শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ০৩:৫৯:৫৫ পিএম

মৃত্যুই মমতাজের সবচেয়ে বড় প্রেমের দান

জাতীয় | সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭ | ০১:৩৭:৪২ এএম

জগতে মানুষের মনে প্রশ্নের শেষ নেই। কৌতূহলের শেষ নেই। যে কোনো কিছুরই ভালো-খারাপ রূপ থাকে। দুই দিক নিয়েই মানুষ সবকিছুর বিচার বিশ্লেষণ করে। ভালো-মন্দের তাত্পর্য দেখে। বিষয়টি নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শিল্প তাজমহল সৃষ্টি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনেও প্রশ্ন ছিল।

আর ছিল বলেই শেষের কবিতার নায়িকা লাবণ্য দীর্ঘক্ষণ অমিতের সঙ্গে বসে থেকে তার মনের প্রশ্নটি করেই বসল। ‘হঠাৎ এক সময়ে প্রশ্ন করল, আচ্ছা মিতা, তুমি কি মনে কর না, যেদিন তাজমহল তৈরি শেষ হলো সেদিন মমতাজের মৃত্যুর জন্য শাহজাহান খুশি হয়েছিলেন। তার স্বপ্নকে অমর করবার জন্য এ মৃত্যুর দরকার ছিল। মৃত্যুই মমতাজের সবচেয়ে বড় প্রেমের দান। তাজমহলে মমতাজের শোক প্রকাশ পায়নি। তার আনন্দ রূপ ধরেছে।’

লাবণ্যর প্রশ্নটি অনেক কঠিন ছিল। কিন্তু বাস্তবতাকে পাশ কাটাতে চাননি রবীন্দ্রনাথের নায়িকা। আজকাল এমন অনেক কিছু নিয়ে আমারও মনে প্রশ্ন হয়। কিন্তু লাবণ্যর মতো কাউকে প্রশ্ন করি না। জানতে চাই না। মাঝে মাঝে মনে হয়, লাবণ্য শেষের কবিতার আবেগী নায়িকা।

তার পক্ষে যে কোনো কিছুই জানতে চাওয়া কঠিন কিছু নয়। পাঠক এখনো তার ইমোশনে মুগ্ধ হয়ে পড়ে। লেখালেখিতেও এক ধরনের আলসেমি চলছে আমার। মিডিয়া চালাতে গিয়ে অন্য কাজগুলো করা আর হয়ে ওঠে না। আজকাল টকশোতেও তেমন যাই না। এর মাঝে সেদিন লেখার জন্য ফোন করলেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মিলন পাঠান। তার অনুরোধ মাহবুবুল হক শাকিলকে নিয়ে লেখার জন্য। শাকিলের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল অনেক দিনের।

ভোরের কাগজে থাকার সময় ৯২ সালে তাকে একদিন খবর পাঠালাম আসতে। শাকিল এসে আমার সামনে বসল। চা খেল। বলল, কী কারণে তলব? বললাম, তোমার জন্য সুখবর আছে। শাকিল আমার দিকে তাকাল। বললাম, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হচ্ছ। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। তৈরি থাক। তখন মোবাইলের যুগ ছিল না। মানুষের সম্পর্কগুলো প্রযুক্তিনির্ভর ছিল না। আবেগ অনুভূতিগুলো সকাল-বিকাল বদল হতো না। মানুষের সম্পর্কের বন্ধনগুলো বদলে যেত না সকাল-বিকাল।

লোক দেখানো সম্পর্কে আমরাও বিশ্বাস করতাম না। সম্পর্কগুলো ছিল পরস্পর বিশ্বাস ও আস্থার। শাকিল আমার অফিস থেকে খুশি মনে বের হয়ে গেল। কিন্তু বাস্তবে শাকিল সেবার সাধারণ সম্পাদক হয়নি। হয়েছিল সাংগঠনিক সম্পাদক। ছাত্রলীগের সেই কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন মাঈনুদ্দীন হাসান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ইকবালুর রহিম আর সাংগঠনিক সম্পাদক শাকিল। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কটা ভালো ছিল। হিংসা ছিল না।

হানাহানির বাইরে ছিল তিনজনই। কবি শামসুর রাহমান এ কমিটির ইতিবাচক কাজ নিয়ে প্রশংসা করে কলাম লিখেছিলেন। তখন একদিন শামসুর রাহমানকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি ছাত্রলীগের মাঈনুদ্দীন- ইকবালের প্রশংসা করেছেন অনেক। তিনি বললেন, আমরা সব কিছুতেই খারাপ বেশি দেখি। ভালো দেখার চেষ্টা করি না। ভালো কাজের প্রশংসা হলে সবাই উৎসাহ পাবে। শামসুর রাহমানও নেই, মানুষের চিন্তার উত্কর্ষতাও নেই। এখন চারদিকে সুযোগ-সন্ধানীদের আনাগোনা।

কেউই কোনো কিছু ভালো চোখে দেখে না। সব কিছুতে অস্বচ্ছতা। জবাবদিহিতার কথা ভুলে গেছে সবাই। এখন বোঝা যায় না কে আপন কে পর। আস্থার সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা কোনো কিছু ইতিবাচক অবস্থান থেকে দেখি না। মানুষকে অসম্মান করেই আনন্দ পায় সবাই। অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি থাকাকালে একবার ইতিবাচক প্রচারে নেমেছিলেন। কিন্তু তাঁকেই ক্ষমতার মসনদ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল চূড়ান্ত অসম্মান নিয়ে।

অপরাধ ছিল তার, তিনি জিয়াউর রহমানের মাজারে যাননি। বঙ্গবন্ধুর মাজারে আগে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার পুত্র তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রীকে স্বাগত জানিয়েছিলেন নিজের নির্বাচনী এলাকায়। বড় অদ্ভুত রাজনীতি! কয়েক মাস আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল গিয়েছিলেন ভোলায়। অত্যন্ত সজ্জন রাজনীতিবিদ তোফায়েল ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়েছিলেন ফখরুলের। কোনো সমস্যা, অসুবিধা হলে তোফায়েল আহমেদ অনুরোধ করেছিলেন তাকে জানাতে। না, ভোলায় ফখরুলের কোনো সমস্যা হয়নি। রাজনীতিতে এ ইতিবাচক সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে।

মানুষকে অসম্মান করে বড় হওয়া যায় না। আমাদের কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বলতেন, তিনি হিংসাকে এনজয় করেন। বাস্তবে কতটা পেরেছিলেন জানি না। জঙ্গিদের হুমকি নিয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একবার আমাকে বলেছিলেন, যে কোনো থ্রেটকে পানি দিয়ে গিলে খেয়ে ফেলবে। দেখবে আরাম। আমি অনেকবার হিংসা ও হুমকি পানি মিশিয়ে খেয়ে দেখেছি ভালোই লাগে। খারাপ না। মনে মনে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে ধন্যবাদ দিয়েছি।

মাঝে মাঝে আমারও মনে হয়, এক জীবনে চাওয়া পাওয়ার সব হিসাব মিলবে না। কিন্তু যা আছে তা নিয়েই আমাদের চলতে হবে। স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে হবে। স্বপ্নই মানুষকে আগামীর সাফল্যের শিখরে নিয়ে যেতে পারে। বাস্তবতাকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। বরং বাস্তবতাকে শক্তভাবেই ধরতে হবে। এখন মানুষ সাদাকে সাদা বলে না। কালোকে কালো বলতে চায় না। সব কিছুতে ভয় অথবা চাটুকারিতার সংস্কৃতি যুক্ত হয়েছে। দলবাজির মাঝে জাগতিক চাওয়া-পাওয়া পূরণ হয়।

নিজের চাওয়ার জন্য মানুষ খুন করছে মানুষকে। স্বার্থের কাছে সবাই নিজেকে বিক্রি করছে আনন্দে। এখন সবাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক। সবাই আওয়ামী লীগ। কিন্তু এক সময় তা ছিল না। মিজানুর রহমান মিজানের কথা এখন আর কারও মনে নেই। ৭৫ সালের পর তার সাপ্তাহিক খবর ও নিজাম উদ্দিনের সাপ্তাহিক মুক্তিবাণী ছিল আওয়ামী লীগের মুখপত্র। দলীয় কর্মীরা এই পত্রিকাগুলো পড়ে উজ্জীবিত হতো।

সেই মিজানুর রহমান মিজানের কথা এখনকার প্রজন্মের আওয়ামী লীগারদের জানার কথা নয়। তখন ছাত্রলীগ, যুবলীগ তাঁকে বক্তা হিসেবে নিয়ে যেত সারা দেশে। তার লেখা বেশ কয়েকটি বইয়ের মাঝে একটি ছিল, আমি রাসেল বলছি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণও তিনি একসঙ্গে করে বই হিসেবে প্রকাশ করেন। আশির দশকে মোহাম্মদ শাজাহানের বাংলা বার্তাও প্রশংসিত ছিল। এরপরই মোস্তাফিজুর রহমান বের করেন সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ।

অতীতকে ভুলে গেলে চলে না। অতীতকে সঙ্গে রাখলে বর্তমান অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। এ ছাড়াও আশির দশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে আরও কয়েকটি বই ভূমিকা রেখেছিল। এর মাঝে মেজর (অব.) রফিকুল ইসলামের ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ একটি। আরেকটি এম আর আখতার মুকুলের ‘আমি বিজয় দেখেছি’। অনেকে সমালোচনা করতেন এম আর মুকুল তার চরমপত্রকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, নিজের কথা বেশি লিখেছেন। কিন্তু বাস্তবে এই বইটি প্রজন্মের জন্য একটি দলিল ছিল।

একই সময়ে রাজাকারের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মকে জাগিয়েছিল ‘একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়’ বইটি। এই বই প্রকাশে বিচিত্রা সম্পাদক শাহদত চৌধুরী, নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার কবির ও কর্নেল (অব.) কাজী নুরুজ্জামান মূল ভূমিকা রেখেছিলেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলন ছিল একটি ধারাবাহিকতা। সেই আন্দোলনে আজকের কাগজ, ভোরের কাগজের ভূমিকা ইতিহাস হয়ে আছে।

রাজাকারদের নিয়ে ধারাবাহিক লেখা প্রকাশ হতো আজকের কাগজে। কুমিল্লা নিয়ে লেখা আসার পর অফিসে বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হয়। কারণ সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খানের বাবার নাম ছিল কুমিল্লার শান্তি কমিটিতে। নাঈম ভাই আসলে ভিন্ন মাত্রার একজন আধুনিক মানুষ। তিনি নির্দেশ দিলেন, তার বাবার নাম যেভাবে এসেছে সেভাবে প্রকাশ করতে। নাঈম ভাই বললেন, সারা দেশেরটা প্রকাশ হচ্ছে, কুমিল্লা কীভাবে বাদ দেব? আর প্রকাশ করলে নাম আসবেই।

আমি জানি না, তিনি কীভাবে পরে তার পরিবারের সদস্যদের সামাল দিয়েছিলেন। তবে একজন সম্পাদক হিসেবে তার এই দায়িত্ব আমাকে এখনো অনুপ্রাণিত করে। সম্পাদক হিসেবে সবাইকে কম বেশি অনেক ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সবাইকে খুশি করার মতো কঠিন কাজ জগতে আর নেই। একজন সত্যিকারের সাংবাদিক কোনোভাবেই সবাইকে খুশি করতে পারেন বলে আমার মনে হয় না। ১৯২২ সালের নভেম্বরে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ধূমকেতু বন্ধ করে দেয় ব্রিটিশ শাসকরা। নজরুলকে দেওয়া হয় এক বছরের জেল।

কারারুদ্ধ নজরুলের কলম থেমে থাকেনি। কবি লিখলেন— ‘আমার বাঁশীকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে বাঁশীর সুর থেমে থাকবে না, কারণ সুর আমার বাঁশীতে নেই, আছে হৃদয়ে। ’ আদর্শকে হৃদয়ে লালন করেই সামনে যেতে হয়। আদর্শের তাগিদে ভারতে ছুটে এসেছিলেন বর্ণ বৈষম্য ও বিশ্ব মানবতা নিয়ে লড়াই করা মার্কিন নেতা মার্টিন লুথার কিং। তার হৃদয়ে ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। লুথার কিং ১৯৫৯ সালে ভারত সফর করেন নেহরুর আমন্ত্রণে। তখন তিনি বলেছিলেন, তাঁর ভারত সফরের কারণ শুধু আদর্শিক পুরুষ গান্ধীর জন্মভূমিকে দেখার জন্য।

আমাদের হৃদয়ের আদর্শিক পুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধুর একটি পুরনো ভিডিও দেখছিলাম। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু লন্ডনে যান। সেখানে তিনি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। বিস্ময় নিয়ে দেখছিলাম, পাইপ টানতে টানতে ইতিহাসের মহানায়ক ক্লারিজিয়ার্স হোটেলের বলরুমে প্রবেশ করেন। দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়ার সাংবাদিকরা বসে আছেন। বঙ্গবন্ধু বসলেন। তাঁর এক পাশে ড. কামাল হোসেন। আরেক পাশে একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক। বঙ্গবন্ধু পাইপ টানতে টানতে তাদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন।

একপর্যায়ে বিবিসির এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্রিটেন আমাদের দেশ থেকে অনেক সম্পদ এনে এই দেশ প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা অবশ্যই আমাদের সব বিষয়ে সমর্থন দেবে।’ তার বলার স্টাইলটাই ছিল আলাদা। কাউকে তোয়াক্কা না করার ধরন। অথচ একদিন আগেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ তাঁকে বিমানবন্দরে রিসিভ করেন। এ নিয়ে হিথকে পরে হাউস অব কমন্সে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল। কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু তখনো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেননি।

ইতিহাসে এভাবে কথা বলা মানুষ আর কি জন্ম নেবে? বিবিসি পরে বঙ্গবন্ধুর এই ব্রিফিং বিশেষ অনুষ্ঠান হিসেবে আলাদাভাবে সম্প্রচার করে। বঙ্গবন্ধু ব্রিটেন থেকে ভারত এসেই ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে তাঁর সেনাদের বাংলাদেশ ছাড়ার তারিখ আদায় করে ছাড়েন। এত অল্প সময়ে মিত্রবাহিনী ফিরে যাওয়ার দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ পৃথিবীতে নেই। এটাই প্রথম। এটাই শেষ। আর এই ইতিহাস তৈরি হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর জন্যই।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন