বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮ ০৯:০৩:০৮ পিএম

অন্তঃসত্ত্বা লিজা হত্যা : সন্দেহের তীর ক্লিনিকের মালিককে ঘিরে

জাতীয় | মঙ্গলবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৪:২১:০২ এএম

ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন আরাফাত-লিজা দম্পতি। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করতেন। দেড় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন লিজা। আশায় ছিলেন ঘর আলো করে আসবে প্রথম সন্তান। বেশ ভালোই কাটছিল সংসার। ছুটির দিনে ঘুরতে যেতেন। কাজ শেষে একসঙ্গে বাসায় ফিরতেন। বাসায় যাওয়ার পথেই স্বামীকে অফিসের সব খবর বলতেন।

কথা ছিল শনিবার স্বামীকে ভালো কিছু রান্না করে খাওয়াবেন। কিন্তু সব আশা এখন মিইয়ে গেছে। নিজ কর্মস্থল হায়দার ডেন্টাল ক্লিনিকেই লিজাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। স্ত্রীর শোকে এখন অনেকটা পাথর হয়ে গেছেন স্বামী আরাফাত। স্বামীর দাবি লিজাকে কুপ্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। আর সে প্রস্তাবে রাজি না হওয়াতেই তাকে নির্মমভাবে খুন হতে হলো। আরাফাতের সন্দেহ, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ক্লিনিকের মালিক নজরুল ইসালম ভুট্টোর হাত রয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন লিজার স্বামী আরাফাত।

শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মধ্য বাড্ডার পোস্ট অফিস গলির হায়দার ক্লিনিকের রিসিপশনিস্ট লিজাকে ওই ক্লিনিকেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার সময় হাসপাতালে লিজা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি শুক্রবার জুমার নামাজ থাকায় ক্লিনিকে কেউ ছিল না। আর এই সুযোগেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। ঘটনার সময় ক্লিনিকের সবকটি সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। তাই কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে ঘটনার পর পরই ক্লিনিকের মালিক নজরুল ইসলাম ওরফে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লিজার পিঠে ১০টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এছাড়া শরীরের অন্যস্থানে আরো তিনটি আঘাত করা হয়েছে। ঘাতকের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে পেছন থেকে আঘাত করা হয়। প্রচুর রক্তক্ষরণে তিনি মারা গেছেন।

সরজমিন হায়দায় ডেন্টাল ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, মধ্য বাড্ডার হাজী রোস্তম আলী মার্কেটের ছয়তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ক্লিনিকের অবস্থান। এখনো ওই ক্লিনিকের প্রবেশ পথে রক্তের দাগ লেগে আছে। ভেতরে আসবাবপত্র এলোমেলো। পুলিশের পক্ষ থেকে হাসপাতালটি আপাতত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার উপ-পরিদর্শক মারুফুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের জন্য কাজ করছেন।

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই ক্লিনিকের সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। কর্তৃপক্ষের দাবি সবকটি ক্যামেরা আগে থেকে নষ্ট ছিল। তাই কে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি আশপাশের ভবনেও সুবিধাজনক ফুটেজ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ক্লিনিকের মালিকই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এজন্য তাকে গ্রেপ্তার করে গতকাল আদালতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।

মারুফুল ইসলাম আরো বলেন, লিজার মোবাইল ট্র্যাকিং করে অন্য কারো সঙ্গে কথা বলার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি শুধু তার স্বামীর সঙ্গেই কথা বলেছিলেন। শুক্রবার ছুটির দিনে কোনো কু-মতলবেই লিজাকে ক্লিনিকে ডেকে আনা হয়েছে বলেও ধারণা করছেন এই তদন্ত কর্মকর্তা।

ময়নাতদন্ত শেষে লিজার মরদেহ বরগুনার তালতলা উপজেলার পচাকোরালিয়া গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়েছে। লিজার মৃত্যুতে তার নিজের বাড়ি ও শ্বশুরবাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গতকাল বিকালে লিজার স্বামী আরাফাত বলেন, আমি প্রতিদিনই দুপুর ২টার দিকে তার সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু সেদিন ১২টার দিকে অফিসের কাজে আশুলিয়া যাওয়ার সময় বারবার তার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে করছিল। দুপুর ১২ টা ৭ মিনিটে তাকে ফোন করে কি করো, আর কেউ আছে, লাঞ্চ করেছো কিনা জিজ্ঞাসা করি।

তখন সে বলে বসে আছে, আর কেউ নাই এবং এখনো খায়নি। এই বলে ফোন রেখে দেয়ার সময় বলে কাল আমার ডে-অফ যদি ভালো কিছু খেতে চাও তবে বাজার করে নিয়ে এসো। আরাফাত বলেন, লিজার সঙ্গে এই ছিল আমার শেষ কথা। তারপর আমি কাজ শেষে আশুলিয়া থেকে ফিরছিলাম। আসার পথে হঠাৎ করে আমার মোবাইলে ফোন দেন ওই ক্লিনিকের মালিক।

তিনি আমাকে বলেন, আপনি কোথায় আছেন? যেখানে থাকেন না কেন তাড়াতাড়ি ক্লিনিকে চলে আসেন। এখানে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই বলে তিনি লাইন কেটে দেন। পরে আমি লিজার মোবাইলে কল দিলে বন্ধ পাই। তারপর আমি আবার ক্লিনিকের মালিকের মোবাইলে ফোন দেই। তখন তিনি আমাকে বলেন, লিজাকে হত্যা করা হয়েছে। আমার তখন আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ে। এতদূর থেকে কিভাবে আসবো। পরে আমি আমার বাবাকে ফোন দিয়ে ঘটনার কথা বলি। সঙ্গে সঙ্গে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন লিজাকে হত্যা করা হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর আমি সেখানে পৌঁছাই।

আরাফাত বলেন, ৭ হাজার টাকা বেতনে চার মাস আগে অভ্যর্থনাকর্মী হিসেবে কাজে যোগদান করে লিজা। যোগদানের কিছুদিন পর পরই ক্লিনিকের মালিক লিজাকে বলেন টাকা পয়সা বা অন্যকিছু লাগলে তাকে বলার জন্য। উত্তরে লিজা বলেছিল আমার স্বামী চাকরি করেন। কিছু লাগলে আমাকে তিনিই দেন। এর কিছুদিন পর তিনি আবার বলেছিলেন বাইকে নিয়ে লিজাকে ঘুরার জন্য। তখনও লিজা বলেছিল, আমার স্বামী আমাকে সপ্তাহে একদিন ঘুরতে নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, আমার তখনই খারাপ কিছু সন্দেহ হয়েছিল। কারণ লিজা আমাকে সব কথা বলতো। অফিসে কতজন রোগী বা কি দিয়ে নাশতা করলো সবকিছু বলতো। ওই কথাগুলোও সে আমাকে বলেছিল। তাই কু-প্রস্তাব মেনে না নেয়ার জন্যই তাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি ঘটনার সময় তাদের ক্লিনিকের ৮টি সিসি ক্যামেরা নষ্ট ছিল। লিজা আমাকে বলেছিল, সিসি ক্যামেরার সংযোগ মালিকের নিজের মোবাইলে ও পিসিতে ছিল। তাই ওই সময় কেন সবগুলো ক্যামেরা নষ্ট ছিল। এছাড়া সে ক্লিনিকের অন্য অফিসে কাজ করতো। সেদিন কেন তাকে এখানে ডেকে আনা হলো। রাস্তার পাশে একা ক্লিনিকে কোনো অফিস সহকারীও ছিল না।

লিজা হত্যার পর তার স্বামী আরাফাত রহমান বাড্ডা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশের পাশাপাশি মামলাটি নিয়ে কাজ করছেন গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা। বাড্ডা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা সিসি ক্যামেরার ডিভাইস নিয়ে চিন্তা করছি। যদিও বলা হচ্ছে সেটি আগে থেকে নষ্ট ছিল। আগে থেকে নষ্ট ছিল না ইচ্ছে করে করা হয়েছে তাও আমরা খতিয়ে দেখছি। ক্লিনিকের মালিককে প্রথম সন্দেহের তালিকায় রেখে গ্রেপ্তার করেছি। এছাড়া এই ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত কিনা এবং কি কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে সে বিষয়টি নিয়েও আমরা কাজ করছি।

এদিকে লিজা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে ক্লিনিকের মালিক নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের পর থেকে তার নিজ মালিকানাধীন আবাসিক ভবনের ভাড়াটিয়ারা বাড্ডা থানার সামনে এসে ভিড় করছেন। তারা মানতে নারাজ নজরুলের মতো একজন ভালো মানুষ এমন কাজ করতে পারে। সুফিয়া বেগম নামের এক ভাড়াটিয়া বলেন, আমার পাঁচ সন্তানের জন্ম নজরুলের বাড়িতেই হয়েছে। ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে তাকে চিনি। কিন্তু কখনই তাকে খারাপ মনে হয়নি।

সফিনা আক্তার নামের আরেক ভাড়াটিয়া বলেন, যে মানুষ ভাড়াটিয়াদের ৩-৪ মাসের ভাড়া মাফ করে দেন। ভাড়াটিয়ার বাজার না থাকলে বাজার করে দেন। এই মানুষ এই কাজ করতে পারে না। তাকে গ্রেপ্তারের পর থেকে সব ভাড়াটিয়ারা থানার সামনেই আছি। এমন মানুষের জন্য যদি কিছু করতে না পারি তবে আর কার জন্য করবো? এমজমিন

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন