মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ ০১:১২:১৬ এএম

কালাপানি এখন পর্যটন নগরী আন্দামান

সাদ্দাম উদ্দিন আহমদ | লাইফস্টাইল | রবিবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৭ | ০৪:২৬:২৩ পিএম

মানুষের জানার শেষ নেই। তাই ভ্রমণপিপাসুরা পৃথিবীটাকে ঘুরে দেখতে চায়। জয় করতে চায় সারা বিশ্বকে। তেমনি অজানা রহস্যে ঘেরা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপূর এ দর্শনীয় স্থান ঘুরে আসতে পারেন বন্ধু-বান্ধবসহ বা পরিবারসহ।এখন কালিপানিই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ নামে পরিচিত সবার কাছে।

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ বিবরন:-

ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। যার পূর্বে আন্দামান সাগর ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। এর রাজধানী আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ার। দ্বীপপুঞ্জটি প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই আদিবাসীদের আবাসভূমি। বহিরাগতদের এই দুই দ্বীপপুঞ্জটি নেগ্রিটো ও মঙ্গোলয়েডের অধিকারে ছিল।

ব্রিটিশ সরকার এখানে কারাগার তৈরি করে ২০০ বন্দীকে রাখেন। ২০০ জনেরই অধিকাংশই ছিলেন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী সৈনিক। সেখানে সেলুলার জেল তৈরি হলে কারাগারটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ একত্রে স্বাধীন ভারতের অঙ্গীভূত হয় ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট।

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ বর্তমানে পর্যটন নগরী হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। উপাধি পেয়েছে “পান্না দ্বীপপুঞ্জ” হিসেবে। সুন্দর লোকালয়, সূর্য-চুম্বিত সমুদ্র সৈকত, পিকনিক স্থল এবং বিভিন্ন সৌন্দর্যের জন্য পর্যটন ব্যবস্থায় আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে। রয়েছে হ্যাভলক, সিনকিউ, ছাতাম, ভাইপার, রস, ব্যারেন এবং রেড স্কিন, প্রাক্কালীন অন্ধকূপ, জীবন্ত আগ্নেয়গিরি, মধ্যযুগীয় কাঠচেরাই কারখানা (শ্য মিল), বিচিত্র বর্ণের প্রবাল ও আরও অনেক কিছু। এতে রয়েছে- নানা পিকনিক স্থল; যেমন চিড়িয়া তাপু, মাউন্ট হ্যারিয়েট ও কোরবাইন’স কোভ টু্রজিম্ কমপ্লেক্স – যা নিজস্ব বিনোদনের জন্য আনন্দদায়ক স্থলের চাহিদা পূরণ এবং জীবনের মজাদার ও প্রফুল্লময় মুহূর্তগুলির অভিজ্ঞতা প্রদান করে। মিউজিয়ামগুলির মধ্যে রয়েছে- ফরেস্ট মিউজিয়াম, সমুদ্রিকা অফ নাভাল মেরিন্ মিউজিয়াম, ন্যাশনাল মিউজিয়াম ও আ্যনথ্রোপলোজিক্যাল মিউজিয়াম। অন্যদিকে স্মৃতিস্তম্ভের মধ্যে রয়েছে সেলুলার জেল, ভাইপার আইল্যান্ডের ফাঁসিকাঠ – যা বহু পর্যটকদের আকর্ষিত করে।

আন্দামানে দর্শীয় স্থানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থানগুলি   লং আইল্যান্ড, সেলুলার জেল, আ্যনথ্রোপলোজিক্যাল মিউজিয়াম, মহাত্মা গান্ধী মেরিন ন্যাশনাল পার্ক ।

 

নিকোবরে দর্শনীয় স্থান-

নিকোবরের অন্যতম আকর্ষণ নানা ধরনের পাখি আর নান বর্ণের ফুল, বৈচিত্রময় সমুদ্র সৈকত এখানের সবকিছু প্রকৃতি তার নিজের মতোকরে অপরুপে সাজিয়ে নিয়েছে। ইন্দিরা পয়েন্ট যা অনেকের কাছে বাতিঘড় হিসেবেও পরিচিত । সৈকতের জন্য ভ্রমন প্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয় কচল দ্বীপ। প্রাকৃতির সৌন্দর্য দেখতে অনেকেই কার নিকোবর ও গ্রেট নিকোবরে যান। শ্বেত বালুকাময় সৈকত আর স্বচ্ছ কাচের মতো পানি আপনাকে নিকোবরে যাওয়ার আনন্দ বাড়িয়ে দিবে। নিকোবরে দর্শীয় স্থানগুলি মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থানগুলি ইন্দিরা পয়েন্ট, কার নিকোবর , কটচল, গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড।

 

সেলুলার জেল-

ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে কাজ করছে এমন অভিযুক্তদেরকে আন্দামানে নির্বাসনে পাঠানো হতো, বন্দি করে রাখা হতো গরাদের পিছনে। স্বাধীনতা সংগ্রামের যোদ্ধাদের দুর্বিষহ জীবনের সাক্ষী সেসুলার জেলটি পরিদর্শনে আসেন অনেকেই।

 

মহাত্মা গান্ধী মেরিন ন্যাশনাল পার্ক-

দর্শনার্থীরা যেই কয়েকটা জায়গা দেখতে আসেন তার মধ্যে অন্যতম স্থান মহাত্মা গান্ধী মেরিন্ ন্যাশনাল পার্ক। এখনে দর্শনার্থীরা দেখতে পান সামুদ্রিক জীব-জন্তুদের জীবনযান এবং বিরল প্রজাতীর প্রবাল। জায়গাটি পরিবার পরিজন, বন্ধ-বান্ধব নিয়ে ঘুড়ে বেড়ানো অথবা একা একা বসে বসে প্রাকৃতিক সৈান্দর্য উপভোগ করার জন্যও উৎকৃষ্ট।

 

লং আইল্যান্ড-

যারা কখনো ডলফিন দেখেননি, অথবা যারা ডলফিন আগে দেখেছেন সেই স্মৃতিটা এখনো ভুলতে পারেননি আবারও দেখতে চান তাহলে যেতে পারেন লং আইল্যান্ড। ভ্রমণপ্রেমিদের জন্য অন্যতম ভ্রমণের স্থান লং আইল্যান্ড, সেখানে গিয়ে দেখতে পাবেন ডলফিনদের রক্ষণাবেক্ষণ। আর বালুকাময় সৈকত তো রয়েছেই।

ইন্দিরা পয়েন্ট-

নিকোবরে অনেকগুলি দর্শনীয় স্থান রয়েছে। প্রত্যেকটার স্থানেরই রয়েছে আলাদা আলাদা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। প্রতিবছরই অসংখ্য দর্শনার্থীরা ভিড় করে নিকোবরে। নিকবরের দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম স্থান ইন্দিরা পয়েন্ট। ইন্দিরা পয়েন্টের বিশেষ আকর্ষণ আকামচুম্বী লাইট হাউজ অথবা বাতিঘর যা জাহাজের জন্য ল্যান্ডমার্ক হিসেবে কাজ করে। ইন্দিরা পয়েন্টোর সমুদ্র সৈকতের মনোমুগ্ধকর সৈান্দর্য প্রকৃতি প্রেমিদের শুধু মুগ্ধই করে বার বার যেতে উৎসাহী করে। ইন্দিরা গান্ধী জায়গাটিতে ভ্রমণের পর থেকেই জায়গাটির নাম ইন্দিরা পয়েন্ট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

 

আ্যনথ্রোপলোজিক্যাল মিউজিয়াম-

এখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের হস্ত নির্মিত বিভিন্ন ধরনের জিনিস সংরক্ষণ করা কয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে আ্যনথ্রোপলোজিক্যাল মিউজিয়ামে জাতিগত ঐতিহ্যের ছাপ সংরক্ষণ করে রাখা হয়।

কার নিকোবর-

দ্বীপপুঞ্জে ছুটি কটানোর জন্য আথবা ভ্রমণের জন্য কার নিকোবরের তুলনা হয় না। দ্বীপটিতে আপনি দেখতে পাবেন সারি সারি নাকিকেল গাছ। নারিকেল গাছ সেখাকার লোকজনের বাণিজ্যের আর খাবারের প্রধান উপকরণ।

কার নিকোবরে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ, বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। এখানের প্রাকৃতির সৌন্দর্য বিশেষ করে অরণ্য আর সমুদ্রতীর ভ্রমণ পিপাসুদের আকর্ষণ করে। এছাড়াও সেখানে আপনি দেখতে পাবেন বিশেষভাবে নির্মিত কুরে ঘর, কুরে ঘরের মেঝে মাটি থেকে বিভিন্ন উচ্চতায়, ঘড়ে উঠার সিড়িগুলিও ভ্রমণ পিপাসুদের আকর্ষণ করে। আর সমুদ্রের গর্জন আপনাকে মুগ্ধ করে দিবে। ভ্রমণ শেষে ফিরে আসার পরও আপনি বার বার ছুটে যেতে চাইবেন দ্বীপটিতে।

গ্রেট নিকোবর দ্বীপ-

প্রতিবছরই সারা বিশ্ব থেকে দর্শনার্থীরা আসেন তাদের প্রিয় স্থান গ্রেট নিকোবর দ্বীপে। এই দ্বীপের বিশেষ আকর্ষণ বিভিন্ন ধরনের অর্কিড। দ্বীপটি কচ্ছপের বসবাসের জন্যও উপযুক্ত স্থান । এখানের প্রকৃতি সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ করে।

কচল-

অতুলনীয় সুন্দর দ্বীপ কচল। শীত ও গ্রীষ্ম দুই ঋতুতেই এখানে যেতে পারেন, সব সময়ই আপনাকে মুগ্ধ করে দিবে। সামুদ্রিক মাছ ও প্রবাল দ্বীপের কচলে সাঁতার কাটার জন্য এবং সমুদ্রস্নান করার জন্যও উৎকৃষ্ট। এখানে রয়েছে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর সমারোহ। এখানে কাচের জলের মত স্বচ্ছ জল দেখতে পাবেন।

আন্দামান ও নিকোবরে পৌঁছানোর উপায়-

জল পথে-

দ্বীপপুঞ্জে কিভাবে যাবেন আগে থেকেই ঠিক করে নিন যদি স্বল্প সময়ে খুব সহজেই যেতে চান তাহলে, যেতে হবে আকাশ পথে। আর আপনি যদি হাতে সময় বেশি নিয়ে যেতে চান, সমুদ্র ভ্রমণের ইচ্ছে থাকে তাহলে যেতে হবে জল পথে।

জল পথে যেতে হলে ভারতের কলকাতা, চেন্নাই, ভিষাখাপত্তনমের থেকে দ্বীপপুঞ্জের পোর্ট ব্লেয়ারে যেতে হবে। কলকাতা থেকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই পোর্ট ব্লেয়ারের উদ্দেশ্যে জাহাজ ছেড়ে যায়, আর ভিষাখাপত্তনম থেকে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ে একবার জাহাজ যাওয়া যায়। জল পথে দ্বীপপু্ঞ্জে পৌঁছাতে প্রায় তিন দিন সময় লাগবে।

আকাশ পথে-

হাতে সময় কম থাকলে দ্বীপপুঞ্জে যেতে পারেন আকাশ পথে। কলকাতা ও চেন্নাই থেকে দ্বীপ পুঞ্জের পোর্ট ব্লেয়ারে যাওয়ার জন্য কয়েকটি বিমানবন্দর থেকে যেতে পারেন।ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস, জেট এয়ারওয়েজ এবং এয়ারডেক্যান এই দ্বীপের উদ্দেশ্যে ফ্লাইট ছিড়ে যায়। দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার জন্য সব চেয়ে সহজ মাধ্যম আকাশ পথ, মাত্র দুই ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে।

খাবারের ব্যবস্থা-

এখানে খাওয়া দাওয়ার জন্য রেস্তোরার অভাব হবে না। বিভিন্ন ধরনের রেস্তোরা রয়েছে। এসব রেস্তোরায় নানা দামের এবং নানা ধরনের খাবার পাওয়া যায়। এখানে নিরামিষ ও আমিষ দু’ধরনের খাবারই পাওয়া যায়। ইচ্ছে করলে খেতে পারেন কাঁকড়া, মাছ, গলদা চিংড়িসহ আরও অনেক কিছু। শুধু ভারতীয় নয় চীনা জাতীয় খাবারও পাওয়া যায় এখানে। শুধু মনে রাখবেন এখানে একেক হোটেলের খাবারের ধরন একেক রকম হতে পারে।

কোথায় থাকবেন-

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে থাকার জন্য রয়েছে সব ধরনেরই হোটেল, আপনি আপনার চাহিদা অনুযায়ী হোটেল খুব সহজেই পেয়ে যাবেন। রিসোর্ট, রেস্তোরা ও ক্যাফের খোঁজ পেতে আপনার কোন সমস্যাই হবে না। শুধু মনে রাখবেন পর্যটন মৌসুমে হোটেল ভাড়া অফ সিজনের চেয়ে অনেকটাই বেড়ে যায়। জনপ্রিয় হোটেলগুলির মধ্যে অন্যতম আন্দামান টিল হাউজ, টার্টেল রিসোর্ট, হাওয়াবিল নেস্ট।

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ-এ কেনাকাটা-

এ দ্বীপে রয়েছে কেনাকাটার জন্য অনেক মার্কেট। মার্কেটগুলির মধ্যে পোর্ট ব্লেয়ার অন্যতম। দোকানে রয়েছে প্রবাল, ঝিনুকের হস্ত নির্মিত বিভিন্ন ধরনের জিনিস। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কাঠের জিনিসপত্র। সমুদ্রতীরে বসে থাকার জন্য কিনতে পারেন নারিকেল পাতার তৈরি মাদুর। বাঁশের তৈরি জিনিসও পাওয়া যায়।ইটিভি।


খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন