সোমবার, ২২ জানুয়ারী ২০১৮ ১২:১৪:৪০ এএম

আজ ২৬ নভেম্বর শহিদ ঐতিহাসিক কামান্না দিবস

আতিকুর রহমান | জেলার খবর | ঝিনাইদহ | রবিবার, ২৬ নভেম্বর ২০১৭ | ১২:২০:২৭ পিএম

২৬ নভেম্বর ঐতিহাসিক কামান্না দিবস। এই দিনে ঝিনাইদহ শৈলকুপার কামান্না গ্রামে শহীদ হয় ২৭ জন মুক্তিপাগল দামাল ছেলে।

তারা হলেন- মোমিন, কাদের, শহিদুল, সলেমান, রাজ্জাক, ওয়াহেদ, রিয়াদ, আলমগীর, মতালেব, আলী হোসেন, শরিফুল, আনিচুর, আলিমুজ্জামান, তাজুল, মনিরুজ্জামান, নাসিম, রাজ্জাক-২, কওছার, মালেক, আজিজ, আকবর, সেলিম, হোসেন, রাশেদ, গোলজার, অধীর ও গৌর। দেশ স্বাধীনের পর থেকে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দিনটিকে কামান্না দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।

প্রতি বছর গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় দিনটিকে স্মরণ করে সর্বস্তরের মানুষ। শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় শৈলকুপাবাসী।ঝিনাইদহ সদর উপজেলা হতে ১৬ কিলোমিটার দূরে অজোপাড়া গাঁ ‘কামান্না’। অবস্থানগত সুবিধার কারণে যুদ্ধ চলাকালীন গ্রাম টিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী ঘাঁটি গড়ে ওঠে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ নভেম্বর রাতে ৪২ জনের একদল চৌকস রণকৌশলী মুক্তিপাগল যোদ্ধা ভারত থেকে প্রশিক্ষন শেষে যুদ্ধের প্রস্তুতি মূলক অবস্থান নেন কামান্নার মাধবচন্দ্রের পরিত্যক্ত বাড়িতে। কামান্নায় অবস্থান করা ৪২ মুক্তিযোদ্ধার অধিকাংশ বাড়ি পার্শ্ববর্তী শ্রীপুর থানা এলাকায় বাকিদের শৈলকূপায়।

শৈলকূপার আলমগীর ও শ্রীপুরের আবু বকর ছিলেন তাদের দলনায়ক। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের খবর গোপন থাকে না। স্থানীয় রাজাকারদের তৎপরতায় খবরটি পৌঁছে যায় ঝিনাইদহ ও মাগুরার হানাদার ক্যাম্পে। হানাদাররা তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৬ নভেম্বর রাতের শেষ প্রহরে চারদিক থেকে ভারী অস্ত্রে-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঘিরে ফেলে কামান্নার অস্থায়ী মুক্তিযোদ্ধা ঘাঁটিটি।

সময় না দিয়ে হঠাৎ করেই সার্চ লাইট নিক্ষেপ করে বৃষ্টির মতো গুলি চালানো শুরু করে। আকস্মিক আক্রমণে ঘুমন্ত মুক্তিযোদ্ধারা হতচকিয়ে যান। এক পর্যায়ে নিজেদের সামলে নিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। হানাদারদের ভারী অস্ত্র-সস্ত্রের কাছে সামান্য কিছু স্টেনগান-মেশিনগান নিয়েও বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান ২৭ নভেম্বর ভোর রাত পর্যন্ত। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের আর শেষ রক্ষা হয়নি। এদিন সম্মুখ সমরে শহীদ হন ২৭ বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের লাশের উপর পৈশাচিক উন্মাদনা করতে করতে এলাকা ছাড়ে হানাদাররা। যাওয়ার সময় গ্রাম টিতে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা।

ওই দিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বৃদ্ধ ছামেনা বেগম জানান, তিনি একটি গর্তের ভেতর রবিশেঠ, জাহাঙ্গীরসহ ৭ জন মুক্তিযোদ্ধাকে রেখে উপরে খড় বিছিয়ে লুকিয়ে রাখেন। পাকসেনারা চলে গেলে নদী পার করে নিরাপদে আলফাপুরের দিকে চলে যেতে সাহায্য করেন। যুদ্ধে আহত এক মুক্তিযোদ্ধাকে পানি খাওয়াতে গেলে বৃদ্ধ রঙ্গ বিবি ও ফণিভূষন কুন্ডু নামের দুই গ্রামবাসি ও নরঘাতকদের হত্যার শিকারে পরিণত হন।

এছাড়াও হানাদারদের রাতভর বিক্ষিপ্ত এলোপাতাড়ি গুলিতে কয়েক গ্রামবাসি গুরুতর আহত হন।পরদিন সকালে আশপাশের গ্রাম গুলো থেকে হাজার হাজার জনতা এসে ভিড় জমায় কামান্নার অস্থায়ী মুক্তিযোদ্ধা ঘাঁটিতে, যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ২৭ বীর মুক্তিযোদ্ধার নিথর দেহগুলো।

গ্রামবাসী সেসব মৃতদেহ এক স্থানে জড়ো করে। কিন্তু হানাদারদের পাল্টা আক্রমণের ভয়ে তড়িঘড়ি করে কামান্নার হাইস্কুলের খেলার মাঠের উত্তর পাশে কুমার নদের ধারে ৬ জন করে দুটি ও ৫ জন করে ৩টি গণকবরে ২৭ বীর সন্তানকে কবর দেন।স্বাধীনতার ৩৮ বছরের মাথায় মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবরগুলো ঘেষে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেছে গ্রাম বাসী।

মিনারের গায়ে লেখা আছে ২৭ শহীদের নাম।প্রতি বছরের মতো এবারও দিবসটি উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহন করা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর অতিবাহিত হলেও এই শহীদদের নামে সরকারী ভাবে কোন স্মৃতিস্তম্ভ এমনকি শহীদদের নামে কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি।

দিবসটি এলে বার বার দাবী উঠলেও আজ পর্যন্ত ২৭ শহীদের স্মৃতি ধরে রাখার সরকারী উদ্যোগ না থাকায় এলাকাবাসীর মনে ক্ষোভ বিরাজ করে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় কামান্নাকে ঘিরে অন্তত কিছু একটা করা হোক এটাই প্রত্যাশঅ। ২৬ নভেম্বর কামান্না দিবসের অনুষ্ঠানে দাবিটি জোরালো হোক সকলের প্রতি এ আহবান।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন