বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৯:০৭:৩১ এএম

ধানক্ষেতে ধর্ষণ চেষ্টার পর ভাবির লাশ গুমের রোমহর্ষক কাহিনী!

জেলার খবর | পাবনা | বুধবার, ২০ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১২:৩৩:২৯ পিএম

গত ৩ নভেম্বর ২০১৭। পাবনার সাঁথিয়া থানায় একটি নিখোঁজ জিডি হয়। যার নম্বর ১০২। জিডিতে চর পাইকরহাটির বাসিন্দা মো. আরদোশ মল্লিক (৫০) বলেন, গত ১ নভেম্বর তার স্ত্রী আলেয়া খাতুন কুমির বিলের পাশের ঈদগাহে লাকড়ি কুড়াতে যান। এরপর তিনি আর ফেরত আসেননি। জিডি এন্ট্রির পর এসআই রাশেদ ঘটনাস্থলে যান। গিয়ে জানতে পারেন পার্শ্ববর্তী ডোবার মধ্যে নিখোঁজ মহিলার পরনের শাড়ি পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি ভাবতে থাকেন।

৪ নভেম্বর তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে শাড়িটি দেখতে পান। আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। জায়গাটি একদম নির্জন, নিঝুম। মূল গ্রাম থেকে সামান্য বাইরে। যেখানে ঈদগাহ তার ঠিক সামনেই পূর্বদিকে ১০ বিঘার একটি বিশাল পুকুর। পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশজুড়ে বিশাল বিল। উত্তর দিকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে মূল গ্রাম। ওই জায়গায় দিনের বেলা গেলেও গা ছম ছম করে। ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রচুর উৎসুক জনতা।

মহিলার (আলেয়া) ঝাড়ু দেওয়ার ঝাঁটা ঈদগাহের দেয়ালের পাশে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। শাড়ি যে ডোবায় ছিল, সেই স্থান পরিদর্শন করেন। কিন্তু মহিলার সন্ধান কেউ দিতে পারে না। হঠাৎ ভিড়ের মধ্য থেকে শোনা যায়, খালের ওপারে কাউকে টেনে বিলের ভিতরে নেওয়ার মতো দাগ আছে। কিন্তু ওখানে যেতে হলে বুকসমান পানি পার হয়ে যেতে হবে।

গ্রামবাসী একজনের কাছে লুঙ্গি চেয়ে নিয়ে তিনি নিখোঁজ মহিলার (আলেয়া) দেবর রেজাউলকে সঙ্গে নিয়ে খাল পাড়ি দিয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে গেলে অজস পায়ের ছাপ দেখেন। রেজাউল পুলিশকে জানান, গ্রামের শত শত লোক গত দুদিন ধরে বিলের ভিতর নেমে কোনো কিছু পাওয়া যায় কি না তার সন্ধান করেছে। এগুলো তাদের পায়ের ছাপ।

তারপরও ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে, কাউকে টেনে নেওয়ার দাগ। এরপর সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। কিন্তু কোনো কূল-কিনারা পাওয়া যাচ্ছিল না। পুনরায় ডাঙায় ফিরে আসেন তিনি। মহিলা (আলেয়া) সম্পর্কে খোঁজ নেন। পুলিশ জানতে পারে, মহিলা দরিদ্র আরদোশ মল্লিকের স্ত্রী।

ঘটনার দিন সকালে খড়ি কুড়াতে বাড়ি থেকে বের হন। পথে মিলন নামের এক ছেলের সঙ্গে দেখা হয়। সে আখ থেকে গুড় বানাচ্ছিল। তার কাছ থেকে দুই টুকরো আখ চেয়ে নেন। এরপর বিলের পাশে ঈদগাহের দিকে চলে যান। এতটুকু জানার পর মিলনকে খুঁজে বের করেন পুলিশ।

সে তার অফিসে এসে সাবলীলভাবে জানায় যে, সে কিছুই দেখেনি, তবে তার গ্রামের ইন্দাই তাকে সকাল ১০-১১টার দিকে বলেছিল ঈদগাহের পাশের জমিতে কিছু একটা নাকি দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু তারা দুজন ঈদগাহের কাছে গিয়ে কিছু না পেয়ে ফিরে এসেছে।

এ ছাড়া সে আখ ভাঙানোর সময় শুধু নিখোঁজ আলেয়ার ভাইয়ের বউকে পাশ দিয়ে পুকুরে কাপড় কাচতে যেতে দেখেছে। আর একজন টুটুল (৩০) নামের একটা ছেলে এক টুকরা আখ তার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে ওই দিকে গিয়েছিল। পুলিশ এবার ইন্দাই আর কাপড় কাচা মহিলার খোঁজ নিতে শুরু করে। ইন্দাইকে আমার সার্কেল অফিসে ডাকি।

ইন্দাই জানায়, ঈদগাহের সামনের পুকুরপাড়ে তার সবজি বাগান পরিষ্কার করছিল। তার টয়লেট চাপলে পুকুরের পূর্ব পাড়ের বাঁশঝাড়ে যায়। হঠাৎ ঈদগাহের দক্ষিণের নিচু জমিতে কাউকে নড়তে দেখে। আর মনে হচ্ছিল কেউ একজন বুঝি কাউকে জড়াজড়ি করছে। সে ভাবে গ্রামের কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা হয়তো গোপনে শারীরিকভাবে মিলিত হচ্ছে।

সে তাড়াতাড়ি টয়লেট সেরে পুকুরপাড় বেয়ে এসে আখ ভাঙানোর স্থানে থাকা মিলনকে ডাকে। মিলন তখন খাবার খাওয়ার জন্য পুকুরে হাত ধুচ্ছিল। সে মিলনকে বিষয়টি জানায়। দুজন এগিয়ে গিয়ে কিছুই দেখতে পায়নি। পরে হাসি-ঠাট্টা করে ফেরত চলে আসে। পরে সে শুধু শুনেছে টুটুল আরও কিছুক্ষণ পরে এসে মিলনের কাছে বলেছে, তার একটা চশমা হারিয়েছে, তারা কেউ পেয়েছে কি না?

এরপর যে মহিলা কাপড় কাচছিল তার সঙ্গে দেখা করার জন্য পুলিশ আবার পাইকরহাটি গ্রামে যায়। সে জানায়, কাপড় কাচতে যাওয়ার পথে মিলনকে আখ ভাঙাতে দেখেছে। পরে টুটুল পুকুরপাড় দিয়ে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে ঠাট্টা-মশকরা করে চলে যায়। দেবর হিসেবে কিছু রসাত্মক কথা বলে। প্রচুর কাপড় ছিল, কাচতে দেরি হয়। পরে ভেজা কাপড়ে টুটুলকে ফিরতে দেখে। কিন্তু এবার সে ডাকলেও টুটুল ব্যস্ততার কথা বলে চলে যায়।

তিনজনের কথা শোনার পর টুটুলের প্রতি আমার তীব্র আগ্রহ জন্মায়। পুলিশ সন্দেহ করে টুটুলকে। এরপর আমি টুটুলের ফোন নম্বর জোগাড় করি। প্রথমে ফোন দিলে সে ধরে না। তার ভাগ্নে হাফিজকে দিয়ে ফোন করানো হয়। এরপর ৬ নভেম্বর সকালে সে পুলিশকে ফোন করে জানায় যে, তার ছুটি শেষ হয়ে গেছে। সে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরি করে। তার পক্ষে এখন আসা সম্ভব নয়। বিনয়ের সঙ্গে তাকে বোঝাই যে না এলে এলাকার লোকজন হয়তো তাকে সন্দেহ করবে। পরে টুটুল রাজি হন।

বিকালে (৬ নভেম্বর) বেড়া এলাকার স্থানীয় নেতাকে দিয়ে টুটুল পুলিশকে ফোন করায়। নেতাকে আশ্বস্ত করা হয়, কোনো মামলা হয়নি। তাকে গ্রেফতারও করা হবে না। শুধু ওই দিন সে কী দেখেছে তা জানা দরকার। এরপর শুরু হয় আসল নাটক। সন্ধ্যা ৬টার দিকে চমৎকার একটি চশমা পরা সুদর্শন যুবক থানা অফিসে প্রবেশ করে জানায় তার নাম টুটুল। পুলিশ তাকে সাদরে বসতে দেয়। পুলিশ তাকে জেরা করে।

সে জানায়, জমি দেখতে বিলের পাড়ে গিয়েছিল। সেখানে তার চশমা হারিয়ে গেলে খুঁজে না পেয়ে সে চলে এসেছে। পরে শুনেছে আলেয়াকে (তার চাচাতো ভাবীকে) পাওয়া যাচ্ছে না। এর বেশি তার জানা নেই। তার চশমা কীভাবে হারাল?

প্রশ্নে সে জানায়, চশমা খালের পাড়ে খুলে স্যান্ডেলের ওপর রেখে জমি দেখতে গিয়েছিল। পুলিশ এবার কৌশল নেয়। পুলিশ গোপনে মোবাইলের ক্যামেরায় টুটুলকে কয়েক সেকেন্ড ভিডিও করে। কিছুক্ষণ পর তাকে ওইটুকু দৃশ্য দেখানো হয় আর বলা হয়, আপনি যা করেছেন তা কিন্তু স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে। টুটুল ঘাবড়ে যায়। তবু সে মুখ খোলে না। তখন তাকে নতুন টোপ দেই।

পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, তাকে টোপ দেওয়া হয়। দেড় লাখ টাকা লাগবে, যদি সে দিতে পারে তবে তাকে ছেড়ে দেব। আরও শর্ত থাকে, সে যদি লাশটা কোথায় বলতে পারে তবেই তার মুক্তি। এর মাঝে আমি তাকে ফোনে কথা বলতে দিই। তাকে সিগারেট পান করাই। সে ফোনে টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করে। তার আত্মীয়কে বলে জরুরি ভিত্তিতে টাকার দরকার। পরে তার আত্মীয় এসে আমাকে দেড় লাখ টাকার চেক প্রদান করে।

তখন রাত আড়াইটা। টুটুল বলে লাশ কোথায় আছে আমি খুঁজে দেব। কিন্তু কে রাখছে তা আমি জানি না। আমি বুঝে ফেলি মহিলাকে হত্যা করা হয়েছে এবং লাশটা গুম করা হয়েছে। টুটুল শর্ত দেয় যে, কোনো পুলিশ সঙ্গে গেলে চলবে না। আমি জানাই যে, তাকে উপকার করতে গিয়ে যদি সে আমাকে মেরে ফেলে, তাই আমিও লোক ছাড়া যাব না। শেষে রাজি হয়।

তার সঙ্গে আমি রাতের খাবার খাই এবং বন্ধুর মতো আচরণ করি। আমাকে সে ঘুষখোর হিসেবে বিশ্বাস করে। পুলিশের একটি দল রওনা হয়। টুটুল তাদের অনেকগুলো ধানখেতের মধ্যে দিয়ে বুক পানির ভিতর দিয়ে বিলের মধ্যখানে (ধান বিল নামক স্থান) নিয়ে যায়। এরপর কিছুক্ষণ উল্টাপাল্টা ঘুরায়।

আমি তাকে স্মরণ করিয়ে দেই সকাল হয়ে যাচ্ছে, লাশ না পেলে তার মুক্তি নেই। এরপর সে বলে ‘এক জায়গায় মাছ মারা বাঁশের চার আছে, এটা খুঁজেন।’ আমরা পাশেই তা খুঁজে পাই। তখন সে ওই বরাবর ধানখেতের ভিতর গিয়ে ধানগাছে ঢাকা পচা, গলা আলেয়ার লাশ দেখিয়ে দেয়। এরপর সে তাকে ছেড়ে দিতে বলে। আমি বলি, ডাঙায় উঠে ছেড়ে দেব। মাঝবিলের মধ্যে ছাড়লে যদি তার কোনো বিপদ হয় তবে তার স্বজনদের কী উত্তর দেব?

ডাঙায় এসে আমার সহযোগী কনস্টেবল মুকুলের হাত খুলে টুটুলের দুই হাতে হ্যান্ডকাফ লাগাই। তখন সে বুঝতে পারে যে, তার রেহাই নাই। এরপর জানতে চাই, এই বিরান জায়গায় লাশ আছে তুমি জানলে কেমনে? স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারও জানার কথা নয়। তখন সে সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বলে।

মূলত সে বিলের ধারে তার জমি দেখতে এসেছিল। সেই সময় তার চাচাতো ভাবী আলেয়া কাপড় উঁচু করে পানিতে নিমজ্জিত ধানখেতের ভিতর হাঁটছিল। সুগঠিত দেহ দেখে সে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। তখন সে আলেয়াকে জড়িয়ে ধরে। ধর্ষণের চেষ্টা করে। তখন সন্নিকটে কেউ ছিল না।

ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তার চশমা কাদা পানিতে পড়ে যায়। এরপর মহিলা (আলেয়া) এই সব ঘটনা ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেয়। ঘটনা জানাজানির ভয়ে সে মহিলার আঁচল দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরে। মহিলা মারা গেলে পাশেই ডোবায় লাশ নামিয়ে রাখে। এরপর হাত-পা ধুয়ে ফেরার পথে কেউ বিষয়টি দেখছে কি না তা নিশ্চিত করতে সামনে যাকেই পেয়েছে তাকেই চশমা হারানোর গল্প বলেছে। সারা দিন সে রাত নামার অপেক্ষায় থাকে।

পরে ওই দিন গভীর রাতে (আনুমানিক রাত ৩টার দিকে) গিয়ে নিজে নিজেই একা লাশ টেনে বিলের ভিতর নিয়ে যায়। নেওয়ার সময় আলেয়ার পরনের শাড়ি খুলে যায়। যা পরে ডোবার মধ্যে পাওয়া যায়। বিলে ধানখেতের ফাঁকে ফাঁকে পানি থাকায় লাশ টেনে নিতে তার কষ্ট হয়নি। পরে বাড়ি ফিরে আসে।

এরপর দু-একদিন পরিস্থিতি অবজার্ভ (পর্যবেক্ষণ) করে ঢাকায় ফিরে যায়। টুটুলের মুখে ঘটনার বিবরণ শুনতে শুনতে সেখানেই ফজরের আজান হয়। তখন মসজিদে গিয়ে মাইকিং করা হয়। বলা হয়, আলেয়ার লাশ পাওয়া গেছে। হাজার হাজার মানুষ স্কুল মাঠে জমায়েত হয়।

অবশেষে গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে টুটুল গিয়ে বিলের মধ্যে আলেয়ার লাশ দেখিয়ে দেয়। লাশ উত্তোলন করা হয়। আলেয়ার স্বামী ও বাবার বাড়ির লোকজন উভয় পক্ষই বাদী হতে আগ্রহ দেখায়। সবাই মিলে শেষে মৃতার মেয়ে শাবানা আক্তারকে (২০) বাদী করে।

সাঁথিয়া থানার মামলা নম্বর ১০। তারিখ ৭-১১-১৭। ধারা-নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৪)(খ) তৎসহ ৩০২/২০১ দণ্ডবিধি রুজু হয়।

আসামি টুটুল পরে বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন