সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭ ০২:৪১:৪৭ পিএম

নিখোঁজের ৮১ দিন পর ফিরে এসে সেই ‘ভয়ার্ত অভিজ্ঞতা’র কথা বর্ণনা করলেন অনিরুদ্ধ!

নগর জীবন | সোমবার, ২০ নভেম্বর ২০১৭ | ০২:০৫:১৭ পিএম

সাধারণত অপহরণ হওয়ার পরে ভাগ্যক্রমে ফিরে আসা কেউ কথা বলেন না বলে ধারণার মধ্যে ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায় মুখ খুলেছেন। রহস্যজনকভাবে নিখোঁজের ৮১ দিন পর ফিরে আসা বেলারুশের এই অনারারি কনসাল গতকাল রোববার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে নিজের ব্যবসায়িক অংশীদারকে দায়ী করেন। তিনি গণমাধ্যমে একটি চিঠি পাঠিয়ে এ অভিযোগ আগে জানান। পার্টনার মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন অবশ্য তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে অসত্য বলেছেন।

গত ২৭ আগস্ট গুলশান ১ নম্বর থেকে নিখোঁজ হন অনিরুদ্ধ। সাক্ষাতে অস্বীকৃতি জানালেও টেলিফোনে ১৮ মিনিট কথা বলেন তিনি।

তার বর্ণনা : ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে নামার পরপরই আমাকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। কোথায় নিয়ে যায়, তা বুঝতে পারিনি। গাড়ির জানালায় বোধ হয় কালো কাচ ছিল। আর ওরা এমনভাবে বসেছিল যে নড়াচড়া করতে পারিনি। মনে হয়, কোনো পেশাদার গ্রুপ আছে এগুলো করার। আমাকে একটা দোতলা বাসার ওপরে রাখা হয়। সেখানে বাথরুম, জানালা-দরজা ছিল। খাবারও খেতে দিত। ওরা সব মিলিয়ে সাত-আটজন ছিল, সানগ্লাস পরে থাকত।

তার দাবি, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে অপহরণকারীরা তাকে গুলশানের বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়।

অনিরুদ্ধ জানান, আটকে রাখার দিনগুলোতে অপহরণকারীদের কয়েকজন প্রায়ই তার ঘরে গিয়ে বলত, ‘ব্যাপারটা সেটেল কইরা ফেলেন।’ এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তার তিনটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হস্তগত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন ব্যবসায়িক অংশীদার ও ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন। তার ষড়যন্ত্রেই অপহরণের ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করছেন অনিরুদ্ধ। কারণ, অপহরণকারীরা কিছু বিষয় নিষ্পত্তির জন্য চাপ দিচ্ছিল।

এ ব্যাপারে তিনি কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী নন। তিনি চান, সরকারের কোনো সংস্থা ঘটনা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিক।

সাতবার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্ব (সিআইপি) হিসেবে সরকারের স্বীকৃতি পাওয়া অনিরুদ্ধ জানান, অপহরণের সময় তিনি খুব ভয় পেয়েছিলেন। লোকগুলো আসলে কারা, কোন উদ্দেশ্যে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, মেরে ফেলবে কি-না এসব চিন্তায় তিনি নার্ভাস হয়ে পড়েন। তার মস্তিস্ক ঠিকঠাক কাজ করছিল না। অপহরণকারীদের তিনি ভালোমতো লক্ষ্যও করতে পারেননি। তারা যখন ঘরে আসত, তখন মেঝের দিকে তাকিয়ে কথার জবাব দিতে বলত। এর ফলে এখন তাদের দেখলেও শনাক্ত করতে পারবেন না।

অপহরণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গোয়েন্দাদের কোনো সংশ্নিষ্টতা ছিল না জানিয়ে অনিরুদ্ধ বলেন, ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষই সবাইকে বিভ্রান্ত করেছে। মূল ঘটনা আড়াল করতে তারা অপপ্রচার চালিয়েছে। তার স্ত্রী শাশ্বতী রায়ের কাছে গিয়ে বলেছে, চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে, তাই গা-ঢাকা দিয়েছেন অনিরুদ্ধ। ওই দিন তাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব হস্তান্তরে চুক্তি করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, স্বাক্ষর করবেন না। কারণ, এর আগে দুটি পোশাক কারখানা নেওয়ার পর এখন তারা ট্যানারি ভাগ করতে চাইছিল। হাজারীবাগ ও সাভারে ট্যানারির জমি আছে। এর একটি জমি অনিরুদ্ধকে দিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিতে চাইছিলেন তার ব্যবসায়িক অংশীদার।

ঘটনার ৮১ দিনের মধ্যে অনিরুদ্ধ ৩০ অক্টোবর বাড়িতে ফেরেন এবং ৩ নভেম্বর ভারতে চিকিৎসা নিতে যান বলে একটি সূত্রের খবর উল্লেখ করলে এর সত্যতা অস্বীকার করে তিনি প্রশ্ন করেন, ভারতে গেলে ইমিগ্রেশনে এ সংক্রান্ত তথ্য থাকবে না?

মুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো অপরাধ-সংশ্নিষ্টতা নেই। একটা জিডিও নেই। আমার মতো সৎ ব্যবসায়ীকে হজম করা সহজ নয়।’

অভিযোগ : অনিরুদ্ধ রোববার তার প্রতিষ্ঠান আরএমএম গ্রুপের প্যাডে লেখা একটি চিঠি গণমাধ্যমে পাঠান। সেখানে বলা হয়েছে, তার তিনটি প্রতিষ্ঠান আরএমএম লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আরএমএম নিট ক্লথিং লিমিটেড ও আরএমএম সোয়েটার লিমিটেড- যে সম্পত্তির মূল্য ১৫০ কোটি টাকার বেশি, তা হস্তগত করতে তার ব্যবসায়িক অংশীদার মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন গং হেন কাজ নেই, যা করেনি। ২৭ আগস্ট গুলশান-১-এর ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে ফেরার পথে তাকে অপহরণ করা হয়। ব্যবসায়িক প্রতিহিংসার কারণে এমনটা হয়েছে বলে তার আশঙ্কা। তার অবর্তমানে বিভিন্নভাবে ক্ষতি করার চেষ্টাও করা হয়েছে। এর মধ্যে তার মালিকানাধীন এলআইবির শিপমেন্ট সার্টিফিকেট দিতে বিএফএলএলএফইএর চেয়ারম্যান হিসেবে বাধা দেওয়া, অন্য কোম্পানি থেকে পাওনা পাঁচ কোটি টাকা প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ার বদলে নিজের নামে নেওয়া, কারখানার শ্রমিকদের হুমকি দেওয়াসহ বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, অনুমতি ছাড়া তার অফিস থেকে জরুরি নথিপত্র সরিয়ে নেওয়া উল্লেখযোগ্য।

চিঠিতে তিনি আরও লিখেছেন, অপহরণ করার পর তারা সমুদয় সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা চেয়েছেন।

এদিকে অভিযুক্ত মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অনিরুদ্ধ রায় তার ব্যবসায়িক অংশীদার। তবে তিন বছর ধরে তাদের সম্পর্ক ভালো নয়। এ কারণে তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা করে নিচ্ছিলেন। এর মধ্যে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে অনিরুদ্ধ অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন। এভাবে তিনি হয়তো কোনো সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছেন।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন