বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ ০১:১৫:৩২ এএম

ছাপাখানা থেকেই ফাঁস হচ্ছে প্রশ্নপত্র

জাতীয় | শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ | ০৩:০০:০৫ পিএম

বিশ্ববিদ্যলয়ের ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাপনী পরীক্ষা। পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে বিভিন্ন সংস্থা-ব্যাংকের চাকুরিতে নিয়োগ পরীক্ষা। মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা থেকে নার্সিং নিয়োগ পরীক্ষা। প্রতিটি ক্ষেত্রে বারবার একই সমস্যা, প্রশ্নপত্র ফাঁস। কিন্তু বারবার এ সমস্যা তৈরি হলেও এর মূলোত্পাটন করা কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছেনা। প্রায় প্রত্যেকটি ঘটনার পর প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি বলে ‘আশ্বস্ত’ করার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে ফাঁস প্রমাণিত হওয়ায় পরীক্ষা বাতিল করা হয়। আর এ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অধিকাংশ সময় দেখা গেছে কোন না কোন প্রভাবশালী চক্র জড়িত। ফলে কোনভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না প্রশ্নপত্রের ঘটনা।

সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় প্রেস (ছাপাখানা) থেকে। ঢাবির ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপা হতো রাজধানীর ইন্দিরা রোডের একটি প্রেসে। আর ওই প্রেসের কর্মচারী খানা বাহাদুরের মাধ্যমেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো। নাটোর ও পাবনা জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা রকিবুল হাসান ইসামীর মাধ্যমে তা সর্বত্র সরবরাহ হতো।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মালিবাগ সিআইডি দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোল্যা নজরুল ইসলাম। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৭ ডিসেম্বর থেকে গতকাল ১৪ ডিসেম্বর পযন্ত খান বাহাদুরসহ ১০জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ দমন শাখা সিআইডি। এদের মধ্যে ৫জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম আরো জানান, ১৩ ডিসেম্বর বুধবার জামালপুর থেকে সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল সকালে ফার্মগেটের ইন্দিরা রোড থেকে গ্রেফতার করা হয় প্রেস কর্মচারী খান বাহাদুরকে। তিনি বলেন, খান বাহাদুরকে গ্রেফতারের মধ্যে দিয়ে এই চক্রের মূলোৎপাটন করা হয়েছে। এই চক্রের ‘শীর্ষে’ থাকা পাবনা জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা রকিবুল হাসান ইসামীও পুলিশের হেফাজতে আছেন উল্লেখ করে সিআইডি বিশেষ সুপার জানান, প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গত তিন মাসে মোট ২৩জনকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। বাহাদুরের সঙ্গে সাইফুল ইসলামের পরিচয় ছিল। সাইফুলের সঙ্গে পরিচয় ছিল রকিবুল হাসান ইসামীর। মূলত এই তিনজন প্রশ্ন বিভিন্ন জায়গায় ছড়াতেন। এই তিনজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে।

প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে দুই থেকে সাত লাখ টাকার লেনদেন হতো উল্লেখ করে মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় এ পর্যন্ত ২৩জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যার মধ্যে গত ৭ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ১০জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন কারাগারে, তিনজন রিমান্ডে এবং দুইজন গ্রেফতার আছেন। যাদের গ্রেফতার করেছি, সবাই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এখন কারো পরিবার যদি দাবি করে, তাদের সন্তানরা এতে জড়িত না, তাহলে আমরা সেটা খতিয়ে দেখব।

সিআইডিতে ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, এর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ডিভাইস সাপ্লাই পদ্ধতিতে ঢাবিতে ভর্তি হওয়া ৭ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল টিমের সহায়তায় গ্রেফতার করা হয়। আর গত ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর জিগাতলা থেকে গ্রেফতার করা হয় ডিভাইস সাপ্লাই ও প্রশ্ন ফাঁস করা গ্রুপের অন্যতম নাজমুল হাসান নাঈমকে। পরে ৯ ডিসেম্বর রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল এলাকা থেকে বনি ইসরাইল ও বিনোদপুর এলাকা থেকে মারুফকে গ্রেফতার করা হয়। বনি ও মারুফ দু’জনই ছাত্র সংগ্রহ করত। অন্যদিকে নাটোর ও পাবনা জেলার ক্রীড়া কর্মকর্তা রকিবুল হাসান ইসামীকে গত ১১ ডিসেম্বর রাজশাহীতে তার বড়ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর সামসুজ্জোহা ও গুরুদাশপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেনের জিম্মা হতে গ্রেফতার করা হয়। পরের দিন রকিবুল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। রকিবুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৩ ডিসেম্বর জামালপুর থেকে সাইফুলকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রসঙ্গত, গত ২০ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগের দিন রাতেই প্রশ্নের ইংরেজি অংশটি ফাঁস হওয়ার খবর আসে গণমাধ্যমে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে সিআইডি জানায়, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে প্রশ্ন ফাঁস করা হয়েছে।

সিআইডির কর্মকর্তারা আরো বলেন, প্রশ্নপত্রের ফাঁসের শুরুটা ১৯৭৯ সালে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে। পরবর্তীতে দু’একটি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও বেশিমাত্রায় অভিযোগ ওঠে ২০১২ সাল থেকে। ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রায় আশিটি প্রশ্নপত্রের বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া যায়।
এদিকে গত সোমবার মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে। এতে মঙ্গলবার ৮জন গেপ্তার হয়েছে। সূত্র: ইত্তেফাক

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন