সোমবার, ২১ মে ২০১৮ ০৪:৪৭:০৯ পিএম

কী হবে দেশের, চারদিকে আতঙ্ক!

রাজনীতি | শুক্রবার, ২৬ জানুয়ারী ২০১৮ | ০৪:৩৭:৩৬ পিএম

আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ৬ জনের রায়ের ঘোষণার দিন ধার্য করেছে আদালত। এতে করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্খা করছেন অনেকেই। রায়ের আগে ও পরে কী ঘটতে যাচ্ছে সেটা অজানা থাকলেও এর ভয়াবহতা নিয়ে ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে।

বিশেষ করে রায়ের দিন ধার্য করার পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং ছাত্রলীগের সাথে আ’লীগের বৈঠক করাকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আর এ রায়কে ঘিরেই ফের রাজনৈতিক অঙ্গন অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- খালেদা জিয়ার সাজা হলে দেশে আগুন জ্বলবে। আর আওয়ামী লীগ বলছে, দেশে সন্ত্রাসের কার্যকলাপ করা হলে জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

এদিকে খালেদা জিয়ার রায় নিয়ে আদালতের কর্মকাণ্ডে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন সরকার পক্ষের নেতারা। খালেদা জিয়ার সাজা হলেও তাদের কিছুই করার নেই। এক্ষেত্রে রাজনীতির প্রতিহিংসার কোনো যোগসূত্র নেই।

তবে ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কক্সবাজারের চকরিয়ায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেছিলেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হবে।

এছাড়া ২১ জানুয়ারি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায় আগামী দুই তিন মাসের মধ্যে হবে। রায়ে তিনি সাজাও পেতে পারেন আবার বেকসুর খালাসও পেতে পারেন। তবে আমার ধারণা তার সাজা হবে। খালেদা জিয়ার সাজা হলে একদিনের জন্য হলেও তাকে জেলে যেতে হবে। সাজার পরে বেগম খালেদা জিয়া যদি উচ্চ আদালত আপিল করেন আর হাইকোর্ট যদি বেগম খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে তাহলে তিনি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

তাদের এমন বক্তব্য নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় ওঠে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।

খালেদা জিয়া নিজেও প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গার এ বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেন। এক প্রতিমন্ত্রী বলেছে, ১৫ দিনের মধ্যে খালেদা জিয়াকে জেলে যেতে হবে। বিচারাধীন মামলার রায় ঘোষণা আদালত অবমাননা নয়কি? বিচারবিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় মাননীয় প্রধান বিচারপতি কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন, জনগণ সেইদিকে সতর্ক নজর রাখছে।

অন্যদিকে বিএনপি নেতারা জোর গলায় বলছেন, সরকার প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে এ মামলা রায় তড়িত করেছে। তারা এও বলছেন, সরকারের হস্তক্ষেপ না হলে এ মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরাও বলছেন, এ মামলায় তিনি সম্পূর্ণভাবে খালাস পাবেন। কেননা, দুদক যেসব যুক্তি ও তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেছে সেসবের কোনো ভিত্তি নেই।

এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেছেন, তারা যেসব তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন তাতে খালেদা জিয়ার সাজা হবে।

বৃহস্পতিবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেছেন, ২ বছরের অধিক সাজা হলে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে অযোগ্য হবেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সনসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বকশিবাজারের আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার ৫নং বিশেষ জজ ড. আখতারুজ্জামান এ দিন ধার্য করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এতিমের অর্থে নিজের ছেলেদের নামে ট্রাস্ট করেছেন। তার মতো একজনের কাছে এ সামান্য অর্থ আত্মসাৎ করাটা অনেক লজ্জার।

তিনি বলেন, এ মামলায় আমরা সর্বোচ্চ সাজা(যাবজ্জীবন) সাজা প্রত্যাশা করছি। তবে দুই বছরের অধিক সাজা হলেই নির্বাচনের অযোগ্য হবেন তিনি।

এদিকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, সাধারণ এ মামলা প্রথম থেকেই খারিজ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখানে রাজনৈতিক প্ররোচনা আছে। তবু আমরা আদালতের কাছে ন্যায় বিচার আশা করি।

এ মামলায় খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামীরা হলেন- তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

অন্যদিকে এই রায়ের তারিখ ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজা হলে দেশে আগুন জ্বলবে।

রিজভী বলেন, ৭৫ সালে যেভাবে গণতন্ত্রকে কবর দিয়ে বাকশাল কায়েম করা হয়েছিল, ঠিক সেইভাবে একই কায়দায় তার কন্যা দেশ পরিচালনা করছে। বর্তমানে সারা দেশে খুন গুম মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি চলছে। প্রতিদিনিই দেশে চলছে বাকশালী কায়দায়, পুলিশ বাণিজ্য করছে।

খালেদা জিয়ার এই মামলা নিয়ে বিএনপি ভীষণ উদ্বিগ্ন। কারণ দুই বছরের সাজা হলে বিএনপি নেত্রী নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হয়ে যাবেন।

এদিকে সকালে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন, এই মামলার রায় সরকার আগেই লিখে রেখেছে। আর বিচারের নামে চলছে প্রসহন।

ফখরুল বলেন, এই অবৈধ সরকার পূর্বেই রায় লিখে রেখেছেন। তবে এই বিচারের প্রহসনের কোনও প্রয়োজন ছিল না। দেশে যে আইনের শাসন নেই-ন্যায়বিচার সুদুর পরাহত সেটাই প্রমাণিত হলো। বিচার হবে প্রধানমন্ত্রী যা চাইবেন তাই।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও এই বক্তব্যের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের পর সন্ত্রাসী কার্যক্রম করলে প্রতিরোধ করবে জনগণ। বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায় নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বিএনপি। তদের নেতাকর্মীদের বক্তব্যে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।

কাদের বলেন, আদালতের বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোন হস্তক্ষেপ করে নি সরকার। আর কখনো করবেও না। যদি এই রায় নিয়ে দেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়, দেশে সন্ত্রাসের কার্যকলাপ করা হয় তাহলে জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা তা প্রতিরোধ গড়ে তুলব।

প্রসঙ্গত, মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় একটি মামলা করে দুদক।

২০১০ সালের ৫ আগস্ট তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপ-পরিচালক হারুন-অর-রশীদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।

এছাড়া, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় আরও একটি মামলা করে দুদক। এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ৩০ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন একই আদালত।

চ্যারিটেবল মামলায় ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক হারুন-অর-রশীদ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।

এ মামলায় আরো যারা আছেন- খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী (পলাতক), হারিছের তখনকার একান্ত সহকারী সচিব ও বিআইডব্লিউটিএ’র সাবেক নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। সূত্র: আমাদের সময়

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন