রবিবার, ২০ মে ২০১৮ ০৪:১৯:০৪ পিএম

আলাউদ্দিন খিলজির সহচর, কে এই মালিক কাফুর, কী হয়েছিল তার পরিণতি?

বিবিধ | সোমবার, ২৯ জানুয়ারী ২০১৮ | ০৮:৩৬:৫৭ পিএম

‘পদ্মাবত’ নিয়ে যখন তোলপাড়, যখন এই ছবির ঐতিহাসিকতা-অনৈতিহাসিকতা নিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হচ্ছে প্রশাসনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসবিদদেরও, তখন নজর কাড়লেন এক যুবক। জিম সরভ নামের এই অভিনেতা ‘পদ্মাবত’-এ এক অর্থে সহ-ভিলেন। প্রধান অ্যান্টাগনিস্ট আলাউদ্দিন খিলজির সহচর মালিক কাফুর।

৩০ বছর বয়সি জিম মুম্বাইয়ের এক পারসি পরিবারের সন্তান। সিনেমায় আসার আগে থিয়েটারে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ছিল জিমের। ২০১৬ সালে ‘নীরজা’-তে সন্ত্রাসবাদী খলিলের ভূমিকায় তার অভিনয় নজর কাড়ে দর্শক-সমালোচকের। জিম একাধিক পুরস্কার পান এই চরিত্রে অভিনয়ের কারণে।

২০১৭ সালে কঙ্কনা সেনশর্মা পরিচালিত ‘আ ডেথ ইন দ্য গঞ্জ’-এও তার অভিনয় প্রসংশিত হয়। কিন্তু এবারে সঞ্জয় লীলা ভংশালীর ছবিতে তার গুরুত্ব আলাদা। তিনি মালিক কাফুর। আলাউদ্দিনের সেনাপতি, নর্ম্যসহচর ও এক সময়ের প্রধান পরামর্শদাতা মালিক কাফুর।

স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বই থেকে খিলজি শাসনের মহাভাষ্যকার কেশরী শরণ লাল— কেউই এড়িয়ে যেতে পারেননি মালিক কাফুরকে। ১২৯৯ সালে আলাউদ্দিনের বাহিনী যখন গুজরাত অভিযান করে, তখন সেনাপতি নুসরাত খান মালিক কাফুরকে দাস বাজার থেকে কিনে আনেন এবং সুলতানকে উপহার দেন।

মনে রাখা প্রয়োজন, মালিক কাফুর ছিলেন খোজা। তাকে প্রথমে হারেমরক্ষী হিসেবে নিযোগ করা হয় বলে জানায় সেকালের অনেক রচনা। কিন্তু ভারতীয় ক্রীতদাস প্রথায় দাস ব্যক্তিটি স্বীয় প্রতিভায় উঠে আসতে পারতেন ক্ষমতার শীর্ষে। সেই প্রতিভা মালিক কাফুরের ছিল। মোঙ্গোল আক্রমণের কালে রণক্ষেত্রে তিনি অসামান্য বিক্রমের পরিচয় রাখেন।

সাম্রাজ্য বিস্তারকারী আলাউদ্দিনের ডান হাত হয়ে দাঁড়ান মালিক দাক্ষিণাত্য বিজয়ের কালে। বিন্ধ্যপর্বতের দক্ষিণে ইসলামের পতাকা তিনিই বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে জানান ইতিহাসবিদরা। যাদব, কাকতীয়, হোয়সল, পাণ্ড্য বংশীয় রাজাদের তিনি সুলতানির কবজায় আনেন। সেই সঙ্গে নিজে কবজা করেন বিপুল পরিমাণ ধনরত্ন।

আলাউদ্দিনের আস্থাভাজন হয়ে উঠতে দেরি হয়নি মালিক কাফুরের। ক্রমেই সুলতানির বিবিধ ক্রিয়ায় তিনি অপরিহার্য হয়ে উঠতে শুরু করেন। এক সময়ে তিনিই হয়ে দাঁড়ান আলাউদ্দিনের প্রধান পরামর্শদাতা। ১৩১৩ থেকে ১৩১৫ পর্যন্ত তিনি দেবগিরির শাসনকর্তাও ছিলেন। আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পরে তিনি স্বয়ং মসনদ দখলের চেষ্টা করেন।

আলাউদ্দিনের নাবালক পুত্র শিহাবউদ্দিন ওমরকে হাতের পুতুল বানিয়ে মাসখানেক শাসনও করেন দিল্লির দরবার। কিন্তু আলাউদ্দিনের বক্তিগত রক্ষীরা তার এই উত্থানকে বিষনজরে দেখছিলেন। তারা সুযোগ বুঝে মালিক কাফুরকে হত্যা করেন। ক্ষমতায় আসেন আলাউদ্দিনের জ্যেষ্ঠ পুত্র মুবারক শাহ।

মালিক কাফুরের পরিচয় এখানেই শেষ নয়। আলাউদ্দিনের সঙ্গে তার সম্পর্কের চরিত্র নিয়ে বিস্তর জল ঘোলা হয়েছে। এখানে বলা ভাল, খোজারা এক আশ্চর্য ভূমিকা পালন করতেন সুলতানি ভারতে। তারা নির্বীর্য ছিলেন বটে, কিন্তু শারীরিক-অক্ষম ছিলেন না। হারেমরক্ষী হিসেবে তারা এই কারণেই ‘বিশ্বস্ত’ ছিলেন যে, তাদের ‘ঔরসে’ বেগমদের গর্ভাধান সম্ভব ছিল না।

শেখ নেফাজি বিরচিত আরব কামসূত্র ‘দ্য পারফিউমড গার্ডেন’-সহ বহু সাহিত্যেই উল্লিখিত রয়েছে খোজাদের সঙ্গে হারেমবাসিনীদের উদ্দাম যৌ..র কথা। ‘আরব্য রজনী’-র কাহিনিও এ বিষয়ে বিপুল ইঙ্গিত রাখে। এর সঙ্গে সঙ্গে খোজারা সমকামী যৌ..তেও সাবলীল হতেন। হারেমের বহু বিচিত্র ...লীলায় তারা সুলতানের বিচিত্র কামনা চরিতার্থও করতেন। সে দিক থেকে দেখলে, তারা ছিলেন উভগামী— বাইসেক্সুয়াল।

আলাউদ্দিনের সঙ্গে মালিক কাফুরের সম্পর্কের মাত্রাটি যে কেবল প্রভু-ভৃত্যের ছিল না, সেই ইঙ্গিত রেখেছিলেন সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘শঙ্খ কঙ্কন’ নামের ঐতিহাসিক আখ্যানে। সেখানে আলাউদ্দিনকে তিনি প্রায় নরপশু হিসেবে চিত্রিত করেন। আর সেখানে মালিককে তিনি দেখান প্রভুর যাবতীয় কুকর্মের সহচর হিসেবে।

ইতিহাসবিদরা কিন্তু অনেকেই মালিকের শৌর্য্যের প্রশংসা করেছেন। মালিক না থাকলে দাক্ষিণাত্য দিল্লির পতাকাতলে আসত না, এমন কথা প্রায় সকলেই একবাক্যে বলেছেন। কিন্তু ভারতের ইতিহাসের সেই ছায়াময় দিনগুলোয় তার উপস্থিতি আজও আলোকপাতের অবকাশ রাখে।

তবে, ‘পদ্মাবত’-এ মালিক কাফুর গাঢ় রংয়েই চিত্রিত। প্রভু আলাউদ্দিনের গূঢ়কর্মের সহচর হিসেবেই তার উপস্থিতি। জিম সেই কাজে এতটাই দক্ষতা দেখিয়েছেন যে, দর্শক থেকে ক্রিটিকের চোখ রণবীর, দীপিকা, শাহিদের পাশাপাশি এই মুহূর্তে তারও দিকে।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন