্রয়োজনে আটকে নেই, এটা চাহিদায় পরিবর্তিত হয়েছে। সম্প্রতি পুলিশের এক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এভাবে কিশোর অপরাধে এক রাজধানীতেই সক্রিয় প্রায় ১২ টি গ্রুপ। সারাদেশে এর সংখ্যা প্রায় ৩৫ ।

এ অপরাধীরা ইভটিজিং, ছিনতাই, সাইবার ক্রাইম, এসিড অপরাধের মত নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। বরাবর পরিবারের নজরদারীর কথা পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। (প্রথম আলো, ২৩ এপ্রিল ২০১৭)

কিন্তু পরামর্শ অনুযায়ী আমরা অভিভাবক মহল কিশোরদের বরং আরো অধিক শাসন আর একাকীত্বেই তাকে ফেলে দেই। একবারো কি ভাবছি তাদের সময় দিচ্ছি কিনা?

চারপাশের পরিবেশ দিনে দিনে শিশু কিশোরদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। অভিভাবকেরা সচেতন হতে তাকে একা বাইরে ছাড়তে কিংবা যে কাউকেই বন্ধু হিসেবে মিশতে বাধা দেন। এতে শিশু বা কিশোরটি আরও একা হয়ে যায়। অথচ মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ঠ্য যে সে সামাজিক, একারণে সে বন্ধু খুঁজতে থাকে। এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে টিভি, ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেই তখন সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয় শিশু এবং কিশোররেরা।

বয়সের এধাপে ভালো মন্দ বিচার সে বুঝতে পারে না বরং কেউ ইচ্ছা করলেই তাকে যে কোন অন্যায় পথে অনায়াসে পরিচালিত করে নেয়।

এ কারনে অনেক সম্ভ্রান্ত পিতা মাতার সন্তানদেরও বখাটে হয়ে যেতে দেখা গেছে । হয় পা পড়ে গেছে। কিন্তু একটা শ্রেনীর মানুষের সন্তানেরা সত্যিই বিপথগামী হয়েছে বরাবর। এ ঘটনা গুলো সব সময়ে ছিল, চলছে। হয়তো অপরাধের ধরণটা ভিন্ন হয়েছে ।

পুরুষতন্ত্রের জোরে বাবা হয়ত ভাবছেন সারাদিন ঘরে বসে মায়ের কাজটা কি? সন্তানের এহেন পরিনতির জন্য মাকে দায়ী করে হয়ত বাবা সাময়িক সান্তনা পাওয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু তাতে কার ক্ষতি ? কোনো কোনো সময় দেখা গেছে বাবা সাংসারিক এ দায়মুক্তির জন্য ঘরের বাইরে বেশী সময় কাটিয়ে আলাদা একটা জগত তৈরী করে নিয়েছেন, কখনো বা আলাদা সংসার পেতে নেবার এমন ঘটনাও ঘটেছে কিন্তু তাতে অপরাধী হয়ে বেড়ে ওঠা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে ।

যে সুখ বাবা বাইরে খুঁজতে গিয়েছেন তা কি সন্তানের সাথে সময় দিয়ে পাওয়া যেত না? তিনি যে অর্থ আয়ে সময়ক্ষেপন করেছেন তা কি সন্তানের অপরাধী হয়ে বেড়ে ওঠায় অনর্থ হল না?

বিল গেইটস পর্যন্ত ব্রিটিশ দৈনিক দ্য মিররকে দেয়া এক স্বাক্ষাৎকারে অকপটে একথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় না দিতে পারায় আফসোস করে বলেছেন, এ সময় কাটানো তাঁর জন্য অতি জরুরী কারণ অর্থ থাকাটাই সব প্রশ্নের উত্তর না ।“

বরং কর্মজীবনের সফলতার পাশাপাশি সন্তানের প্রতি দায়িত্ব একজন বাবার ব্যাক্তিত্বে আরও মাধুর্য্য এনে দেয় । তিনি চারপাশের আরও অনেকের অনুকরণীয় হয়ে ওঠেন।

শিশু কিশোরদের মনে ও তার বাবার মত হয়ে ওঠার একটা প্রবণতা দেখা যায় প্রায়ই বলরেত শোনা যায়, ও না ওর বাবার মতন করে চুল আচড়ায়, বাবার মতন করে প্যান্ট –শার্ট পরে ,কিংবা বাবার মতন করে কথা বলে, বাবার ফ্যাশন টা ফলো করে। অনেক সন্তানদের মাঝেই বাবর সাথে বসে মুভি দেখা,শপিংমলে যাওয়া পছন্দনীয় লক্ষ্য করা গেছে ।

কখনো মায়েদের কাছে অভিযোগ পাওয়া গেছে সারাদিন নানারকম বিধি নিষেধ, বা বারন করার কারণে মায়ের থেকে বরং বাবার সাথে সন্তানদের সম্পর্ক ভালো থাকে। বা বাবার বারন করাটাই সন্তানেরা বেশী মনোযোগী হয় । স্কুলের হোমটাস্ক বাবার কাছে বেশী স্বাচ্ছন্দে করতে চায় সন্তানেরা। ছুটির দিনগুলিতেসন্তানেরা বাবার সাথেই দূরে কোথাউ ঘুরতে, খেতে যেতে, সুইমিং করতে পছন্দ করে ।

আসলে এ ভালোলাগাগুলি বরাবরই ছিল সব সমাজে সব সময়ে। মুরারিমোহন সেন বলে উঠেছিলেন –মা রেগে কন –মিনুরে আজ শাসন করা চাই ,দুষ্ট অমন কোথাও আর নাই ।-------সইব না আর আমি তোমার আদর পেয়েই যে ওর বেড়েছে দুষ্টমি । আর বাবার আদরভরা কোলে মিনু আশ্রয় খুজেঁ নিয়েছে ।

সন্তানের ভালো চাওয়াটাতে একটা সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। আবেগের বশবর্তী হয়ে কিছুট খাওয়ালাম, ঘুরতে নিয়ে গেলাম আবার অনেকটা সময় কোন কিছুর খবর রাখলাম না এটা সঠিক ব্যবস্থাপনা নয়। সন্তান লালন পালন একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যা মা ও বাবাকে ভাগাভাগি করে নিতেই হবে। সন্তান লালন পালনে কোন পুরুষতন্ত্র চলে না কর্তৃত্ববাদ ও গ্রহনযোগ্য নয় । বাবা মায়ের যৌথ সমঝোতায় সন্তানের খাওয়া, ঘুম, খেলা, পড়া, এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিস, ছবি দেখা, ঘুরতে যাওয়া সবটাতে ভারসাম্য থাকতে হবে। যৌক্তিক থাকতে হবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জার্নিটা ।

রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতিচর্চা, ধর্মচর্চা সবটাতে মা বাবার একটা জায়গায় এসে সমঝোতা করতেই হবে । দুজনের দু রকমের মত হলে এবং একজনের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্যজন সন্তানকে এগুলোর ওপর শিক্ষাদান করলে সঠিকভাবে আসল শিক্ষাটা দিতে পারবে না। যেমন বাবা যদি অতি ধার্মিক হয়ে সন্তানকে ধর্মীয় আচার অনুসারে চালাতে রক্ষনশীল জীবন যাপনে উৎসাহিত করেন তাতে মা কে ও সমর্থন দিতে হবে । তবে এ সমর্থনে অবশ্যই মিক্ষাটা জরুরী। না জেনে না বুঝে শুধু অনধভাবে যা বলল তাই করা নয়। সত্যিকার অর্থে ধর্মগ্রন্থে কি আছে পাশাপাশি আরও আনুসঙ্গিক বইগুলোতে কি বলছে এই নির্বাচন গুলো করে বাবা ও সন্তানের বাতলে নেয়া পথে ভূল ত্রুটিগুলি শুধরে এগিয়ে যেতে হবে । তাতে করে পরিবারটি ধার্মিক পরিবার হিসেবে গড়ে উঠবে এবং এ গড়ে ওঠায় একটা যৌক্তিক জায়গা পাবে।

আবার বাবা যদি সাংস্কৃতিক মনা হয়ে থাকেন তবে তিনি চাইবেন তার সন্তান গান, নাচ, ছবি আকাঁ,কেলাধূলা এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকুক । সে কারণে এসব চর্চার জন্যও নানারকম প্রতিস্ঠানে নিয়ে গিয়ে সময় দেয়াটাতে বাবা মা দুজনকেই দায়িত্ব নিতে হবে। বাসায় অবসরে সেগুলো থেকে যে শিক্ষা তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তাহলে ওই পরিবারটি একটি সাংস্কৃতিকমনা পরিবার হিসেবে গড়ে উঠবে ।

কিন্তু যদি মূল শিক্ষায় বাবা মায়েরই জ্ঞান কম থাকে ,তবে ধর্মকে গোড়ামী আবার সংস্কৃতি চর্চাকে উগ্রতা বলে সন্তানদের সামনে তারা অকপটে বলতে থাকেন তবে সন্তান আসলে কোন শিক্ষায়ই অর্জন করবে না । বিষন্নতা আর হতাশায় ধর্ম বা সংস্কৃতি কোনটিকেই সে আঁকড়ে ধরবে না ।পরিবারকে আপন না ভেবে বাইরের পরিবেশে আশ্রয় খুঁজবে এবং আরও অপরাধপ্রবন হয়ে উঠবে ।

-রুমানা রশীদ রুমী
লেখিকা।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন