বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ ০১:১৪:১২ এএম

সামনে নির্বাচন: নতুন বছরে যা করবে বিএনপি

রাজনীতি | সোমবার, ১ জানুয়ারী ২০১৮ | ১১:৩৭:০৫ এএম

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বছরে সাফল্য আনতে চায় বিএনপি। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সর্বাত্মক প্রস্তুতিই এখন দলটির প্রধান লক্ষ্য। নেতারা আভাস দিচ্ছেন, সতর্কতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে এগোবে বিএনপি।

নির্বাচনে 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' তথা সব প্রতিদ্বন্দ্বীর সমান সুযোগের নিরপেক্ষ পরিবেশ তৈরি না হলে আবারও নির্বাচন বর্জন করে প্রতিহত করার চেষ্টাও করবে তারা। যদিও ২০১৩-১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে দলটি তাতে ব্যর্থ হয়েছিল। শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা মোকাবেলায় পর্যুদস্ত। তবে দলের জনসমর্থন রয়েছে বলে নেতারা আস্থা প্রকাশ করেন। তাই আবারও কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন বছরে নানা কৌশলী পরিকল্পনা নিয়ে এগোবেন তারা।

দলের নীতিনির্ধারক নেতারা বলছেন, এবার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাদের লড়তে হবে। অন্য কোনো বিকল্প নেই। দাবি আদায় করেই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। নির্বাচনে অংশ না নিলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। নিবন্ধন বাতিলের আশঙ্কাও রয়েছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ২০১৮ সাল হলো বিএনপির। এ বছর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তারা আশাবাদী, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই চ্যালেঞ্জে সাফল্য অর্জন করতে পারবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে' অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের জন্য যা যা করার বিএনপি তার সবই করবে। কোনোভাবেই এবার আর একতরফা নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না।

দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক সেটাই চান। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা যাতে যে কোনোভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে না পারে সেজন্য নির্বাচন এড়িয়ে যাওয়া বা বানচালের কোনো সুযোগ তৈরি হতে দিতে চায় না বিএনপি। কিন্তু তাদের সমর্থক জনগণকে তারা সক্রিয় করতে চায়। নতুন বছরের প্রথম ছয় মাস ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি দিয়ে রাজপথে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করবে তারা। দাবি পূরণে সরকারের গতিবিধি দেখে বছরের শেষ ছয় মাসেই আন্দোলনের কর্মসূচিসহ হার্ডলাইনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

২০১৮ সালের শেষে হতে পারে সংসদ নির্বাচন। আজ থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনী বছরটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বিএনপি। সময় ও সুযোগ বুঝে নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করবেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। নির্বাচনী ইশতেহারের খসড়া তৈরির কাজ চলছে। এর আগে দেওয়া 'ভিশন-২০৩০'-এর আলোকেই ইশতেহার তৈরি হচ্ছে, যাতে বেশ কিছু চমক থাকবে। যোগ্য প্রার্থী দেওয়ার জন্য একাধিক জরিপ পরিচালনা করছে দলটি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সমকালকে বলেন, ২০১৮ সালে দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে। তারা গণতন্ত্র ফিরে আনার জন্য দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করবেন। একই সঙ্গে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবেন। বছরটিতে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু পরিবেশ প্রয়োজন। নির্বাচনকালীন সরকার নিশ্চিত হতে হবে। তারা আশা করেন, সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দিলে এ ব্যাপারে সংলাপ ও সমঝোতায় আসবেন।

দলের নেতারা জানান, ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন বর্জনের মতো আর ভুল করতে চাইবে না বিএনপি। যে কোনো প্রক্রিয়ায় নির্বাচনী ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করবে তারা। ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিকল্পনা থেকে নির্বাচন কমিশন গঠন ও শক্তিশালী করা নিয়ে প্রস্তাব পেশ, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে দলটি যোগদান করেছে। ইতিমধ্যে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিভিন্ন সভা-সেমিনারে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি বিজয়ী হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। যদিও শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী পদে রেখে এবং নির্দলীয় সরকারের অধীন ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিচ্ছে। তবে শেষ মুহূর্তে কিছুটা ছাড় দিয়েই নির্বাচনে যেতে পারে দলটি।

নতুন বছরের প্রথম ছয় মাসে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিরসন করে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে কাজ করা হবে বলে জানান নেতারা। শিগগির জেলা ও উপজেলা, ইউনিয়নসহ সব অসমাপ্ত কমিটিগুলো পুনর্গঠন কাজ সমাপ্ত করা হবে। তৃণমূল পুনর্গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজানসহ সাংগঠনিক সম্পাদকের দ্রুত পুনর্গঠন কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছেন খালেদা জিয়া।

সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচন বানচাল হওয়ার আশঙ্কায় সংঘাতপূর্ণ কর্মসূচি এড়িয়ে ইতিবাচক রাজনীতি করার কৌশল গ্রহণ করবে সংসদের বাইরে থাকা দলটি। এ বিষয়ে দলের নেতাকর্মীদের সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন, সরকারি দলের পক্ষ থেকে কোনো উস্কানিমূলক বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া হলেও ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। কোনো হঠকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যাতে কেউ 'ঘোলা পানিতে মাছ শিকার' করার সুযোগ না পায়। বিএনপি মনে করে, নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু হলে বিএনপি জিতবে। তাই নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও করছেন দলটির হাইকমান্ড।

বিএনপির শীর্ষনেতারা জানান, নিকট অতীতের অভিজ্ঞতায় ভুল করা সম্পর্কে তারা সতর্ক। নির্বাচনের এক বছর বাকি থাকতে এখনই আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে মামলা-হামলা ও গুমের মাধ্যমে লোকবলের ক্ষতির আশঙ্কা এড়াতে হবে। নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে হবে নির্বাচন আরও ঘনিয়ে এলে।

জানা যায়, আগামী ৫ জানুয়ারি সরকারের চার বছর পূর্তিতে 'গণতন্ত্র হত্যা দিবস' পালনে ঢাকাসহ সারাদেশে শান্তিপূর্ণ জমায়েত করতে চায় বিএনপি। এরপর বছরের প্রথম দিকে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলায় রায় হলেও কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামতে চাইবে দলটি। একসঙ্গে ছয় সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাঠ সরব রাখতে চায় তারা। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও কিছু দিনের মধ্যে বিভাগীয় সফরে যাবেন। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় নেতারা ৭৭টি সাংগঠনিক জেলা সফর শুরু করেছেন।

অবশ্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচারাধীন দুর্নীতর মামলা দুটির রায়ের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে। পাশাপাশি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে যেতে পারেন। দুই শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে দল ও জোট ভেঙে নির্দলীয় সরকার ছাড়াই দলের একাংশকে নির্বাচনে টেনে নেওয়ার আশঙ্কা করছেন নেতাকর্মীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

আলাপকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, নতুন বছরে দেশের জনগণের আর বিএনপির পরিকল্পনা একই। সময় বলে দেবে কখন তারা কী সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি দেবেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বিএনপি জনগণের ওপর নির্ভরশীল একটি দল। যা করার জনগণকে নিয়েই করবে। সরকারের মনোভাবের ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনে বিএনপি কী করবে। সূত্র: সমকাল

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন