সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮ ০৪:৪১:১৬ পিএম

গুরু হিজড়ার মৃত্যুতে শিষ্যরা হন বিধবা

বিবিধ | শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮ | ০৭:০৮:৪৯ পিএম

আমরা হিজড়া হলেও মৃত্যুর পর স্বাভাবিক নিয়মে কবরে সমাধি করা হয়। শুধু আমাদের গুরু (হিজড়াদের সর্দার) মারা গেলে শিষ্যদের একদিন বিধবা বেশে সাদা শাড়ি পরে থাকতে হয়।

নামাজের জানাজায় হুজুর না পেলে নিজেদেরকেই তা সম্পন্ন করতে হয়। দুঃখ একটাই হিজড়াদের বড় ধরনের কোনো রোগ হলে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়। তৃতীয় লিঙ্গের জন্য সরকারের সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ জরুরি।

কথাগুলো খুব আক্ষেপ করে বলছিলেন রাজধানীর শ্যামপুর বরইতলার হিজড়ানেত্রী ও সামাজিক উন্নয়নমূলক সংগঠন ‘সুস্থজীবন’ এর কোষাধ্যক্ষ লতিফা হিজড়া (৬০)।

শুক্রবার শ্যামপুর বরইতলায় লতিফা হিজড়ার ভাড়াবাসায় কথা হয় এই প্রতিবেদকের সাথে।

লতিফা হিজড়ার জন্মস্থান শরীয়তপুর জেলার সদর থানায়। জন্মের পনের বছর বয়সে সবার চোখে ও নিজেই নিজেকে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করেন।

আর তাই সমাজ ও পরিবারের চোখে হিজড়া হিসেবে বেশিদিন থাকা হলো না লতিফার। ওই সময়ে একাকি পাড়ি জমান কলকাতায়। বছর পাঁচেক পর বাংলাদেশে এসে রাজধানীর শ্যামপুর এলাকায় হিজড়া গোত্রের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন।

হিজড়া হিসেবে কতটুকু অবহেলিত? এমন প্রশ্নের উত্তরে লতিফা হিজড়া বলেন, সমাজের চোখে আমরা অঘোষিত অপরাধী ও পাপী, অথচ আমাদের মধ্যে অনেকেই ধর্মীয় জ্ঞানের দীক্ষিত হিজড়াও রয়েছেন। আবার আমরাও সাধারণ মানুষের মতো সচেতনতামূলক কাজে অংশগ্রহণ করি। সম্প্রতি আমরা এইচআইভি এইডসের ওপর ‘সুস্থজীবন’ সংগঠনের সঙ্গেও সফলভাবে কাজ করছি।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমরা চিকিৎসা নিতে কোনো হাসপাতালে গেলে হিজড়া হিসেবে নিম্নতম সেবা পাই। অর্থাৎ অনেকটা অবহেলিত মনে হয়, সেক্ষেত্রে সরকারের কাছে আমাদের দাবি, আমাদের জন্য আলাদা হাসপাতাল করা হোক, আবার আমাদের মধ্যে কারো বড় ধরনের অসুখ-বিসুখ হলে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়। কারণ আমাদের কল্যাণে নেই কোনো ফান্ড।

হিজড়াদের আয়ের উৎস কী? এমন প্রশ্নের জবাবে লতিফা বলেন, আমাদের গুরুর মাধ্যমে এলাকা ভাগ করা হয়। একেক গুরুর সমন্বয়ে রয়েছে চার থেকে পাঁচজনের হিজড়াদল। এলাকা ভাগ করায় আমাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা হয় না। আমরা সপ্তাহে একদিন যার যার এলাকায় হাত পেতে টাকা ওঠাই। যে যা দেয় এতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এছাড়া কারো সন্তান হলে আমরা একটু ভালো টাকা সম্মানী পাই।

এক প্রশ্নের জবাবে বাঁকা হাসিতে লতিফা বলেন, এতে একেকজন হিজড়ার মাসিক আয় আর কত! দশ থেকে বারো হাজার টাকার মতো।

হিজড়াদের মৃত্যুর পরে কি অনুষ্ঠান হয়? জানতে চাইলে এই বয়স্ক হিজড়া বলেন, আমাদের গুরু হিজড়ার মৃত্যু হলে চারদিন পর মিলাদ অনুষ্ঠান হয়। আর ৪০ দিন পর হয় বড় কুলখানি অনুষ্ঠান। যেখানে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা থেকেও হিজড়ারা অংশগ্রহণ করে।

হিজড়াদের প্রেম-ভালোবাসা আছে কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে লতিফার বাঁকা হাসির উত্তর, আমাদের মধ্যে প্রেম হয়। এটা অস্বাভাবিক না। কিন্তু দৈহিকভাবে কোনো সম্পর্ক হয় না। এতে মনের দুঃখ আরো বাড়ে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কীভাবে বলি আপনাকে, আমাদের তো বিধাতার পক্ষ থেকেই অভিশপ্ত জীবন।

অনেক হিজড়া শিশু দত্তক নিচ্ছে এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? জানতে চাইলে বলেন, দত্তক নেয়ার পক্ষে আমি বলবো না, কারণ একটা স্বাভাবিক শিশু আমাদের ঘরে থাকলে ওই শিশুকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলা কঠিন কাজ। তাছাড়া আমরা যে কাজ-কর্ম করি তাকে তো সে পথে নেয়াও ঠিক হবে না।

লতিফা হিজড়া বর্তমানে হিজড়াদের গুরু হিসেবে বরইতলাতে থাকেন। তার সঙ্গে রয়েছেন আরো চারজন সহকারী হিজড়া। আবার এই হিজড়ানেত্রী পাশাপাশি কাজ করছেন বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে। মাঝে মাঝে একান্ত অবসরে বেড়িয়ে আসেন বিভিন্ন দেশে। সেসব দেশের হিজড়াদের মতো বাংলাদেশের হিজড়াও উন্নয়নমূলক কাজে দেশকে এগিয়ে নেবে এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন ষাটোর্ধ্ব হিজড়া লতিফা।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন