বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৪:৫৪:৩৬ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় বিপদের মুখে ভারত

আন্তর্জাতিক | বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৭ | ০৯:৫০:০৬ পিএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত অক্টোবরে অবশেষে ঘোষণা করেছিলেন, ওবামা প্রশাসনের সই করা বহুল আলোচিত ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিটি ইরান অনুসরণ করে চলছে বলে তিনি প্রত্যায়ন করবেন না।

এই কাজটি করার সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ সব মার্কিন মিত্র, বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক তদারককারী এবং এমনকি তার নিজের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, জয়েন্ট চিফসের চেয়ারম্যান এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নও অগ্রাহ্য করেছেন।

তারা সবাই বলেছে, তেহরান ২০১৫ সালের চুক্তি মেনে চলছে। তবে উপদেষ্টাদের কথা অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিয়ে তিনি ২০১৬ সালে নির্বাচনী প্রচারণার সময় চুক্তিটি থেকে সরে আসার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটি করেননি। তিনি এর বদলে বল ঠেলে দেন মার্কিন কংগ্রেসে।

এখন কংগ্রেসই ইরানের ওপর আবার অবরোধ আরোপের ব্যাপারে নির্দেশিকা তৈরি করবে। পরমাণু চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান তার স্পর্শকাতর পরমাণু কার্যক্রম সীমিত করার বিনিময়ে অবরোধ থেকে মুক্তি পেয়েছিল। ওই অবরোধ আবার আরোপ করা হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নেবে কংগ্রেস।

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ইরান কৌশলের লক্ষ্য ‘ইরানের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী প্রভাব নস্যাৎ করে দেওয়া এবং দেশটির আগ্রাসন বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিদের প্রতি সমর্থন কমানো।’

ট্রাম্পের মতে, ইরানি কর্তৃপক্ষের বৃহত্তর আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডকে বাইরে রেখে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির প্রতি ওবামা প্রশাসনের নজর নিবদ্ধ করায় গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলে ব্যাপকভাবে প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে ইরান।

ইরাকে তা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে ইরানি কুর্দি বাহিনীর প্রধান কাসিম সোলেমানি উত্তর ইরাকের প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তানের (পিইউকে) নেতাদের সাথে দেখা করেছেন।

এই সফরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিইউকে যোদ্ধারা কিরকুক থেকে প্রত্যাহার হতে শুরু করে। ফলে ইরাকি বাহিনী এবং ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা নগরীতে ঢুকে এর তেল ক্ষেত্রগুলো ঘিরে ফেলার কাজ দ্রুত করতে সক্ষম হয়। যুক্তরাষ্ট্র এতে বিস্মিত হয়, তার ইরাক নীতি বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়।

কিন্তু ট্রাম্পের নতুন ইরান কৌশল ঘোষণা করার পরও হোয়াইট হাউজের একটি অংশ মনে করে, তাদের উচিত ইরান চুক্তিতে অনড় থাকা। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালে বলেছেন, আমাদের চুক্তিতে থাকা উচিত। ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচআর ম্যাকমাস্টার বলেন, প্রেসিডেন্ট এখনো চুক্তি থেকে সরে আসেননি।

তবে তিনি ইরানি আচরণকে সমর্থন করতে অস্বীকার করেন এই বলে যে, তারা সত্যিই চুক্তি মেনে চলছে কিনা তা আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারছি না। তারা বিশ্বাসযোগ্য সরকার নয়।

ট্রাম্পের অভিমত প্রত্যাখ্যান করে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা চুক্তিটি রক্ষা করবে। ট্রাম্পের চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়া প্রতিরোধে ইউরোপিয়ান কর্মকর্তারা ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার চেষ্টা করলেও তাদের মধ্যে টানাপোড়নেরও সৃষ্টি হয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতিক্রিয়া ছিল প্রত্যাশামূলক আগ্রাসী। তিনি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর চুক্তিকে সমর্থন করার বিষয়টি স্বাগত জানালেও যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলে ইরান তা বাতিল করে দেবে বলে জানান।

ট্রাম্পকে টার্গেট করে তিনি বলেন, নরপশু মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেঁচামেচি আর মিথ্যাচারের জবাব দিয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না। মধ্যপ্রাচ্য এখন নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাওয়ায় ইরান সম্ভবত এই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রও এজন্য অনেকটা দায়ী। কারণ ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে তারাই অপসারণ করেছে। অথচ তিনিই তেহরানকে কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করে আসছিলেন। সাদ্দামের অনুপস্থিতিতে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

আঞ্চলিক বাস্তবতাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে ইরান তার পররাষ্ট্র নীতি এজেন্ডা প্রণয়ন করেছে। ইসলামিক স্টেট ওই অঞ্চল থেকে সরে যেতে থাকায় ইরাক ও সিরিয়া এখন ভাগাভাগি করে নেওয়ার সম্পদে পরিণত হয়েছে।

ইরাকের শিয়া-প্রাধান্যবিশিষ্ট সরকার এবং দেশটির অনেক মিলিশিয়া বাহিনীর ওপর ইরানের প্রভাব থাকায় তেহরান এখন ইরাকের রাজনৈতিক ভবিষ্যত গড়ার নজিরবিহীন সুযোগ পেয়ে গেছে। আর সিরিয়ায় মার্কিন-সমর্থিত গ্রুপগুলোর চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ইরান-সমর্থিত আসাদ টিকে যাচ্ছেন।

ফলে ট্রাম্পের হুমকি সত্ত্বেও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ইরান এখন এই অঞ্চলে অনেক ভালো অবস্থায় আছে। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনায় ইরানের সাথে কাজ করতে ভারতের কৌশলগত সুযোগ কমে আসছে।

নয়া দিল্লি ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি সমর্থন করেছিল। নতুন ইরান নীতিতে ওয়াশিংটন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে ভারতকে হয়তো নিকট ভবিষ্যত পর্যন্ত খুব একটা উদ্বেগে ভুগতে হবে না।

তবে ভারতের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো চাবাহার বন্দর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ধীর গতি। বিষয়টি ইরানকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। আবার ইরান এ ইঙ্গিতও দিয়েছে, এ বন্দরটি কেবলমাত্র ভারতের জন্যই নয়, যদিও নয়া দিল্লি এর উন্নয়নে সম্পৃক্ত।

এতে কাজ করার জন্য পাকিস্তান ও চীনকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। চাবাহারকে বিবেচনা করা হয়েছিল গোয়াদর বন্দরের বিকল্প। ভারত মনে করেছিল, চাবাহার দিয়ে পাকিস্তানকে ফাঁদে ফেলা যাবে, স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তানে যাওয়ার রুট বের করা যাবে।

এখন এই প্রকল্পে চীন ও পাকিস্তানকে আনা হলে তা ভারতের স্বার্থকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। বৃহত্তর বাণিজ্য ও জ্বালানি চুক্তিগুলোও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সেগুলোও দ্রুত সংশোধন করা দরকার।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, কিংস কলেন, লন্ডন এবং ডিসটিংগুইশড ফেলো, অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন, নয়া দিল্লি।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন