মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৫:১৪:২৪ এএম

জেরুসালেম ইসরাইলিদের নয়

গোলাম মাওলা রনি | খোলা কলাম | বৃহস্পতিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ | ০৪:৫৮:৫৪ পিএম

খ্রিষ্টানেরা কেনো জেরুসালেমের জবরদখলে ইহুদিদের জেলুড়বৃত্তি করছে অথবা কোন অধিকার বলে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো এবং একটি অবৈধ রাষ্ট্র কিভাবে তামাম দুনিয়ার মুসলিমদের মহা পবিত্রভূমি জেরুসালেমকে নিজেদের রাজধানী বানানোর দুঃসাহস দেখাল, তা আমার মাথায় না ঢুকলেও এ কথা দিব্যি বুঝতে পারি, কী কারণে হঠাৎ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইহুদি রাষ্ট্রের অপতৎপরতার আগুনে ঘৃতাহুতি দিলেন! দেশে ও বিদেশে ব্যাপক অজনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প তার আপন দেশে সম্প্রতি মারাত্মক কতগুলো বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন। নিজ দলের সাথে বিরোধিতা, সিনেট ও কংগ্রেস উভয়কক্ষের সাথে দূরত্ব, সিআইএ, মার্কিন বিচার বিভাগসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থার সাথে ট্রাম্পের সম্পর্ক ভয়াবহরকম তলানিতে পৌঁছে গেছে। দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাজ্যের সাথে মতবিরোধ, উত্তর কোরিয়ার সাথে সমস্যা, ইরান-তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় খারাপ অবস্থায় রয়েছে।

দেশী-বিদেশী চতুর্মুখী সমস্যার সাথে আরো যেসব সমস্যা ট্রাম্পকে কাণ্ডজ্ঞানহীন করে তুলছে, তার মধ্যে প্রধান হলো মার্কিন মুল্লুকের ঐতিহ্যবাহী এবং অত্যন্ত শক্তিশালী গণমাধ্যমগুলোর সাথে তার যুদ্ধ। মার্কিন বুদ্ধিজীবী, প্রভাবশালী অভিজাতবর্গ, ধনিকশ্রেণী, আফ্রো-এশিয়ান-আমেরিকান সম্প্রদায়কে তো তিনি রীতিমতো শত্রু বানিয়ে ফেলেছেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু রেস্ক টিলারসনের সঙ্গেও আগের সেই সম্পর্ক আর অবশিষ্ট নেই। এতসব সমস্যা ও বিপর্যয়ের মধ্যে ট্্রাম্পের বিরুদ্ধে গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় রাশিয়ার সাথে আঁতাতের যে অভিযোগ উঠেছিল, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তে তিনি দোষী প্রমাণিত হলে তাকে অবশ্যই ইমপিচমেন্ট মোকাবেলা করতে হবে। এ অবস্থায় সুচতুর ট্রাম্প তার গদি ঠিক রাখার জন্য বিশ্বের শক্তিশালী ইহুদি লবিকে নিজের পক্ষে ভেড়ানোর উদ্দেশ্যে হঠাৎ করেই জেরুসালেমকে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের রাজধানী বলে ঘোষণা দিয়ে প্রশাসনিক ডিগ্রি জারি করে বসলেন।

ট্রাম্পের ঘোষণার সাথে সাথে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো মুসলিম দুনিয়া উত্তাল হয়ে পড়ল। ইসরাইলের অধিকৃত পশ্চিম তীর, গাজা, নাবলুস, হেবরনসহ ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ল। দীর্ঘদিনের মার্কিনমুখী পশ্চিমা দেশগুলোও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করে ভিন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে গেল। এমনকি খোদ মার্কিন মুল্লুকেও শুরু হলো ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ। নতুন এই উত্তেজনায় লোকজন ট্রাম্পের অতীত অপকর্ম, ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে অসন্তোষ ইত্যাদি ভুলে গিয়ে শুধু ইসরাইল, জেরুসালেম এবং ফিলিস্তিনি সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। খোদ জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদও নজিরবিহীনভাবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াল। আরব লিগ এবং ওআইসি দীর্ঘদিন পর ট্রাম্পের কল্যাণে পুনরায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরব হয়ে উঠল। এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মার্কিন মদদপুষ্ট সৌদি আরব কোণঠাসা হয়ে পড়ল এবং তুরস্ক ও ইরান নতুন করে নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।

জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে কী কী পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে, তা ট্রাম্প বেশ ভালোভাবেই জানতেন। তিনি এ কথাও খুব ভালোভাবে জানেন, তার এই স্বীকৃতি শেষ অবধি বহাল থাকবে না এবং আগামী দিনে ইসরাইল রাষ্ট্রটির অস্তিত্বও থাকবে না। তারপরও তিনি নির্লজ্জভাবে ইহুদিদের পক্ষ নিয়েছেন মূলত তিনটি কারণে। প্রথমটি হলো- নিজের গদি রক্ষা। দ্বিতীয়ত- মুসলিমবিদ্বেষ এবং তৃতীয়ত- বিশ্ব রাজনীতিকে ওলটপালট করে দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের নামে মার্কিন স্বার্থ হাসিল করা। ট্রাম্প খুব ভালো করেই জানেন, প্রতি ১০০ বছর অন্তর প্রাকৃতিক কারণে দেশগুলোর মানচিত্র পরিবর্তন হয়ে যায়। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বহু দেশের যেমন নতুন মানচিত্র হয়েছে, তেমনি অনেক দেশ তাদের পুরনো মানচিত্র পাল্টাতে বাধ্য হয়েছে। এই হিসাবে আগামী ২০৪৫ সাল থেকে ২০৭৫ সাল অবধি বিশ্বে অনিবার্যভাবে যেসব মানচিত্রের পরিবর্তন ঘটবে, তার মধ্যে ইসরাইলের মানচিত্রটির কবর রচনা করা হলো জেরুসালেমের দেশটির রাজধানী ঘোষণার মাধ্যমে। অন্যদিকে, ট্রাম্প তার স্বীকৃতির মাধ্যমে উল্লিখিত কবরে ইসরাইল রাষ্ট্রটিকে লাশ বানিয়ে সমাহিত করার ব্যবস্থা পাকা করে দিলেন।

এ কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি, তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ মদদে আমেরিকা এবং তাদের পশ্চিমা মিত্ররা পৃথিবীর বিষফোঁড়া বলে খ্যাত ইসরাইল রাষ্ট্রটিকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্র বিশ্ব মানবতা, সভ্যতা, কৃষ্টি, কালচার, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক এবং প্রলয়ঙ্করী হতে পারে, তার নজিরবিহীন উদাহরণ হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত ইসরাইল এবং তাদের দোসর ব্রিটিশদের কুকর্মগুলো পৃথিবীবাসী স্মরণ করবে। কোনো ধরনের যৌক্তিক কারণ ছাড়া ন্যায়নীতি উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে জোরজুলুম ও অত্যাচারের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের বুকের ওপর যেভাবে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটিকে ক্যান্সারের মতো স্থাপন করা হয়েছে, তেমনি বিশ্বের ইতিহাসে কোনো দিন যেমন ঘটেনি, তেমনি হয়তো আগামী দিনেও এমনটি ঘটবে না। প্রকৃতির অভিশাপে ইহুদিরা বহু শত বছর ধরে রাজ্যহীন অবস্থায় দুনিয়ার পথেপ্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তাদের অর্থবিত্ত ও প্রভাব ছিল বটে- কিন্তু স্রষ্টার সাথে নাফরমানির কারণে তারা রাজ্যহীন হয়ে অভিশপ্ত, লাঞ্ছিত ও অপমানিতের জীবনযাপন করছিল। ইসরাইল ও ইহুদিদের প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য আমরা এবার ইতিহাসের কিছু নির্মম সত্য তুলে ধরব।

নবী ও রাসূলদের মধ্যে সর্বপ্রথম হজরত ইবরাহিম আ: ইসরাইলে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তিনি শুধু নবী ছিলেন না; ছিলেন গোত্রপতি এবং সম্ভবত জেরুসালেমের শাসনক্ষমতাও তার হাতে ছিল। আরবের বেশির ভাগ জাতিগোষ্ঠী এবং ধর্মমত হজরত ইবরাহিম আ:-এর বংশ থেকে উৎসারিত। তার প্রপৌত্র হজরত ইয়াকুব আ:-এর অপর নাম ছিল ইসরাইল এবং হজরত ইয়াকুব আ:-এর বংশধরদেরই বলা হয় বনি ইসরাইল। ইহুদিরা দাবি করেন, তারা নবীর বংশধর এবং রাজার জাতি। কিন্তু তাদের হাতে কত নবী লাঞ্ছিত হয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এবং অপমানিত হয়ে দেশছাড়া হয়েছেন, সে কথা তারা না বললেও বিশ্ববাসী তা ভালো করেই জানেন। নিবন্ধের শুরুতেই বলা হয়েছে, আমার মাথায় ঢুকছে না- কেনো খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের তাঁবেদারি করছে। কারণ, খ্রিষ্টানেরা যাকে নবী বলে মান্য করে, সেই হজরত ঈসা আ:কে ইহুদিরাই নির্মমভাবে খুন করেছিল। শুধু কি তাই? হজরত ঈসা আ:-এর মা হজরত মরিয়মকে চরিত্রহীনতার অপবাদ দিয়েছিল। তারা হজরত মরিয়মের সাথে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তুলে বয়োবৃদ্ধ নবী হজরত ইয়াহিয়া আ: এবং তার ছেলে হজরত জাকারিয়া আ:কে করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে হত্যা করেছিল।

ইহুদিরা যার অনুসারী সেই নবী হজরত মুসা আ:-এর জীবন তারা নানাভাবে অতিষ্ঠ করে ফেলেছিল। তাদের আরেক পূর্বপুরুষ এবং নবী হজরত ইউসুফ আ:-এর জামানায় তারা জেরুসালেম ও পার্শ্ববর্তী এলাকা ত্যাগ করে সদলবলে মিসর চলে যায়। নিজেদের কুকর্ম ও নাফরমানির কারণে তারা সময়ের পরিক্রমায় মিসরের ক্রীতদাস সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। আল্লাহর দয়ায় বনি ইসরাইলের ১২ লাখ লোককে হজরত মূসা আ: দাসত্ব থেকে মুক্ত করে মিসর থেকে বের করে নির্জন তিহ ময়দানে নিয়ে আসেন। এখানে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের জন্য আসমান থেকে মান্না ও সালওয়া নামক নেয়ামত পাঠিয়ে হররোজ রিজিকের ব্যবস্থা করতেন। একদা আল্লাহর হুকুমে হজরত মুসা আ: তাদেরকে জিহাদ করার আহ্বান জানান সম্ভবত জেরুসালেমসহ ফিলিস্তিনি এলাকা জয় করার জন্য, যা তখন বর্তমান লেবানন অঞ্চলের দুর্ধর্ষ উপজাতি বনু আমালিকরা দখল করে রেখেছিল।

হজরত মুসা আ: থেকে জিহাদের আহ্বান শোনার পর বনি ইসরাইলিরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের শানে অমর্যাদাকর কথাবার্তা বলতে শুরু করল এবং অবাধ্য হয়ে জিহাদে অংশ না নেয়ার কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলো। তারা বললেন- হে মুসা! আমরা তো মিসরে ভালোই ছিলাম। তোমার আল্লাহ ও তোমার কথা মতো এই নির্জন প্রান্তরে এসে দেখি ভারি বিপদে পড়লাম। আগে কাজকর্ম করে খেতাম এবং প্রাণটা নিয়ে বেঁচে থাকতাম। এখন তুমি আমাদেরকে নির্দয়ভাবে যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দিয়ে নির্ঘাত মৃত্যুর মুখোমুখি করছো- এ তো ভারি অন্যায় এবং মস্তবড় জুলুম। আমরা যুদ্ধ করতে পারব না। কারণ, এই নির্জন প্রান্তরে শুয়ে বসে খেতে খেতে আমরা মোটা এবং খাটো হয়ে গিয়েছি। এই অবস্থায় বনু আমালিকরা আমাদেরকে পেলে আমাদের হলকম চেপে ধরে প্রথমে শূন্যে তুলে ধরবে। এরপর জমিনের ওপর আছাড় দিয়ে মেরে ফেলবে। সুতরাং আমরা যাব না- হে মুসা! তুমি এবং তোমার খোদা মিলে জিহাদে যাও এবং যুদ্ধ করো।

ইহুদিরা ইসরাইল রাষ্ট্রের ইতিহাস টানতে গিয়ে হজরত সোলায়মান আ: প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রটির কথা উল্লেখ করে নিজেদের দাবির পক্ষে যুক্তি দেখান। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো- তারা হজরত সোলায়মান আ:কে নবী হিসেবে উল্লেখ না করে কিং সলোমন বা রাজা সলোমন বলে থাকেন। অপরদিকে, হজরত সোলায়মান আ:-এর পিতা হজরত দাউদ আ: সম্পর্কে তারা অপমানজনক এবং কলঙ্কজনক গিবত প্রচার করে আসছে। তারা হজরত দাউদ আ:কে কিং ডেভিড হিসেবে ডাকে এবং তাঁর নৈতিক চরিত্র নিয়ে অত্যন্ত আজেবাজে কথা বলে। এমনকি তারা হজরত ইব্রাহিম আ: সম্পর্কে খুব বাজে কুৎসা রটনা করে। মা হাজেরার সঙ্গে বিয়ের বৈধতা এবং হজরত ইসমাইলের জন্ম সম্পর্কে তারা নানান আপত্তিমূলক কথাবার্তা রটাতে থাকে।
ইহুদিদের ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। নেই কোনো আইনগত বৈধতা। কারণ পৃথিবী সৃষ্টির পর কোনো কালে জেরুসালেম কোনো ইহুদি রাষ্ট্র ছিল না। হজরত সোলায়মান আ: নিজেকে কোনো দিন ইহুদি পরিচয় দেননি। অন্যদিকে তিনি জেরুসালেমে মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেছিলেন, যাকে ইহুদিরা তাদের হাইকল বলে দাবি করে আসছে কিন্তু জেরুসালেমে তার রাজধানী ছিল এমন ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হজরত সোলায়মান আ:-এর পরে কোনো স্বাধীন রাজা দীর্ঘদিন একচ্ছত্রভাবে জেরুসালেম শাসন করেছেন এবং তিনি ইহুদি ছিলেন এমন তথ্য বিশ্ব ইতিহাসে নেই। ইহুদি ধর্মে জেরুসালেমকে পবিত্র মনে করা হলেও তাদের ধর্মগ্রন্থে এই নগরীর ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই। হজরত সোলায়মান আ:-এর পরবর্তী জামানায় জেরুসালেম বিভিন্ন সময়ে পারস্য, মিসর, ব্যাবিলন, সিরীয় এবং রোমান সম্রাটদের করদ রাজ্য হিসেবে শাসিত হতো।

মুসলমানদের খলিফা হজরত ওমর রা:-এর শাসনামলে জেরুসালেম অধিকৃত হলে কুরআনে বর্ণিত মসজিদুল আকসার স্থানে খলিফার নির্দেশে একটি মসজিদ তৈরি করা হয়। পরে উমাইয়া খলিফা আল মালিক ইবনে মারোয়ান এবং আল ওলিদ ইবনে মালিক মসজিদটি বর্ধিত আকারে পুনর্নির্মাণ করেন, যা সারা দুনিয়ায় মসজিদুল আকসা হিসেবে পরিচিতি পায়। মুসলমানদের শাসনামলে জেরুসালেম সর্বদা মুসলিম সালতানাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয়ভাবে শাসিত হতো। পরধর্ম সহিষ্ণুতার নিদর্শন হিসেবে মুসলমানেরা জেরুসালেম নগরীতে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বসবাসের অনুমতি দিয়েছিল। মুসলমান শাসকদের উদারতার সুযোগ নিয়ে খ্রিষ্টানদের রোমান ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীরা হঠাৎ করেই মধ্যযুগের প্রারম্ভে জেরুসালেমকে নিজেদের নগরী দাবি করে বসেন। রোমান ক্যাথলিক ধর্মগুরু বা পোপেরা বিভিন্ন সময়ে ইউরোপের রাজা-বাদশাহ-সম্রাট ও সামন্তদেরকে নানাভাবে উত্তেজিত করে মধ্যপ্রাচ্যে অভিযান পরিচালনা করার জন্য বাধ্য করেন। ফলে ইউরোপজুড়ে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের নামে যে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে তা প্রায় ৪০০ বছর স্থায়ী হয়। ১০৯৫ সালে প্রথম ক্রুসেড পরিচালিত হয় এবং সর্বশেষ অভিযান চলে ১৪৯২ সালে।

খ্রিষ্টান ধর্মযোদ্ধারা দীর্ঘ ৪০০ বছর চেষ্টা করেও জেরুসালেমের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। এই সুদীর্ঘ সময়ে পৃথিবীর কোনো প্রান্ত থেকে কেউ কোনো দিন ভুল করেও মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের সঙ্ঘাতের মধ্যে যে ইহুদিদের সামান্য স্বার্থ থাকতে পারে, তা নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। খ্রিষ্টানেরা মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মযুদ্ধের নামে যে নৃশংসতা ও বর্বরতা চালিয়েছে তা মানব ইতিহাসে এক ঘৃণিত অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। সমস্ত আরব ভূখণ্ডের মুসলমান শাসকেরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করে বারবার ক্রুসেডারদের পরাজিত করে পর্যুদস্ত অবস্থায় তাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে সিরিয়া ও আলেপ্পোর শাসক ইমামউদ্দিন জঙ্গি এবং নূরউদ্দিন জঙ্গি ক্রুসেডারদের কাছে রীতিমতো আতঙ্কে পরিণত হয়েছিলেন। এই দুই মহান শাসকের সারা জীবনের অবিরত লড়াই-সংগ্রামের কারণে হানাদার ক্রুসেডারদের দৌরাত্ম্য কমতে থাকে। পরে মিসরীয় সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির হাতে সম্মিলিত ইউরোপীয় বাহিনীর পতন হয় এবং মুসলমানরা চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে। এই ঘটনার পর থেকে প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হওয়া অবধি জেরুসালেমের ওপর মুসলমানদের নীরবচ্ছিন্ন আধিপত্য বজায় ছিল।

প্রথম মহাযুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনীর কাছে অটোম্যান তুর্কি সালতানাতের পতন হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তি আধিপত্য লাভ করে। মিসর, জেরুসালেম প্রভৃতি এলাকার ওপর ব্রিটিশরা কর্তৃত্ব পায় এবং সিরিয়ার দখলদারিত্ব পায় ফ্রান্স।গ মিসরীয় সুলতান গাজী সালাহউদ্দিনের সঙ্গে সর্বশেষ ক্রুসেডের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ব্রিটেনের তৎকালীন সম্রাট রিচার্ড, যাকে বীরত্বের কারণে বলা হতো রিচার্ড দ্য লায়ন হার্ট। যুদ্ধে সম্রাট রিচার্ড বন্দী হয়েছিলেন এবং নিজের বোনকে-সুলতান সালাহউদ্দিনের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে সে যাত্রায় প্রাণভিক্ষা পেয়েছিলেন। ব্রিটিশরা তাদের সবচেয়ে নামকরা এবং প্রসিদ্ধ সম্রাটের সকরুণ পরিণতি কোনো দিন ভুলতে পারেনি। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরপর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিসহ বৈশ্বিক অবস্থা যখন তাদের অনুকূলে ছিল ঠিক তখন অতীতের সেই প্রতিশোধস্পৃহা এবং মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাবের কারণে তারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্বাস্তু ইহুদিদের মধ্যপ্রাচ্যে এনে জেরুসালেমসংলগ্ন ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করে, যার বিষবাষ্প আজো পৃথিবীকে কলুষিত করে তুলছে।-নয়াদিগন্ত।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন