রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৮:৫৭:৩০ এএম

নানামুখী পদক্ষেপের পরও কেন ঠেকানো গেলো না প্রশ্নপত্র ফাঁস?

জাতীয় | বৃহস্পতিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৭:৫৭:০৩ পিএম

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে পরীক্ষা শুরুর সাত দিন আগে থেকেই কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার নির্দেশসহ নানামুখী পদক্ষেপ নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়া পরীক্ষা শুরুর ত্রিশ মিনিট আগেই পরীক্ষাকেন্দ্রে পরীক্ষার্থীর আসনে বসা বাধ্যতামূলক করা, কেন্দ্র সচিব ছাড়া পরীক্ষাকেন্দ্রে কেউ মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না বলেও নির্দেশনা জারি করা হয়। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমন সব কঠোর অবস্থান নিলেও ঠেকানো যায়নি প্রশ্নপত্র ফাঁস। পরীক্ষা শুরুর একঘণ্টা আগেই ফেসবুকে চলে আসে বাংলা ১ম পত্রের বহু নির্বাচনি অভীক্ষার প্রশ্নপত্র।

মুহূর্তের ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজে। আর এত কিছুর পরও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব না হওয়ায় সমালোচনা করছেন অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিদরাও। এদিকে ফেসবুকে প্রশ্ন পাওয়া গেলেই ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানোর কথা বলা হলেও সংস্থাটি এমন কোনও নির্দেশনা পায়নি বলে দাবি করে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের সমালোচনা করেছেন শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি খুব হতাশ। এভাবে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে কেন? শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাহলে কী ব্যবস্থা নিলেন তিনি? এছাড়া মন্ত্রী বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেই পরীক্ষা বাতিল। তাহলে তো পরীক্ষা এখন বাতিল হবে। আর বাতিল হলে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর কী হবে? তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন আমরা ছিনিমিনি খেলছি? এর চূড়ান্ত ব্যবস্থা সরকারকেই নিতে হবে।’

মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে এই শিক্ষক বলেন, ‘আমি তাদের কাছে দাবি করবো, দ্রুত পুলিশ প্রশাসন, গোয়েন্দাদের মাধ্যমে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। যে কমিটিকে এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে সব ধরনের স্বাধীনতা দেওয়া হবে। যারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত, সবার সামনে তাদের মুখোশ খুলে দেওয়া হোক।’ এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের লোকজন জড়িত বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘৩০ মিনিট আগে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশ করিয়ে কেন তাদের কষ্ট দিতে হবে? তাদের কী দোষ? তারা কি প্রশ্নফাঁস করে? এছাড়া তাদের ৩০ মিনিট আগে প্রবেশ করিয়েও তো কোনও লাভ হলো না। তাহলে কেন শুধু শুধু কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কষ্ট দিতে হবে? যানজটের শহরে ওই শিশুদের কষ্ট না দেওয়ার আহ্বান জানাবো। বরং তারা যদি দশটা ১৫ মিনিটে গিয়েও পরীক্ষার কেন্দ্রে প্রবেশ করে তাও তাদের অধিকার আছে পরীক্ষায় বসার।’

প্রশ্নফাঁসের সমালোচনা করেছেন শিক্ষাবিদ ও শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় যতটা গর্জেছে ততটা বর্ষেনি। তারা যতই বলুক, কঠোর অবস্থানে গেছে। কিন্তু আদৌ তা হয়নি। এটা তাদের লোক দেখানো। যদি আদৌ কঠোর অবস্থানে মন্ত্রণালয় দাঁড়াতো, তাহলে এই প্রশ্নপত্র ফেসবুকে কিভাবে এলো? কোনও ভূত-প্রেত তো প্রশ্নফাঁস করেনি। মানুষই তো করেছে।’ তিনি বলেন, ‘এই প্রশ্নপত্র ফাঁস করে কারা? যারা প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া করে, কেবল তারাই প্রশ্নফাঁস করে। কোনও শিক্ষার্থীর কি ক্ষমতা আছে প্রশ্নফাঁস করার? নেই। সুতরাং বুঝতে হবে, এর সঙ্গে জড়িত একটি দুষ্টচক্রই প্রশ্নফাঁস করেছে। মন্ত্রণালয় যদি এতই সতর্ক থাকলো, তাহলে এই চক্রকে আগেই ধরে ফেলতে পারতো। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পর তাদের ধরে তো তেমন কোনও লাভ হবে না। যাদের উদ্দেশ্য দেশকে বিতর্কিত করা, তারা তা তো করেই ফেলেছে। দেশকে রসাতলে নিতে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে একযোগে অবস্থান নিতে হবে। তাদের যতদ্রুত সম্ভব ধরে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’

প্রশ্নপত্র ফাঁসের সমালোচনা করেছেন অভিভাবক সাঈদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা শুরুর আগেই ফেসবুকে প্রশ্নপত্র পাওয়া গেলো। আমরা তো এটা চাইনি। সরকার যতই বলেছে চারিদিকে নজর রেখেছে, কোচিং সেন্টার বন্ধ রেখেছে। কিন্তু প্রশ্নফাঁস তো রোধ করতে পারেনি। প্রশ্ন যারা নিয়মিত ফাঁস করে, তারা এবারও ফাঁস করেছে। সারা দেশে একই প্রশ্নে পরীক্ষা হওয়ায় ওইসব লোকের আরও সুবিধা হয়েছে। ফেসবুকে যেহেতু প্রশ্ন এসেছে, তখন উচিত ছিল, বিটিআরসিকে দিয়ে ওইসব লিংক বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু কই এসবের কিছুই তো হইনি। আমি মনে করি, শিক্ষকরাই এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। কারণ, শিক্ষকদের হাতে প্রশ্নপত্র পৌঁছানোর পরেই ফেসবুকে প্রশ্ন চলে আসে। এছাড়া এবার তো সারাদেশে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হচ্ছে। সুতরাং প্রশ্নপত্র ফাঁস করা খুবই সহজ হয়েছে।’

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তাহমিনা খান বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনেক কঠোর হয়েছে বলে ঘোষণা করেছে। কোচিং সেন্টার বন্ধ করলো, ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্রে প্রবেশ করলো। কিন্তু এত কড়াকড়িও তেমন কোনও কাজে এলো না। মূলত যারা প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত, তারা অনেক সক্রিয়। তারা বিভিন্নভাবে প্রশ্নফাঁস করে। এটাই তাদের উদ্দেশ্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘মূলত মনিটরিংটা ভালোভাবে হওয়া দরকার। সরকার সক্রিয় হলেই তো চলবে না। সরকারের সঙ্গে সঙ্গে এই পরীক্ষা নিতে যারা সরাসরি যুক্ত তাদেরও দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে হবে।’

এর আগে সকাল দশটায় পরীক্ষা শুরু হলেও পরীক্ষা শুরুর অন্তত ১ ঘণ্টা আগেই প্রশ্নপত্র পাওয়া যায় ফেসবুকে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ সময় রাজধানীর ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রশ্নফাঁস রোধে বিভিন্ন কৌশল নিয়েছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলা আছে। এছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেই পরীক্ষা বাতিল করা হবে।’

এরপর সকাল ১১ টার দিকে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে পাওয়া প্রশ্নপত্র নিয়ে সাংবাদিকরা শিক্ষামন্ত্রীকে দেখান। শিক্ষামন্ত্রী ওই প্রশ্নের সঙ্গে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নের মিল আছে কিনা, তা মিলিয়ে দেখেছেন বলে দাবি করে। সাংবাদিকদের দেওয়া দ্বিতীয় বারের বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে ছড়ানো প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নের মিল নেই। আমি মিলিয়ে দেখেছি। বিষয়টি মিথ্যা ও গুজব। তবে যে ব্যক্তি এই প্রশ্নটি পোস্ট করেছেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি। তারা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে।’

যদিও বিটিআরসির সচিব মো. সরওয়ার আলম বলেন, ‘ফেসবুকের কোনও পোস্টে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছে কিনা বা ওই পোস্টের বিরুদ্ধে কোনও ব্যসস্থা নেওয়া হবে কিনা, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনও নির্দেশনা পাইনি।’

এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার বলেন, ‘আমি প্রশ্নপত্র ফাঁস বিষয়ে কোনও নিউজ পাইনি।’

তথ্যসূত্র-বাংলা ট্রিবিউন

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন