মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৪:১৭:৫৩ এএম

পরিচালককে হাত করে দেশজ চিকিৎসায় হরিলুট

জাতীয় | বুধবার, ২০ ডিসেম্বর ২০১৭ | ০৬:০০:১১ পিএম

নিয়োগ, বদলি ও কেনাকাটাসহ নানা অনিয়মই নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে হোমিও ও দেশজ চিকিৎসা খাতে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হোমিও ও দেশজ চিকিৎসা বিভাগের পরিচালককে হাত করে তিন ডাক্তার সিন্ডিকেট করে পুরো খাতকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। তাদের বেপরোয়া আচরণে ক্ষুব্ধ ইউনানী আওয়ুর্বেদিক ও হোমিও শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকরা। সিন্ডিকেটটির কাছে জিম্মি এ সেক্টরের সঙ্গে জড়িত প্রায় ২ হাজার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও চিকিৎসক। তারা সুষ্ঠু তদন্ত করে দূর্নীতিবাজ ডাক্তারদের বিচার দাবি করেছেন।

সারাদেশে সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ দুটি। এরমধ্যে একটি রাজধানীর মিরপুরে, অন্যটি সিলেটে। আর সরকারি হোমিও মেডিকেল কলেজ একটি। এটিও রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত। এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রিত হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর হোমিও ও দেশজ চিকিৎসা ও লাইন ডিরেক্টর অল্টারনেটিভ মেডিকেল (এএমসি) দ্বারা। এর একজন পরিচালক রয়েছেন। যিনি পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিন্ডিকেটের প্রধান পরিচালক হোমিও ও দেশজ চিকিৎসার এবং লাইন ডিরেক্টর ডা. মনোয়ারা সুলতানা। তার আরো তিন সহযোগী ডা. আবু বকর সিদ্দিক, ডা. কামরুজ্জামান সুমন ও ডা. কামরুল কায়েস। এরা মেডিকেল অফিসার হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত। অভিযোগ উঠেছে, আবু বকর সিদ্দিক, কামরুজ্জামান সুমন ও ডা. কামরুল কায়েস লাইন ডিরেক্টর মনোয়ারা সুলতানাকে হাত করে সব ধরনের ‘অপকর্ম’ করে যাচ্ছেন।

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে নিয়োগ বন্ধ থাকলে ২০১৪ সালের আগষ্টে ১২২ জন ও পরে আরো ১৮ জন ডাক্তার মেডিকেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ পান। এটাই এখন পর্যন্ত এ সেক্টরের ডাক্তারদের বড় নিয়োগ। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় ২২৫ জন ডাক্তার নিয়োগ পেয়েছেন। অভিযোগ_ নিয়োগ থেকে শুরু করে বদলি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছেন আবু বকর সিদ্দিক, কামরুজ্জামান সুমন ও কামরুল কায়েস। নিয়োগ পাওয়া কোন ডাক্তার এক কর্মস্থলে কমপক্ষে ৩ বছর পর বদলির বিধান রয়েছে। কিন্তু ওই সময়-ই সদ্য নিয়োগ পাওয়া ডাক্তারদের বদলি বাণিজ্য শুরু করেন তারা। ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বিনিমিয়ে নিয়োগ পাওয়া ডাক্তারদের পছন্দের জায়গায় বদলি করেন। এমনকি কেউ বদলি হতে না চাইলেও তাকে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। সেই হিসেবে তখন ১৪০ জন নিয়োগ পাওয়া ডাক্তারদের থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন। বর্তমানেও একই ধারা অব্যাহত।

আবেদন না করেও চাকরিতে

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ সিন্ডিকেটের সদস্য ডা. আবু বকর সিদ্দিক ২০১৪ সালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদন যাচাই-বাছাইয়ে তিনি বাদ পড়ে যান। বাদ পড়ার পরও তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য অধিপ্তরের ভাইভা কার্ড দিয়ে চাকরি দেয়া হয়। বর্তমানে তিনি যে পদে চাকরি করছেন তার সেখানে ওই সময় কেউ আবেদন করেননি। এ ব্যাপারে আবু বকর সিদ্দিকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। বলেন, ‘যারা অভিযোগ করেছেন তাদের এটি অপপ্রচার।’

বদলি বাণিজ্য

২০১৪ সালের মেডিকেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ পান আব্দুর রাজ্জাক। তার পোস্টিং হয় কুমিল্লায়। তিনি ৬ মাসের মধ্যেই বদলি হন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমেপ্লক্সে। ডা. ইসরাত জাহানের পোস্টিং হয় গাজিপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। নিয়োগের ৬ মাসের মধ্যে তিনি বদলি নিয়ে চলে আসেন ঢাকার ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। একই সময় নিয়োগ পান ডা. খোদেজা আক্তার। তিনি পোস্টিং পান নারায়নগঞ্জের বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এক বছরের মাথায় তিনিও চলে আসেন ঢাকায়। এছাড়াও ডা. মোনালিসা মুশতারি। তার পোস্টিং ছিল বাগেরহাটে। তিনিও ৬ মাসের মাথায় বদলি নিয়ে আসেন ঢাকায়। ডা. শারমিন সুলতানা তার পোস্টিং ছিল সিলেটে। তিনিও ঢাকায় বদলি আসেন। এ রকমভাবে প্রায় ১৪০ জন ডাক্তারকে পোস্টিংয়ের কখনো ৩ মাস কখনো ৬ মাস পর পছন্দের জায়গায় বদলি করা হয়েছে। বদলির ক্ষেত্রে নেয়া হয়েছে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। নাম প্রকাশ না করা শর্তে বদলি হওয়া ডাক্তাররা বলেন, বদলি হতে কিছু না কিছু তো লেগেছে। কাকে দিয়েছেন এমন প্রশ্নে তারা বলেন, যারা বদলি করতে পারেন তাদের-ই টাকা দেয়া হয়েছে।

কেনাকাটায় দূর্নীতি

ইউনানী আয়ুর্বেদিক ও হোমিও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেনাকাটায়ও এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কোটি টাকার যন্ত্রপাতি এবং ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে কোন ধরনের নিয়ম মানা হয় না। চলতি বছরের ৬ আগষ্ট সরকারি ইউনানী আয়ুর্বেদিক কলেজ ও হাসপাতালের জন্য একটি করে মোট ৩টি আলট্রাসানোগ্রাম মেশিন, একটি ইসিজি মেশিন, প্রিন্টার, ইউপিএস ও ট্রলি বরাদ্দ দেয়া হয়। এসব যন্ত্রপাতির দাম প্রায় কয়েক কোটি টাকা। এসব যন্ত্রপাতি কেনায় কোন টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি। লোক দেখানো কোটেশন করে মেশিনগুলো কিনে এগুলো সরবরাহ করা হয়েছে। এখাতেও বড় ধরনের দূর্নীতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে একইভাবে ৩টি কলেজে হিটাচি প্রজেক্টর সরবরাহ করা হয়েছে। সেখানে দূর্নীতি করা হয়েছে। এছাড়াও সরকারি হাসপাতালগুলোতে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক এবং হোমিও ওষুধ সরবরাহের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ধরনের দূর্নীতি। পছন্দের বাইরে কোম্পানি থেকে কোন ওষুধ নেয়া হয় না। চলতি বছরের জুনে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলার ১৬টি উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ লাখ করে মোট ৪৮ লাখ টাকার ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। অভিযোগ_ এখানে বড় ধরনের দূর্নীতি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে কয়েকজন চিকিৎসক জানান, মূলত লাইন ডিরেক্টর ডা. মনোয়ারা ও তিনজন চিকিৎসকের কাছে জিম্মি এ খাত। তাদের অনিয়ম, দূর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় অসহায় পুরো খাতটি। এখানে ঘুষ ছাড়া কোন ধরনের কাজ হয় না। তাদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত করলে প্রত্যেকটি অনিয়মের প্রমাণ মিলবে।

আরো কয়েকজন চিকিৎসক জানান, তাদের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পান না। তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করে নানাভাবে নাজেহাল করা হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কেউ এ ধরনের অভিযোগ করে থাকলে তা মিথ্যা। আর আমরা যেহেতু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চাকরি করি, তাই লাইন ডিরেক্টরের কথা মেনেই আমাদের কাজ করতে হয়। এখানে সিন্ডিকেট বলতে কিছু নেই।

পরিচালক হোমিও ও দেশজ চিকিৎসা এবং লাইন ডিরেক্টর ডা. মনোয়ারা সুলতানার মোবাইল ফোন নম্বরে কল করা হলে_ মিটিংয়ে রয়েছেন বলে তিনি কল কেটে দেন। এছাড়াও ডা. কামরুজ্জামান সুমন ও ডা. কামরুল কায়েস এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন