বুধবার, ২৪ জানুয়ারী ২০১৮ ০৫:৫৬:৩০ পিএম

গোপন পরিচয়ে রোহিঙ্গাদের বাসা ভাড়া, অতঃপর..

জাতীয় | শনিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৭ | ০১:৪৯:৩৩ এএম

অবস্থাপন্ন ও সচ্ছল রোহিঙ্গারা সরকার নির্ধারিত এলাকার আশ্রয় শিবির ছেড়ে ভাড়া বাসায় আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন। অন্তত অর্ধলাখ রোহিঙ্গা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার শহরের পাশাপাশি টেকনাফ, উখিয়া, রামু ও চকরিয়া উপজেলা শহরের ভাড়া বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়ির মালিকদের সঙ্গে আপসে ভাড়াটিয়া হিসেবে বাসা ভাড়া নিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে বাসা ভাড়া নিচ্ছেন রোহিঙ্গারা। এ ছাড়া অতিরিক্ত ভাড়ার লোভে একশ্রেণির বাড়ির মালিক স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গাদের বাসা ভাড়া দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ।

২৫ আগস্টের পর নতুন আসা রোহিঙ্গাদের একটি অংশ অর্থশালী এবং কারও কারও আত্মীয়স্বজন প্রবাসে থাকায় তারা ভাড়া বাসায় যাচ্ছেন। এদের পুনরায় সরকার নির্ধারিত আশ্রয়শিবিরগুলোয় পাঠাতে গত রবিবার থেকে উখিয়া-টেকনাফে অভিযানে নেমেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

প্রথম দিনেই রোহিঙ্গাদের বাসা ভাড়া দেওয়ার অপরাধে টেকনাফের তিন বাড়ির মালিককে আটক ও ১৩৩ রোহিঙ্গাকে ক্যাম্পে ফেরত পাঠিয়েছে আদালত। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা এবং বাঙালিদের সঙ্গে চেহারা ও শারীরিক গঠনে মিল থাকায় আর্থিক অবস্থাপন্ন রোহিঙ্গারা এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন।

তারা ক্যাম্পে না গিয়ে চলে যাচ্ছেন বিভিন্ন বাসাবাড়িতে। এ ছাড়া প্রশাসনের নজরদারি ফাঁকি দিয়ে রোহিঙ্গাদের একাংশ কক্সবাজার শহর, রামু ও চকরিয়া উপজেলা শহরে গিয়ে ভাড়া বাসায় উঠেছেন। অন্যদিকে ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা ঢল আসার শুরুর দিকে প্রশাসনিক নজরদারি কম থাকায় অনেকে চট্টগ্রাম শহরে আত্মীয়স্বজনের বাসাবাড়িতে উঠেছেন।

কেউ কেউ চট্টগ্রাম নগরের একটু দূরবর্তী স্থানে গিয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে বসতি শুরু করেছেন। সব মিলে এই সংখ্যা অর্ধলাখের মতো হবে বলে জানান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়রা। তবে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টেকনাফ থেকে কক্সবাজার-চট্টগ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টে ৩৬টি চেকপোস্ট বসিয়েছে।

শত শত রোহিঙ্গা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টায় ধরাও পড়েছেন। বিশেষ করে টেকনাফ-কক্সবাজারের লিংক রোড এলাকা থেকে বিভিন্ন যানবাহন তল্লাশি করে প্রতিদিন রোহিঙ্গাদের আটক করে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়। এ ছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের বাড়ি ভাড়া না দিতে কয়েক দফা মাইকিংও করা হয়েছে।

তারপরও কোনো কোনো বাড়ির মালিক অতিরিক্ত ভাড়া লাভের সুযোগে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় বাসা ভাড়া দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতেই শুরু হয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার শহরের ঘোনারপাড়া এলাকায় একাধিক বাড়িতে অবস্থান নিয়েছেন বেশ কিছু রোহিঙ্গা।

এ ছাড়া শহরের কাছাকাছি টেকনাইপ্যা পাহাড়, বইল্যাপাড়া, সমিতিপাড়াসহ একাধিক স্থানে অবস্থান নিয়েছেন অনেকেই। এদের কেউ ভাড়া বাসায়, আবার কেউ পরিচিত স্বজনদের কাছে থাকছেন। চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া, কালুরঘাট, হাটহাজারী, সীতাকুণ্ড এলাকায়ও রোহিঙ্গারা পরিচয় গোপন রেখে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেছেন।

র‌্যাব-৭-এর কক্সবাজার ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের কিছু লোক শহরমুখী হচ্ছেন। আমরা তাদের প্রতিরোধ করে ক্যাম্পে ফেরত পাঠাচ্ছি। মঙ্গলবারও ২১০ জন রোহিঙ্গাকে চেকপোস্টে আটকের পর উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এভাবে গত এক সপ্তাহে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।’

উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আবুল খায়ের বলেন, ‘বাংলাদেশি পরিচয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকলেও রোহিঙ্গাদের আমরা শনাক্ত করবই। তারা আঞ্চলিক ভাষা জানলেও শুদ্ধ বাংলায় তো কথা বলতে পারেন না।

ভেলায় চড়ে এলো ১৩৩ রোহিঙ্গা : গতকাল বিকালে শাহপরীর দ্বীপে ভেলায় চড়ে মিয়ানমারের ধংখালী থেকে আরও ১৩৩ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু অনুপ্রবেশ করেছে বলে স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে ভেলায় চড়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তের শূন্য রেখায় আরও ৬৫০ রোহিঙ্গা : আবারও উখিয়ার পালংখালী আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় অনুপ্রবেশ করেছে ৬৫০ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু। বৃহস্পতিবার রাতেই তারা নাফ নদ পার হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে চলে আসে।

বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সীমান্তের ওপারে প্রচণ্ড গোলাগুলির ঘটনার পরপরই এসব রোহিঙ্গা আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে চলে আসতে শুরু করে। গেল সপ্তায়ও এই সীমান্ত দিয়েই কয়েক দফায় অন্তত ৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।

এর আগে ১৫ অক্টোবর এক দিনে একই সীমান্ত দিয়ে অন্তত অর্ধলাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে, যা ছিল এ পর্যন্ত আসা রোহিঙ্গার সবচেয়ে বড় স্রোত। বৃহস্পতিবার নতুন অনুপ্রবেশ করা এই রোহিঙ্গারা আঞ্জুমানপাড়া অতিক্রম করে ক্যাম্প এলাকার দিকে যেতে চাইলে সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবির সদস্যরা তাদের বাধা দেন।

তাই দিনভর খোলা আকাশের নিচে অবস্থান গ্রহণ করেন রোহিঙ্গারা। তবে যাচাই-বাছাই ও তল্লাশি শেষে তাদেরও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানান বিজিবির দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।

গতকাল আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এখনো যে কয়েকটি পাড়ায় রোহিঙ্গা রয়েছে, তাদের ওপরও বুধবার থেকে নতুন করে নির্যাতন শুরু হয়েছে। নতুন করে রোহিঙ্গা পাড়াগুলোয় আগুন দেওয়া হচ্ছে। ভয়ভীতি ও নির্যাতন করে ভিটেবাড়িছাড়া করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বিজিপি সদস্যরা।

সেই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ওপর এসব নির্যাতন-নিপীড়নে সহযোগিতা করছে স্থানীয় মগ-মুরংদের লুনঠিন বাহিনী। তারা জানান, মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে কুয়াংসিদং, ধংখালীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে হাজার হাজার রোহিঙ্গা এখনো অপেক্ষায় রয়েছে উখিয়ার লম্বাবিল, আঞ্জুমানপাড়া, থাইংখালী, টেকনাফের হ্নীলার উনছিপ্রাং, দক্ষিণপাড়া সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের জন্য।

এদিকে বিজিবির কক্সবাজার ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান জানান, বৃহস্পতিবার রাতে প্রায় সাড়ে ছয় শ রোহিঙ্গা উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে তাদের মানবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের আলোকে তাদের ক্যাম্পে পাঠানো হবে।

আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে স্থানীয় দোকানদার এনামুল হক জানান, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে হঠাৎ ছোট ছোট আলো দেখা যায়। একটু পর আলোর সংখ্যা বাড়তে থাকে, কাছে যেতেই মানুষের কথাবার্তা কানে আসে। ভোর হলে দেখা যায় আবারও রোহিঙ্গার একটি দল সীমান্তে জড় হয়। সকাল থেকে বিজিবির অনেক কর্মকর্তা সেখানে গেছেন, তবে কাউকে এদিকে ঢুকতে দেননি।

আঞ্জুমানপাড়ায় রাখাইনের বুসিডং উলাফের রোহিঙ্গাপাড়া থেকে আসা আবদুল মাবুদ জানান, তারা বাড়ি থেকে বের হয়েছেন ১১ দিন আগে। নদী-নালা, খাল-বিল ও পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় এলে তাদের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি দল বাধা দেয়।

এ সময় তাদের দলে প্রায় ২০০ রোহিঙ্গা ছিল। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের কাছ থেকে টাকাপয়সা যা যা ছিল সব লুট করে নিয়ে গেছে। যারা দিতে গড়িমসি করেছে, তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছে সেনা ও তাদের সহযোগী লুনঠিন বাহিনী। বিডি প্রতিদিন

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন