মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮ ০৮:২৮:১৮ এএম

যেভাবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উত্থান

আন্তর্জাতিক | শুক্রবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৭ | ০২:৫৯:০৩ পিএম

সৌদি আরবের উত্তরাধিকারী যুবরাজ (ক্রাউন প্রিন্স) মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশে দেশটির এত বেশি হোমরাচোমরাকে আটক করা হয়েছে যে, রিটজ কার্লটন হোটেলে আর কুলোচ্ছে না।

৫ তারকা এই হোটেলকেই ব্যবহার করা হচ্ছে ‘ভিআইপি বন্দিশালা’ হিসেবে। ৪ঠা নভেম্বর থেকে দেশটিতে দুই শতাধিক প্রিন্স, মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে। রিটজ কার্লটন হোটেলের ওপর চাপ কমাতে আরেকটু কম বিলাসবহুল ম্যারিয়ট হোটেলেও রাখা হচ্ছে অনেক বন্দিকে।

পুরো আটকাভিযানকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে দুর্নীতি-বিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এই ধরপাকড় হলো, যুবরাজের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন করার নামান্তর। তবে সৌদি আরব এক বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে আরও নাটকীয় অনেক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।

আগামী গ্রীষ্ম থেকেই সৌদি আরবে প্রথমবারের মতো নারীরা গাড়ি চালনার অনুমতি পাবেন। কয়েক দশক পর সিনেমা খুলে দেয়া হবে। নতুন নতুন পর্যটনকেন্দ্রও খোলা হচ্ছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তীরবর্তী অঞ্চলে ৫০০ বিলিয়ন (৫০ হাজার কোটি) ডলার ব্যায়ে একটি উচ্চপ্রযুক্তির অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে চায় সৌদি আরব।

এই পুরো কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দু হলেন মোহাম্মদ বিন সালমান, যাকে সংক্ষেপে বলা হয় এমবিএস। তরুণ এই উত্তরাধিকারী যুবরাজ কয়েক দশকের মধ্যে সৌদি আরবের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসকে পরিণত হওয়ার পথে। কিন্তু এই বিপুল ক্ষমতা ও প্রভাব তিনি কীভাবে অর্জন করলেন?

আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা হলেন বাদশাহ আবদেল আজিজ ইবন সৌদ। তিনিই নিজের পিতা ‘সৌদে’র নামে রাষ্ট্রের নাম রাখেন সৌদি আরব। কিন্তু আবদেল আজিজের পুত্র ছিলেন কয়েক ডজন! তাই তিনি ঠিক করে দিলেন, তার উত্তরাধিকারী হবেন এক পুত্র, তার পর আরেক পুত্র। এভাবে তার সব পুত্রেরই বাদশাহ হওয়ার কথা, যদি বেঁচে থাকেন।

আবদেল আজিজের মৃত্যুর পর দেশের বাদশাহ হন তার ছেলে সৌদ। কিন্তু ১১ বছর শাসন করার পর সৌদকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আংশিক কারণ ছিল এই যে, তিনি নিজের ভাইয়ের বদলে ছেলেকে উত্তরাধিকারী করতে চান বলে রাজপরিবারের অনেকে মনে করছিলেন।

তাকে উৎখাতের পর তার ভাই ফয়সাল বাদশাহ হন। অন্য ভাইরা পান গুরুত্বপূর্ণ পদ। এক ভাই পান সেনাবাহিনী দেখভালের দায়িত্ব, আরেক ভাই হয়ে যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এভাবেই মূলত সৌদি আরবে প্রতিষ্ঠিত হয় এক ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা, যা দেশটির স্থিতিশীলতার নেপথ্য শক্তি।
কিন্তু ধীরে ধীরে আবদেল আজিজের পুত্ররা বয়স্ক হতে থাকেন।

এদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়স্ক যিনি, তার বয়স এখন ৭০ বছর! বর্তমান বাদশাহ সালমানের ছোট ভাই তিনি। বাদশাহ সালমানও বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বুড়ো শাসকরা আধুনিক ও তারুণ্যে ভরপুর রাষ্ট্রটিকে চালাতে হিমশিম খেয়েছেন। বর্তমানে দেশের ২ কোটি জনসংখ্যার ৫৯ শতাংশই ৩০ বছরের কম বয়সী।

বাদশাহ সালমান সম্ভবত এ কারণেই নিজের একমাত্র ছোট ভাইটিকে উত্তরাধিকারের ক্রম থেকে সরিয়ে রাজপরিবারের অপেক্ষাকৃত এক তরুণ সদস্যকে উত্তরাধিকারী বা ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে মনোনীত করেন।

তিনি ছিলেন তারই এক মৃত ভাইয়ের ছেলে, মোহাম্মদ বিন নায়েফ। কিন্তু মোহাম্মদ বিন নায়েফ মাত্র দুই বছর ক্রাউন প্রিন্স থাকতে পেরেছেন। এ বছরের জুনে বাদশাহ তাকে পদচ্যুত করেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত করেন নিজের প্রিয়তম পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানকে।

সৌদি ইতিহাসে এবারই প্রথম বাদশাহর আনুষ্ঠানিক উত্তরাধিকারী হলেন তার নিজ ছেলে। ক্রাউন প্রিন্সের পদ হস্তগত করেই মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতা সুসংহত করতে একদমই সময় নেননি। বাদশাহর নাম ব্যবহার করে ধরপাকড় চালিয়ে, তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর তিনটি শাখাই নিজের দখলে নিয়েছেন।

ঐতিহ্যগতভাবে এই তিনটি শাখা রাজপরিবারের তিন প্রধান অংশের মধ্যে বিন্যস্ত ছিল। কিন্তু এখন সব মোহাম্মদ বিন সালমানের কব্জায়। সৌদি আরবের ইতিহাসে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন রাজপরিবারের বাইরের কেউ। তিনি একজন কূটনীতিক।

বাদশাহ আর যুবরাজের ইচ্ছাতেই তিনি এ পদ পেয়েছেন। রাজপরিবারের ভারসাম্যের নীতির আওতায় আগে এই পদে থাকতেন আরেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের একজন। সেপ্টেম্বরে, পুলিশ দেশটিতে কয়েক ডজন সমালোচককে আটক করে। এদের মধ্যে দু’জন প্রখ্যাত ইসলামী স্কলারও ছিলেন।

দৃশ্যত, ওই আটকের মধ্যে যে আক্রমণাত্মক বার্তা ছিল, সেটির ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। যেমন, নারীদের গাড়ি চালনার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা সরকার প্রত্যাহার করলেও, দেশটির রক্ষণশীল সমাজে কেউ এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করছে না। এমনকি এখন যে ধরপাকড় চলছে, তা নিয়েও সৌদি আরবে কোনো কথাবার্তা নেই।

সৌদি রাজপরিবার পরিচালিত হয় পরিবারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশের মধ্যে ভারসাম্য বিধানের মাধ্যমে। পরিবারের মধ্যে কোনো বিরোধ হলে তা নিষ্পত্তি হয় সমঝোতার মাধ্যমে। মুরব্বিরাই সাধারণত সব কিছুর হর্তাকর্তা। বাদশাহও ওই মুরব্বিদের একজন, কিন্তু তিনি পদাধিকারবলে এক নম্বর মুরব্বি। শেষ সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা তারই।

কিন্তু তার ছেলে এই ভারসাম্যের ব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছেন। তিনি নিজেকে এক তরুণ সংস্কারক হিসেবে মেলে ধরছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি সৌদি আরবকে পরিপূর্ণ রাজশাসনের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন, যেখানে শাসক ছাড়া আর কারও কথার কোনো দাম থাকবে না।

যুবরাজের পক্ষের লোকজন বলছেন, এই পরিবর্তন দরকার ছিল। তেলের দাম নিম্নগামী। দেশের অর্থনীতিতে বৈচিত্র আনা প্রয়োজন। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা দুর্নীতির কারণে অপরিমেয় অর্থ হারিয়েছে দেশ।

নিজের সমকালীন অন্যান্য প্রিন্সের চেয়ে যুবরাজ মোহাম্মদ পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ও কঠোর পরিশ্রমী বলে মনে করা হয়। কিন্তু তার কর্মকাণ্ড এখন পর্যন্ত অস্থিতিশীলতা বৈ কিছুই বয়ে আনেনি। অপরিণামদর্শী লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়ার ঝোঁক আছে তার।

ইয়েমেনে ব্যয়বহুল যুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিবেশী কাতারকে অবরুদ্ধ করার বিফল চেষ্টা- সবই তার ইচ্ছাতে হয়েছে। দেশে তিনি দীর্ঘদিন অনুসৃত পারিবারিক সম্মতিকেন্দ্রিক রাজনীতির ইতি টানছেন। অথচ, রাজপরিবারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশের মধ্যে ভারসাম্য থাকায় এতদিন দেশে স্থিতিশীলতা ছিল।

প্রিন্স মোহাম্মদের বয়স মাত্র ৩২। তার পিতার চেয়েও ৪৯ বছরের ছোট। দশকের পর দশক ধরে দেশ চালানোর বয়স তার আছে। কিন্তু তার শত্রুর তালিকা এখনই অনেক দীর্ঘ। (ইকোনমিস্ট অবলম্বনে) এমজমিন

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন