মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮ ১০:০৪:০০ পিএম

‘নিজের ঘরে পর’ হওয়া ব্যাটিং আর কত?

খেলাধুলা | শুক্রবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৫:২৪:৩১ পিএম

শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের মাঠ তাঁদের হাতের তালুর মতোই চেনা। বাংলাদেশ দল এ মাঠের উইকেটকেই সবচেয়ে বেশি জানে, চেনেও। বলা হয় এটা বাংলাদেশ দলের ‘হোম অব ক্রিকেট’। কিন্তু প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং দেখার পর এ কথা কেউ বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। বরং ওঁরা যেন নিজ ঘরে পরবাসী!

একটা সময় ছিল যখন ঘরের মাঠে কোনো ম্যাচ থাকলে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা কৌতুক করে বলতেন, এটা ব্যাটিং উইকেট, তবে আমরা ব্যাটিংয়ে নামলেই ওটা বোলিং উইকেট! আর বোলিং উইকেটে হাতে বল থাকলেই সেটা ব্যাটিং উইকেট! তাও ভালো যে এখন আর ‘স্টিকি উইকেটে’ খেলা হয় না। তবে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং দেখে কিন্তু আদিকালের সেই উইকেটকেই মনে পড়েছে।

সেসময় উইকেট খোলা পড়ে থাকত। বৃষ্টিতে ভেজার পর সূর্যের আলোয় সেই উইকেট ব্যাটসম্যানদের জন্য হয়ে উঠত রীতিমতো ‘মাইনফিল্ড’। বল কোন দিকে যাবে, কতটুকু বাঁক নেবে, উঠবে না নামবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। তা, শেরেবাংলার উইকেট তো সেরকম নয়। হ্যাঁ, স্পিনবান্ধব তো বটেই, বল বাঁক নিচ্ছে আবার বেশ উঠছেও। কিন্তু এসব ছোবল মোকাবিলা করতে গিয়ে ব্যাটসম্যানদের তো আত্মহত্যা করার কথা নয়!

আত্মহত্যাই তো? মুমিনুল হকের রান আউট কী স্বাভাবিক কোনো আউট? ম্যাচে মনোযোগ না থাকলে অবশ্য এমনটা ঘটাই স্বাভাবিক। ওপাশ থেকে থ্রো আসছে সেটা জানাও থাকতে পারে। কিন্তু মুমিনুল ঠিক দৌড়ানো নয় বলা ভালো অনেকটা দুলকি চালে ‘জগিং’ করার ঢংয়ে পৌঁছালেন ক্রিজে। ততক্ষণে স্টাম্পে বেলস নেই! অপর প্রান্তে থাকে ইমরুলও কি পারতেন না সঙ্গীকে সতর্ক করে দিতে?

টেস্টে রানআউট হওয়ার রোগ বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। পরিসংখ্যান বলছে ২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের প্রতি টেস্টে গড়ে ১.৩১টি রানআউটের ঘটনা ঘটেছে। মুমিনুল এ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন, যেখানে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে শুধু পাকিস্তান (১.৩৩) ও শ্রীলঙ্কা (১.৩৫)।

শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে টেস্টে নিজেদের ইতিহাসে সর্বনিম্ন রানে গুটিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে মুশফিকুর রহিমের অবদানও কম নয়। শুধু গতকাল ম্যাচের সেই মুহুর্তটা স্মরণ করে দেখুন। দল ৪ রান তুলতেই নেই ২ উইকেট। এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচের নবম ওভারের তৃতীয় বল থেকে টেকনিক্যালি বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান প্রশ্ন তুলেছেন নিজের টেকনিক নিয়েই! সুরঙ্গা লাকমলের তৃতীয় বলটি এক-দুই সেন্টিমিটারের জন্য অফস্টাম্প পায়নি অথচ মুশফিক কী অবলীলায় বলটা ছেড়ে দিলেন!

জাত ব্যাটসম্যানেরা এসব থেকে শিক্ষা নেয়। মুশফিক জাত ব্যাটসম্যান হয়েও কেন সেই বিপজ্জনক ‘লিভ’ থেকে শিক্ষা নিলেন না সেটা তিনিই ভালো জানেন। পরের ওয়াইড বলটি ‘ডাক’ করলেও চতুর্থ বলে আবারও সেই বিপজ্জনক ‘লিভ’! প্রবাদে আছে ‘ন্যাড়া একবারই বেলতলায় যায়’—কিন্তু মুশফিক গেলেন তিন-তিনবার! শেষবার আর রক্ষে হয়নি। সেই একইভাবে ভেতরে ঢোকা একই লেংথের বল ছাড়তে গিয়ে মুশফিকের মাথায় বেল পড়েছে—মানে, বলের আঘাতে স্টাম্পের বেলস পড়েছে।

ইমরুল কায়েসের আউট হওয়ার ধরন নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। দিলরুয়ান পেরেরার সেই ওভারে আগের দুটি বল বেশ বাঁক নিয়ে তাঁর ব্যাট ফাঁকি দিয়েছে। এর মধ্যে শেষ বলটিতে ক্যাচের আবেদনও উঠেছিল। পরের বলটি বাঁক নেবে, এমনটা ভেবেই তিনি সামনের পায়ে খেলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অভিজ্ঞ ইমরুল ভুলে গিয়েছিলেন, আগের বাঁক নেওয়া দুটি ডেলিভারি আসলে পেরেরার পাতা ফাঁদ। লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়া তৃতীয় বলটা যে ভেতরে ঢুকেছে!

লিটন দাসের আউটটি ধৈর্য হারানোর প্রতিফলন। এই স্পিনবান্ধব উইকেটে নিখুঁত লাইন-লেংথে বোলিং করে গেলে পেসাররাও যে উইকেট পেতে পারেন, লাকমল তাঁর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। হেরাথের করা আগের ওভারের শেষ পাঁচ বলে লিটন কোনো রান পাননি। আর তাই লাকমলের পরের ওভারে দ্বিতীয়বারের মতো স্ট্রাইকে এসেই বাইরের বল খেলার লোভ সামলাতে পারেননি। অফস্টাম্পের বেশ বাইরে প্রায় ‘সাত নম্বর স্টাম্প’ বরাবর নিখুঁত লেংথের ডেলিভারিটি খেলতে গেলে যে ফুটওয়ার্কের দরকার আছে, লিটন তা ভুলে গিয়েছিলেন। অথচ তিনি ওই বলটা ছাড়লে হয়তো মড়কটা নাও লাগতে পারত!

সে যেন-তেন মড়ক নয়, রীতিমতো শবের মিছিল! শেষ ৫ উইকেট পড়েছে মাত্র ৩ রানে। মিরাজ একপ্রান্তে তা দাঁড়িয়ে তা দেখলেন অসহায় চোখে। অথচ এই বাইশ গজের ঘূর্ণিপাকে শুধু মিরাজই খেলেছেন স্বচ্ছন্দে। তাঁর অপরাজিত ৩৮ রানের ইনিংসটা আকারে ছোট হলেও বাকিদের জন্য বার্তা—অযথাই ফ্রন্ট ফুটে না এসে স্বচ্ছন্দ ফুটওয়ার্কে কীভাবে বাউন্স মেশানো স্পিন খেলতে হয়। যেমন তাঁর ব্যাকফুট ডিফেন্সগুলো, কিন্তু সাব্বির রহমান কী শেখার পাত্র?

ওয়ানডে টেস্ট মিলিয়ে গত চার ইনিংসে সাব্বিরের মোট সংগ্রহ ৪২। রানখরায় যে আছেন তা বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু তাঁর আউটের ধরন দেখে মনে হয়নি রানে ফেরার কোনো ইচ্ছা ছিল! আকিলা ধনঞ্জয়ার ঝুলিয়ে ছাড়া ডেলিভারিটি একে তো খেলেছেন উঁচু করে, তার ওপর সোজা মিড অফে দাঁড়ানো দিনেশ চান্ডিমালের বরাবর—অথচ, মাঠে ‘গ্যাপ’ বলে একটা ব্যাপার আছে!

আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ঠিক তার দুই বল আগে মাহমুদউল্লাহ ফিরেছেন ড্রেসিংরুমে। অধিনায়ক নিজেও বাজে শট খেলেছেন। ব্যাট ও পায়ের মাঝে বিশাল ফাঁক থাকায় ড্রাইভ খেলতে গিয়ে বোল্ড হয়েছেন। কিন্তু সাব্বির যেভাবে আউট হয়েছেন তাতে শুধু একটা কথাই বলা যায়, হয়তো তাঁর বিশ্রাম প্রয়োজন। নইলে এমন ‘ব্রেইন ফেড’ চলতেই থাকবে!

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে লেজ বেরিয়ে গেলে তা দ্রুত কাটা পড়ার রোগটা পুরোনো। বোলারদের তাই ব্যাটিংয়ের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটা অবিচারসুলভ হয়। বিচার যদি করতে হয় তবে সেটা ব্যাটসম্যানদের। একটা উদাহরণ দেওয়া যায়, শ্রীলঙ্কা দলের প্রথম ইনিংসে ‘ফলস শট’ খেলার হার ৯.৮ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ দলের মাত্র ১১০ রানে শুধু ‘ফলস শট’-এর হারই ১৬.৮ শতাংশ! দায়টা কার?

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন