শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮ ০৮:০১:৩৫ পিএম

যেভাবে গুলশান থেকে পুরান ঢাকার কারাগারে খালেদা জিয়া

রাজনীতি | শুক্রবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৩:০৮:৩৪ এএম

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ছিল গতকাল। সময় তখন সকাল সাড়ে ৭টা। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ‘ফিরোজা’ বাসভবনের সামনে তখন বিপুলসংখ্যক পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই মামলার প্রধান আসামি বেগম জিয়া।

গুলশান-২ এর গোলচত্বরে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমের কর্মীরাও ভিড় জমান গুলশান এলাকায়। তবে গোলচত্বরেই থামিয়ে দেওয়া হয় গণমাধ্যমের কর্মীদের। সকাল ১০টার দিকে বেগম জিয়ার আদালতে যাওয়ার কথা ছিল।

৭টা থেকেই প্রস্তুত হচ্ছিল বিএনপিপ্রধানের গাড়িবহর। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে ‘ফিরোজায়’ আসেন বেগম জিয়ার বড় বোন সেলিনা হোসেন ও তার সন্তান, ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তার স্ত্রী ও সন্তান এবং বড় ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তান। ছুটে আসেন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর শ্বশুরবাড়ির স্বজনরা।

ফিরোজা ভবন থেকে একজন জানান, এ সময় বাসায় কান্নার রোল পড়ে। বেগম জিয়াকে জড়িয়ে তারা কান্নাকাটি করেন। চোখ দিয়ে পানি গড়ালেও শক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন বিএনপিপ্রধান। তিনি স্বজনদের অভয় দিয়ে বলেন, ‘ধৈর্য ধারণ কর তোমরা। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ। আমি ফিরে আসবই ইনশা আল্লাহ।’

এর মধ্যে কেউ কেউ হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। বিএনপিপ্রধানের সকাল ১০টায় বেরুনোর কথা জানিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু তখনো প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক এ সময় ফিরোজায় প্রবেশ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, খালেদা জিয়ার আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার নওশাদ জমির ও কায়সার কামাল।

বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং সদস্য শায়রুল কবীর খানকেও বাসভবনে প্রবেশ করতে দেখা যায়। বিএনপি নেতা ও আইনজীবীরা বেগম জিয়ার সঙ্গে আইনি বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সময় গড়াতে থাকে। কিন্তু বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন না বেগম জিয়া। গুঞ্জন ছড়ায় বেগম জিয়া আদালতে যাবেন না।

তবে সব ভুল প্রমাণিত হয় পৌনে ১২টার দিকে। নিজ বাসভবনের ভিতর থেকে সাদা পাজেরো গাড়িতে চড়ে বসেন বিএনপিপ্রধান। সামনের সিটে দেখা যায় ব্যক্তিগত সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসকে। বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান ও আইনজীবীরা বসেন অন্য গাড়িতে। বাসা থেকে খালেদা জিয়া বের হয়ে গাড়িতে ওঠার সময় স্বজনরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এ সময় বেগম খালেদা জিয়া তাদের সান্ত্বনা দেন। তিনি সবাইকে তার জন্য দোয়া করতে বলেন। গুলশানের বাসা সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মী সিএসএফসহ পুরো বহরই নিয়ে যেতে চান। কিন্তু আপত্তি তোলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাসা থেকেই বেগম জিয়াকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এতে রাজি হচ্ছিলেন না বেগম জিয়া।

একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, সিএসএফ সদস্যরা যেতে পারবে নিরস্ত্র হয়ে। বেগম জিয়া তাতে রাজি হন। পরে নিরস্ত্র সিএসএফ সদস্যসহ গাড়িবহর নিয়ে আদালতের দিকে রওনা দেন বিএনপিপ্রধান। গুলশান-২ হয়ে গাড়ি ধীরগতিতে যাচ্ছিল। গুলশান-১, শুটিং ক্লাব, তেজগাঁও লিঙ্ক রোড হয়ে সাতরাস্তার মোড়ে গিয়ে গাড়ির গতি ক্রমেই কমতে থাকে।

নেতা-কর্মীদের তখন দেখা যায়নি। লিঙ্ক রোড অতিক্রম করে সাতরাস্তা মোড়ের পথ ধরার সঙ্গে সঙ্গেই আশপাশের এলাকা থেকে শত শত নেতা-কর্মী জড়ো হতে শুরু করে। একপর্যায়ে কয়েক হাজার নেতা-কর্মী স্লোগান নিয়ে বেগম জিয়ার গাড়িবহরে যুক্ত হয়। সাতরাস্তা থেকে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে রওনা দেয় বেগম জিয়ার গাড়িবহর।

বহরে থাকা বিএনপির এক নেতা জানান, নেতা-কর্মী জড়ো করতেই বিএনপিপ্রধানের গাড়িবহরের গতি ‘স্লো’ করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে হাতিরঝিল মোড়ে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী খালেদা জিয়ার বহরে যুক্ত হন। গাড়িবহর মগবাজার মোড়ে আসতেই সরকার সমর্থক ছাত্রলীগ-যুবলীগের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের। এ সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অন্য অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীদের এ সময় দেখা যায়। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনেও দ্বিতীয় দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। বিএনপি নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, মগবাজার মোড়ে তাদের লক্ষ্য করে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। এ সময় সেখানে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নীরব ভূমিকা পালন করছিল।

তবে বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের কঠোর অবস্থানে সরকার সমর্থকরা পালিয়ে যায়। বেলা সোয়া ১টার দিকে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে কাকরাইল মোড় এলাকায়। এর আগে বেইলি রোডে খালেদা জিয়ার বহরে যুক্ত হতে দেখা যায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেল, যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি শফিউল বারী বাবু, ছাত্রদল সভাপতি রাজিব হাসান, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক ছাত্রনেতা বজলুল করীম চৌধুরী আবেদকে।

এ সময় নেতা-কর্মীরা স্লোগান ধরেন, ‘আমার নেত্রী আমার মা, জেলে যেতে দেব না।’ এদিকে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বরকতউল্লাহ বুলু, মো. শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী।

যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবীর খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানা, রেহেনা আক্তার রানু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল, আ ক ন কুদ্দুসুর রহমান, আবদুল আওয়াল খান, সহ-প্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম, সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক বেবী নাজনীনসহ কেন্দ্রীয় বেশকিছু নেতাকে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।

নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সহ-দফতর সম্পাদক বেলাল আহমেদ, সাবেক এমপি নিলোফার চৌধুরী মণি, রাশেদা বেগম হিরা, অধ্যাপক আমিনুল ইসলামসহ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে দিনভর অবস্থান করতে দেখা যায়। গাড়িবহরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণই ছিল বেশি।

বেগম জিয়ার গাড়িবহরটি প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে এবং জনস্বাস্থ্য অধিদফতরের কার্যালয়ের সামনে আসতেই শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ। এ সময় একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিএনপি নেতা-কর্মীরা কাকরাইল মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ বক্সে ভাঙচুর চালান। ঘটনাস্থলে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কয়েক দফায় পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল ও ফাঁকা গুলি ছুড়েছে পুলিশ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খালেদা জিয়ার গাড়িবহর কাকরাইলের কাছ দিয়ে রমনা এলাকা পার হওয়ার সময় বিএনপি নেতা-কর্মীরা বহরে যোগ দিতে গেলে বাধা দেয় পুলিশ। এ সময় তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। জবাবে জলকামান নিক্ষেপ ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশও। এরপর হাই কোর্ট মোড়ে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তৃতীয় দফা সংঘর্ষ হয় পুলিশের।

পরে বেগম জিয়ার গাড়িবহরটি এগিয়ে চলে বকশীবাজারের দিকে। এ সময় চানখাঁরপুলে চতুর্থ দফায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় সেখানে কয়েকজন নেতা-কর্মীকে আটকের খবর পাওয়া গেছে। এরপর বেলা ১টা ৫০ মিনিটের দিকে বকশীবাজারে বিশেষ আদালতে পৌঁছেন খালেদা জিয়া। দুপুর ২টা ১০ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। এক মিনিটের মাথায় রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি।

এতে বিএনপি প্রধানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়। বেলা পৌনে ৩টা (১১-৭০৪৪) নম্বরের একটি সাদা জিপ গাড়িতে করে বেগম জিয়াকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। বিডি প্রতিদিন

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন