সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮ ১১:৫৪:৩০ পিএম

খালেদা জিয়ার মামলার রায় ও পরবর্তী পরিস্থিতিঃ ২ ধরনের আগাম প্রস্তুতি বিএনপির

রাজনীতি | শনিবার, ২ ডিসেম্বর ২০১৭ | ০৫:০৬:৩৮ পিএম

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন মামলা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।

তাদের শঙ্কা, আগামী নির্বাচনের আগে এসব মামলার রায়ে তারা চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হলে হুমকির মুখে পড়তে পারে দলের নেতৃত্ব। কারণ নিন্ম আদালতের সাজা আপিলে বহাল থাকলে সংশ্লিষ্টদের কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

এক্ষেত্রে পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাজনৈতিক ও আইনগত- এ দুই ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড।

ওই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে অনানুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যাপারে হাইকমান্ডের কাছে মতামতও তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, যদি বিশেষ আদালতে খালেদা জিয়ার সাজা হয়, সেক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চ আদালতে জামিন চেয়ে আবেদন করা হবে।

এ ব্যাপারে সব ধরনের আগাম প্রস্তুতি নেয়া থাকবে। পাশাপাশি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে, যাতে নিন্ম আদালতে সাজা হলেও আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আইনগত কোনো বাধা না থাকে। অন্য শীর্ষ নেতাদের মামলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

রায়ের পর সরকার বিএনপির ওপর আরও কঠোর হতে পারে- এমন আশঙ্কা মাথায় রেখেই এসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে জানান বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক।
তবে খালেদা জিয়ার পক্ষের আইনজীবীরা মামলার ধরন দেখে মনে করছেন, কোনো পক্ষ যদি হস্তক্ষেপ না করে সেক্ষেত্রে জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হবে না। আর রাজনৈতিক কারণে সাজা দেয়া হলেও উচ্চ আদালত থেকে এ মামলায় সহজেই জামিন পাওয়া সম্ভব।

উচ্চ আদালতে আপিলের পর এসব মামলা দ্রুত বিচারের জন্য যদি কোনো পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ করা না হয়, সেক্ষেত্রে তা নিষ্পত্তি হতে ৫ থেকে ৭ বছর লেগে যেতে পারে। ফলে খালেদা জিয়াসহ দলের নেতারা সহজেই আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এতে কোনো আইনগত সমস্যা থাকবে না।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্র আরও জানায়, খালেদা জিয়াসহ শীর্ষ নেতাদের যদি সাজা হয়, সেক্ষেত্রে আইনি মোকাবেলার পাশাপাশি সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। স্বেচ্ছায় কারাবরণ, হরতাল-অবরোধসহ আইনজীবীদের টানা আদালত বর্জনের মতো কর্মসূচি নিয়ে দলটির মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে এসব মামলায় খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়া না হলে কঠোর কোনো কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবে না দলটি।

তবে বিএনপির একটি অংশ মনে করে, রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে চাপে রাখতে সরকার মামলাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সাজা হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সেক্ষেত্রে তারা বিএনপির ওপর আরও চড়াও হতে পারে। তবে দলটির অপর একটি অংশ মনে করে, সরকার এমনিতেই নানামুখী চাপে আছে। খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়া হলে পরবর্তী পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে, যা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই সরকারের মেয়াদের শেষদিকে তারা এ ঝুঁকি নেবে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সরকার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সিনিয়র নেতাদের বিভিন্ন মামলায় দ্রুত সাজা দেয়ার চেষ্টা করছে। চেয়ারপারসনের মামলাগুলোর কার্যক্রমও দ্রুত শেষ করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দলের সিনিয়র নেতাদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনে যাতে বিএনপি অংশ নিতে না পারে সে জন্যই সরকার তাড়াহুড়া করে মিথ্যা মামলায় সাজা দিতে চাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারের এ হীন উদ্দেশ্য মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। আইনের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করা হবে।

জানা গেছে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বর্তমানে ৩৭টি মামলা রয়েছে। জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার মামলার বিচার দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার সাজা হওয়ায় আগামী নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত। এছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটি এবং স্থায়ী কমিটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় দ্রুত চার্জশিট দেয়া হচ্ছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালেও অনেক মামলার বিচার চলছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচারাধীন জিয়া অরফানেজ এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ছে দলটির নেতাকর্মীরা। কয়েক মাসের মধ্যে তার সাজা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। তবে দলের সিনিয়র নেতারা বিশেষ করে কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত নেতারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। সাজাপরবর্তী পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করা হবে তা নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন। নিচ্ছেন অনেকের মতামতও।

চেয়ারপারসনের মামলার বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবেলার জন্য সিনিয়র কয়েক আইনজীবীকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সবার মতামত নিয়ে তারা আইনগতভাবে বিষয়টি মোকাবেলা করবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এখন থেকেই প্রস্তুত করা হচ্ছে। রায়ের সার্টিফায়েড কপি সঙ্গে সঙ্গে তুলে ওইদিনেই উচ্চ আদালতে জামিন আবেদন করা হবে।

সূত্র জানায়, আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে মামলা মোকাবেলায়ও প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন আলাদাভাবে বিষয়টি নিয়ে করণীয় চূড়ান্ত করতে প্রাথমিকভাবে আলোচনা করেছে। বিএনপি ছাড়াও জোটের শরিকরাও এ ইস্যুতে রাজপথে নামার কথা ভাবছে।

২০ দলের শরিক জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ইতিমধ্যে দলীয় এক সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জোট নেত্রী খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাগারে নেয়া হলে তারা স্বেচ্ছায় কারাবরণ করবে। দেশের সাধারণ মানুষকে এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাবে দলটি। দল ও জোটের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে এ ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। পেশাজীবীরা যাতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানায় সেই ব্যাপারে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হতে পারে।

জানতে চাইলে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র নেতাদের নামে দায়ের করা মামলার কার্যক্রম সরকার দ্রুতগতিতে শেষ করতে চাচ্ছে। সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে চেয়ারপারসন বৃহস্পতিবার জামিন পাননি। আমাদের আশঙ্কা সরকার তাড়াহুড়া করে একটি পর্ব শেষ করতে চাচ্ছে।

তিনি বলেন, চেয়ারপারসন ছাড়াও সিনিয়র অনেক নেতার নামে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো মামলার সাক্ষগ্রহণও শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব মামলার দ্রুত বিচার নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকার বিএনপিকে মামলার ফাঁদে ফেলতে চাচ্ছে। মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে নেতাদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে।

সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া এসব মামলায় খালেদা জিয়ার কোনো সাজা হবে না দাবি করে তিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় প্রায় একই অভিযোগে দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নির্বাহী আদেশে প্রধানমন্ত্রীর মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে তার কোনো সত্যতা নেই। তারপরও সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আদালতে হস্তক্ষেপ করে সাজা দিলে আমরা উচ্চ আদালতে যাব। তবে সেখানে কতটুকু ন্যায়বিচার পাব জানি না। তারপরও আইনগতভাবে তা মোকাবেলা করা হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতিও আমরা নিচ্ছি।

জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, আদালতে হস্তক্ষেপ করে খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়ার নীল নকশা করছে সরকার। কিন্তু তাকে কারাগারে পাঠানো এত সহজ হবে না। তাকে কারাগারে পাঠাতে হলে আমাদের লাশের ওপর দিয়ে যেতে হবে।

জানা গেছে, শুধু খালেদা জিয়া নয়, দলের প্রথৃম সারির বেশ কয়েক নেতা মামলা নিয়ে চিন্তিত। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলাম, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বরকত উল্লাহ বুলু, রুহুল কবির রিজভী, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুসহ সিনিয়র নেতাদের নামে একাধিক মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় অনেকের সাজা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: যুগান্তর।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন