মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারী ২০১৮ ০৮:২০:৪০ এএম

ছাত্রশিবিরের ৪১বছরে এবার বিতর্কিত কমিটি!

রাজনীতি | শুক্রবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭ | ০১:০৩:৩৩ এএম

৪১ বছরের ইতিহাসে ইসলামী ছাত্রশিবিরে এবার বিতর্কিত কমিটি গঠন হয়েছে। ছাত্রশিবিরের ইতিহাসে কুমিল্লা সিন্ডিকেটের কারণে এবারই ঐতিহ্য বিরোধী কমিটির মাধ্যমে কালো অধ্যায় রচিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কমিটির বিরুদ্ধে সোচ্ছার হয়ে উঠেছে শিবিরের সাবেক এবং বর্তমান নেতাদের একটি বৃহৎ অংশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি এতদিন প্রায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলমুক্ত থাকলেও এই মুহূর্তে নব্য সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত ও সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে পড়েছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। সংগঠনটির সূত্রে জানা যায়, ৪১ বছরের ইতিহাসে শিবিরের কোনো সেক্রেটারি দ্বিতীয়বারের মতো সেক্রেটারি ছিলো না। এবারই প্রথম দ্বিতীয়বারের মত স্বপদে বহাল থাকলেন সেক্রেটারি মোবারক। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এদের দুজনের বাড়ীই কুমিল্লাতে। উল্লেখ্য, ছাত্রশিবিরে ২য় মেয়াদে সেক্রেটারী হওয়ার ক্ষেত্রে গঠণতন্ত্রে কোনো বাধা না থাকলেও ঐতিহ্যগত বাধা রয়েছে। যাকে কেন্দ্র করে ২০১০ সালে শিশির মনিরকে বিদায় দিয়ে দলীয় কোন্দলের সূচনা ঘটে।

এদিকে গত কয়েক বছর মাথা ছাড়া দিয়ে উঠেছে শিবিরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লা মহানগরী শিবির কয়েক ধাপে বিভক্ত রয়েছে।তাদের মধ্যে কুমিল্লা চাঁদপুর গ্রুপ ও স্থানীয় গ্রুপ অন্যতম। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে দলীয় কোন্দলে শিবিরের কুমিল্লা মহানগরী অফিসে তালা লাগিয়ে দেয় স্থানীয় গ্রুপ। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ইতিহাসের কূ-অধ্যায় রচিত হয় স্থানীয় শিবির থেকে। পরে তখনকার শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জেনারেল আবদুল জব্বার ঘটনাস্থলে গিয়ে রফাদফার চেষ্টা করেও তালা খুলতে ব্যর্থ হন। এক পর্যায়ে স্থানীয় গ্রুপের তোপের মুখে তালা না খুলেই ঢাকায় ফিরে আসেন জব্বার।

সূত্রের দাবী, সেদিনের ক্ষমতা অপব্যবহারের অন্তরালেও ছিলো শিবিরের ২০১৮ সালের জন্য দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়া সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত ও সেক্রেটারী মোবারক হোসাইন। শিবিরের প্রোগ্রাম থেকে জামাত নেতাকে লাঞ্চিত ও বয়কটের ঘটনাও ঘটে কুমিল্লার স্থানীয় শিবির থেকে। এর আগে ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সভাপতি পদে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হন মুহাম্মদ রেজাউল করিম। কিন্তু তখন সেক্রেটারি জেনারেলের পদ থেকে ছিটকে পড়েন শিশির মুহাম্মদ মুনির। যার স্থলাভিষিক্ত হন ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন। শিবিরের একটি বড় অংশ সেক্রেটারি পদে মামুনের আসাকে গ্রহণ করলেও মেনে নিতে পারেনি সভাপতি পদে রেজাউল করিমের দ্বিতীয় মেয়াদে আসাকে। কারণ নির্বাচনের আগে থেকেই ভেতরে ভেতরে সভাপতি পদে শিশির মোহাম্মদ মনিরের আসার সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছিল। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যায়ের নেতাকর্মীদেরও এই বিষয়টিতে ব্যাপক সমর্থন ছিল। দ্বিতীয় মেয়াদে সেক্রেটারী থাকার নজির এ সংগঠনে নেই তখন এমন দাবিও করা হয় শিবির থেকে। শিবির সেক্রেটারিই আগামী এক বছরের জন্য সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সংগঠন পরিচালনা করবে। আলোচিত ঐ ঘটনার পর থেকে দলটির প্রথম সারির শাখা হিসেবে বিবেচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাথে কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বন্দ এখনো অব্যাহত রয়েছে। জানা যায়, এরপর থেকে কেন্দ্রের চাপানো বহু নির্দেশনা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি অনুসরণ করেন না। তখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে মেইল পাঠিয়ে বিদ্রোহী গ্রুপ রীতিমতো সতর্ক করে দেয় জামায়াতের তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বকে। বিভিন্ন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত মেইলে একটি মেইলও পাঠানো হয় 'সেভ শিবিরের' ঠিকানা থেকে। যেখানে বলা হয়েছে, “প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা-শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. মামুন ভাই পদত্যাগ করেছেন। লাস্ট পরিষদ মিটিংয়ে মামুন ভাই পদত্যাগ করেছেন যেখানে শিবির গঠিত ২০১০ সালের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের ২৫জন বিদ্রোহী নেতা যৌথ বিবৃতি দিয়ে শিবিরকে রক্ষা করার আহ্বান জানান। তাঁর পদত্যাগের কারণ হলো, বর্তমান প্রেসিডেন্ট রেজাউল করিম, তৎকালীন জামায়াত নেতা মুজাহিদ ও রফিকুল ইসলামসহ অনেকের নগ্ন অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপ।” উল্লেখ্য, পদত্যাগ করা সংগঠনটির ২৫নেতা তখন দলটির আদর্শ থেকে বেরিয়ে আসলেও পরে আবার জামাতের শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপে অনেকে ফিরে আসেন। তবে যৌক্তিক দাবিতে অনড় থাকা তখনকার দায়িত্বরত আহমেদ শিহাবুল্লাহ, আহমেদ জাহেদুল আনোয়ার ও আনিসুর রহমানসহ ৬জন কেন্দ্রীয় নেতা মৌলবাদি দলটির ছায়াতলে আর ফিরে আসেননি।

শিবিরের আগের দলীয় কোন্দল এবং শিবিরের বর্তমান প্রশ্নবিদ্ধ নব্য কমিটি নিয়ে ঢাকা বিশ্বিদ্যালয়ের শিবিরের এক নেতার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। যে সত্য ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল ছাত্রশিবির সে ভিত আজ নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। সমাজের সাধারণ মানুষ ও শুভাকাঙ্খীদের দোয়া ও সৎ পরামর্শ যেখানে ছাত্রশিবিরকে জনগণের মনের কোঠায় স্থান করে দিয়েছে, আজ সে সংগঠন জনশক্তি ও শুভাকাঙখীদের কাছে হতে বসেছে প্রশ্নবিদ্ধ। এর আগে একবার স্বজন-প্রীতি করার মাধ্যমে সংগঠন অনেক প্রশ্নের সম্মক্ষীণ হয়েছে জনশক্তির কাছে। ফের আবারো জাতীয়তাবাদ অগ্রাধিকার পাওয়ায় প্রশ্নের তীরের সম্মক্ষীণ হতে হবে স্বচ্ছ সংগঠনটিকে। তিনি বলেন, শিবিরে নেতৃত্বের অভাব নেই, ইয়াছিন ভাই বিদায় নেবে মোবারক ভাই সভাপতি হবে এটিই স্বাভাবিক। আর সভাপতি ২য় মেয়াদে থাকলেও ঐতিহ্য অনুযায়ী নতুন সেক্রেটারী মনোনীত হওয়ার কথা ছিল। যখন সাবেক সভাপতি দেলোয়ার ভাইসহ শীর্ষ ভাইয়েরা কারাগারে ছিলো তখনো নেতৃত্বের অভাব দেখা দেয়নি। তাহলে এখন কেন? তাহলে কি শিবিরের নেতৃত্বে ভাটা পড়েছে? নাকি বর্তমান সেক্রেটারি সভাপতি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেননি? আমি বলবো এটি নিতান্তই স্বজনপ্রীতি।’’ তিনি আগাম প্রশ্ন রেখে বলেন, এখন যদি আগামী ষান্মাসিকে ইয়াসিনকে বিদায় দিয়ে সেক্রেটারিকে সভাপতি বানানো হয় তাহলে সংগঠনে আরেকটি বিশৃঙ্খলার জন্ম হবে। কারণ বিগত ৪১ বছরে ষান্মাসিকে কোনো শিবিরের সভাপতি অথবা সেক্রেটারিকে বিদায়ের রেওয়াজও নাই।

এ নিয়ে শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি মোবারক হোসাইনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফেসবুকে টেক্সট করেও কোনো উত্তর মেলেনি তার কাছ থেকে।-পূর্বপশ্চিমবিডি।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন