সোমবার, ২১ মে ২০১৮ ০৭:২৪:১৭ এএম

খালেদার মতোই বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার থেকে কারাগারে আম্মাজান

আন্তর্জাতিক | শুক্রবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০২:৫০:৪৯ এএম

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে। এই রায়ে এখন দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাগারে। খালেদার জেলে যাওয়ার সাথে সাথে আলোচনায় উঠে আসছে উপমহাদেশের আরও এক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ জয়ললিতার। তিনিও দুর্নীতির দায়ে জেল খেটেছেন।

রাজনীতিতে আসার আগে সিনেমার নায়িকা ছিলেন। আশির দশকে ভারতের রাজনীতিতে পা রাখেন জয়ললিতা। পরে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষ তাকে ডাকত ‘আম্মা’। ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ জয়ললিতা ডুবেছিলেন বিলাসিতা আর দুর্নীতির কারণে।

দুর্নীতির কারণে গ্রেফতার হয়েছেন, জেল খেটেছেন। আবার ফিরে এসে নির্বাচনে নেমে বাজিমাতও করেছেন। তার গোটা রাজনৈতিক জীবনই ছিল আলোচনা আর সমালোচনার। চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক জয়ললিতার রাজনৈতিক জীবন:

ভারতের রাজনীতিতে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন জয়ললিতা। তাকে ডাকা হতো ‘পুরাতচি থালাইভি’। মানে ‘বিপ্লবী নেত্রী’। তামিলনাড়ুবাসীর কাছে তিনি ছিলেন দেবীতুল্য। গোটা ভারতের রাজনীতিতে অন্যতম শক্তিশালী নারী হিসেবেও পরিচিত জয়ললিতা। জয়ললিতার দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগাম। গত দুই দশক ধরে কেন্দ্রে সরকার গঠনে নির্ণায়ক হিসেবে কাজ করেছেন জয়ললিতা।

গত শতকের আশির দশকে রাজনীতিতে পা রাখার পর নানা উত্থান-পতন আর আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে চলছিলেন তিনি। কিন্তু রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, তার যাত্রা শুরু হয়েছিল সিনেমার রুপালি পর্দায়। তারপর এক সময় তামিলনাড়ুর মসনদে বসেছিলেন জয়ললিতা। তার পুরো নাম জয়ললিতা জয়রাম। জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। মহীশূরের (বর্তমানে কর্ণাটক) মাণ্ড্য জেলার পাণ্ডবপুরা তালুকের মেলুকোটেতে এক তামিল আয়েঙ্গার ব্রাহ্মণ পরিবারে।

তার পিতার নাম জয়রাম ও মায়ের নাম বেদবল্লী। জীবনের প্রথম ১০ বছর জয়ললিতা কর্ণাটকেই কাটিয়েছেন মাকে ছাড়া। ব্রাহ্মণ প্রথা মেনে দুটি নাম দেওয়া হয় তার। একটি পারিবারিক প্রথা মেনে ঠাকুমার নাম ও সঙ্গে আর একটি নিজের নাম। এক বছর বয়সে জয়ললিতা বলে নামকরণ হয় জয়ার। এই নামকরণের পেছনেও অদ্ভুত কাহিনী রয়েছে।

মহীশূরে দুটি বাড়ি ছিল জয়ললিতার পরিবারের। একটি বাড়ির নাম ‘জয়া নিবাস’, অন্যটি ‘ললিতা নিবাস’। দুটি মিলিয়ে নাম রাখা হয় জয়ললিতা। জয়ার জন্মের দুই বছর পরই বাবা জয়রাম মারা যান। এরপরই সংসার চালাতে কাজে নামতে হয় জয়ার মা বেদবল্লীকে। যে আয় হতো তাতে সংসার চালানো কঠিন ছিল। তাই পথ ধরেন মাদ্রাজের। কিন্তু জয়া থেকে যান মহীশূরে।

১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি কর্ণাটকেই দাদা-দাদির কাছে ছিলেন। পরে অবশ্য জয়া চেন্নাইয়ে চলে আসেন। এখানে মায়ের সঙ্গে থাকতেন তিনি। স্কুলের পড়াশোনা চলে এখানে। স্কুলে ভালো শিক্ষার্থী হিসেবে প্রশংসা পেতেন সবার। দশম শ্রেণির পরীক্ষায় জয়ললিতা গোটা তামিলনাড়ুতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এ জন্য পান ‘গোল্ড টেস্ট পুরস্কার’ও। চেন্নাইয়ে যে স্কুলে তিনি পড়তেন তার নাম চার্চ পার্ক কনভেন্ট।

এ ছাড়া তিনি পড়াশোনার জন্য সরকারি বৃত্তিও পেয়েছিলেন। অনেকটা মায়ের প্রেরণাতেই রুপালি পর্দার জগতে চলে আসেন জয়ললিতা। ১৯৬১ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সময় মোট ১৪০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন জয়ললিতা। বলা বাহুল্য, তামিল সিনেমার অন্যতম কিংবদন্তি অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। তামিল ছাড়াও তেলেগু, কন্নড় সিনেমায় তার ছিল আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা।

অভিনেত্রী হিসেবে তো বটেই, নৃত্যশিল্পী হিসেবেও সুনাম কুড়িয়েছিলেন তিনি। তামিল সিনেমার ‘কুইন’ বলে দর্শক ও চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে সমাদৃত ছিলেন। সত্যি বলতে তামিল সিনেমার রানী হয়ে ওঠেন তিনি। সত্তর ও আশির দশকে দক্ষিণী সিনেমায় সবচেয়ে সফল অভিনেত্রী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। সে সময় তিনি যা পারিশ্রমিক পেতেন তা অনেকে কল্পনাও করতে পারতেন না।

সিনেমার নায়িকাদের স্ক্যান্ডাল নতুন কিছু নয়। তেমনিভাবে জয়ার সঙ্গে অভিনেতা ও রাজনীতিক রামচন্দ্রণের (এমজিআর) প্রেমের গুজব বাতাসে ভেসে চলে। তবে জয়া বরাবরই এটা অস্বীকার করেছেন। এমজিআর ও জয়ার জুটিতে বহু হিট সিনেমা তামিলানাড়ু কাঁপিয়েছিল। সিনেমার পর্দায় জনপ্রিয় নায়িকা অবশেষে রাজনীতিতে আসেন ১৯৮২ সালের দিকে। বলা হয়, তার রাজনীতির হাতেখড়ি অভিনেতা ও রাজনীতিক এমজিআরের হাত ধরেই।

অভিনেতা-রাজনীতিক এমজি রামচন্দ্রণের ঘনিষ্ঠ ছিলেন জয়ললিতা। জয়াকে দলের হয়ে রাজ্যসভায় পাঠান এমজিআর। ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভায় সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ করেন জয়া। এমজিআর অসুস্থ হওয়ার পরে জয়ললিতা দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন। এই সময়ই দলে ভাঙন ধরে। অর্ধেক লোক চলে যান এমজিআরের স্ত্রী জানকী রামচন্দ্রণের দিকে। আর বাকি সমর্থকরা জয়ার পক্ষে দাঁড়ান।

জানকী রামচন্দ্রণ ১৯৮৮ সালে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৮৯ সালে একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা জয়ললিতাকে মুখ্যমন্ত্রী হতে অনমনীয় করে তোলে বলে স্বীকার করেন বিশ্লেষকরা। ওই বছরের ২৫ মার্চ বিধানসভায় ক্ষমতাসীন ডিএমকে এবং বিরোধী এআইডিএমকের সদস্যদের মধ্যে তুমুল হট্টগোল হয়। তখন হেনস্তার স্বীকার হন বিরোধীদলীয় নেতা জয়ললিতা।

ছেঁড়া শাড়ি, উসুখুসু চুল আর রক্তাক্ত মুখ নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে এসে তিনি তখন বলেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে না আসতে পারলে তিনি আর বিধানসভায়ই ঢুকবেন না। তার দুই বছরের মধ্যে প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন জয়ললিতা। ১৯৮৯ সালে ডিএমকে নেতা মুখুমানোকরণকে হারিয়ে প্রথমবার জেতেন। এরপর মোট সাতবার নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন জয়া। একবার বাদে প্রতিবার বিপুল ভোটে জিতেছেন।

১৯৯১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন জয়া। তিনি ছিলেন তামিলনাড়ুর দ্বিতীয় নারী মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৯১ সালেই মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি সম্মাননাসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ভারতের রাজনীতিতে অগ্রগণ্য হয়ে ওঠেন জয়ললিতা। তামিলনাড়ুর সবচেয়ে কনিষ্ঠ, মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জয়ললিতা ১৯৯১-৯৬ তার মেয়াদ পূর্ণ করেন।

অবশ্য এই মেয়াদে প্রথমবারের মতো দুর্নীতির অভিযোগে সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হন তিনি। রঙিন টিভি দুর্নীতির অভিযোগে ১৯৯৬ সালের বিধানসভা ভোটে হেরে যান। বিধানসভা নির্বাচনে হার জয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এটাই প্রথম এবং ওটাই শেষ পরাজয়। কিন্তু রঙিন টিভি দুর্নীতির অভিযোগে পরে গ্রেফতার হন ও জেলে যেতে হয় তাকে। যদিও এই মামলায় পরে তিনি বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। সে বছর পালিত পুত্র সুধাগরনের বিয়েতে দেড় লাখ লোক আমন্ত্রিত করে গিনেস বুকে নাম তোলেন জয়া।

এ নিয়েও তুলকালাম কাণ্ড ঘটে। এরপরও ২০০১, ২০০৩, ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী পদে জিতেছেন জয়া। ২০১৪ সালে দুর্নীতির দায়ে চার বছরের কারাদণ্ড হয় জয়ললিতার। হারান মুখ্যমন্ত্রীর পদও। এক মাস পর সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পান। এরপর ২০১৫ সালে কারাদণ্ড মওকুফ করেন কর্ণাটক হাই কোর্ট। আদালতের নির্দেশে একই দিনে পুনরায় মুখ্যমন্ত্রিত্বে ফেরেন তিনি। ২০১৬ সালে ষষ্ঠবারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন তামিল জনগণের ‘আম্মাজান’।

তার বিলাসী জীবন নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। তার ১০০ জোড়া জুতা, ৫০০টি শাড়ি, ১২৫০ কেজি রুপার হিসাবও এসেছে মিডিয়ায়। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে ওঠে দরিদ্র মানুষের প্রতি তার গভীর মমতা। যে কারণে তামিলনাড়ুরবাসীর কাছে তিনি ছিলেন আশ্রয়দাত্রী, মমতাময়ী। তাকে ‘আম্মাজান’ বলেই ডাকতেন তারা। তামিলনাড়ুতে উন্নয়নমূলক নানা প্রকল্প তার আমলেই চালু হয়েছে। তিন দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে উত্থান-পতন অব্যাহত থাকলেও কখনো মানুষের ভালোবাসা খোয়াননি জয়ললিতা। ভারতের প্রভাবশালী এই রাজনীতিবিদ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

বিলাসিতা দুর্নীতি তারপর কারাবাস : ভারতের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ জয়ললিতা বরাবরই সমালোচিত ছিলেন বিলাসিতা আর দুর্নীতির কারণে। ঘুষ গ্রহণ বা অবৈধ উপার্জনের অভিযোগ তার গোটা রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে ডুবিয়েছিল। সঙ্গতিহীন আয় মামলায় জড়িয়ে গ্রেফতার হন। জেলে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। সঙ্গতিহীন আয় মামলায় মোট দুইবার আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হন জয়ললিতা।

২০১৪ সালে দুর্নীতির কারণে বিশেষ আদালত জয়ললিতাকে দোষী সাব্যস্ত করে চার বছরের জেল এবং ১০০ কোটি টাকা জরিমানার আদেশ দেয়। গ্রেফতার হন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে জেলে যেতে হয়। বিজেপি নেতা সুব্রামনিয়াম স্বামীর করা ওই মামলায় বিচার পর্বে ছিলেন সাতজন বিচারক। বিভিন্ন কারণে শুনানি মুলতবি রাখতে হয় ১৩০ বার। জয়ললিতা যে বিপুল সম্পত্তি করেছিলেন, তার মধ্যে আছে দুই-তিনটি প্রাসাদোপম বাড়ি আর কয়েক কোটি টাকার অলঙ্কার।

এ ছাড়াও আছে ৩০ কেজি সোনার তৈরি ৪০০ জোড়া হাতের বালাসমেত অন্যান্য অলঙ্কার। দেড় কেজি হীরা বসানো কোমরবন্ধনী, ৫০০ কেজি রুপা, ১০ হাজার শাড়ি, সাড়ে সাতশ জোড়া জুতা এবং শখানেক হাতঘড়িও আছে জয়ললিতার সম্পত্তির তালিকায়। তাকে গ্রেফতার করার পর মিডিয়া তার কারাজীবন নিয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত জয়ললিতা

প্রথম দুই দিনের কারাবাসে সারা রাত ঘুমাতে পারেননি, রাতে কিছু মুখে তোলেননি। পরের দিন বিকালে কিছুটা পায়চারি করেন। সেই রাতে খেয়েছেন রুটি, দুধ আর আপেল। দুর্নীতির মাধ্যমে টাকার পাহাড় গড়ে তুললেও তার কারাজীবন ছিল অন্যরকম। তার কারাবাস সশ্রম না থাকলেও ধূপকাঠি রোল করা, তরকারি কোটা, কাপড় সেলাই করার মতো কাজ করতে হয়েছে জয়ললিতাকে।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন