শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮ ০৮:০১:৫২ পিএম

আমার হাঁড়িগুলো ভরা হাটে ওভাবেই ভেঙে যায়!

জাতীয় | শনিবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০১:১৪:৫৩ এএম

আমি আমার নির্বুদ্ধিতা এবং অযোগ্যতা নিয়ে সচেতন থাকায় ভদ্রলোকের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য যথারীতি চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দার মতো সাদা রং করা চমৎকার একটি মাটির হাঁড়ি ও জুতসই একটি সাদা রঙের লাঠি ধরিয়ে দিলেন। তারপর হাঁড়িটি মাথার ওপর কিংবা পশ্চাদেদশের সঙ্গে লাগিয়ে রেখে কীভাবে তা রক্ষা করে অন্যের হাঁড়ি ভাঙতে হবে তা বুঝিয়ে দিলেন।

আমার স্ত্রী ও পুত্র-কন্যা আমাকে এক চোখে উৎসাহ জোগালেন এবং অন্য চোখ দিয়ে মহা উৎসাহে হাঁড়ি ভাঙার আকর্ষণীয় ও মূল্যবান পুরস্কারটির দিকে তাকালেন। উপস্থিত ভিআইপি প্রতিযোগীদের ব্যাপক রণপ্রস্তুতি ও দর্শকদের অতি উৎসাহে আমার হৃৎকম্পনের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটুকম্পন পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল। ফলে জীবনের আরও অনেক বিব্রতকর অভিজ্ঞতার মতো সেদিনও আমি আমার অযোগ্যতার হাঁড়িটি বিপুল গৌরবে মহাসমারোহে প্রচুর হর্ষধ্বনি ও করতালির মধ্যে ভেঙে দিলাম।

উপরোক্ত ঘটনার কৌতূহলোদ্দীপক পূর্বাপর কাহিনীগুলো বলার আগে আমি আমার জীবনের কতগুলো সাধারণ দুর্ভোগ-দুর্দশার কথা বলে নিই। জীবনে বহুবার অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে গিয়ে যেমন নাস্তানাবুদ হয়েছি তেমনি মানুষের অতি উৎসাহ, করতালি ও প্রশংসার সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছি। আমার জীবনখাতার পৃষ্ঠা ওল্টাতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম যে, সারাটি জীবন আমি না হয় অতিমূল্যায়িত হয়েছি নতুবা অবমূল্যায়িত হয়েছি।

আমার সাজিয়ে-গুছিয়ে কথা বলার ধরন এবং দুই কলম লেখার অভ্যাসের কারণে অনেকে হয়তো মনে করেন আমার পেটভরা বাহারি জ্ঞান-গরিমা আলোর মশাল জ্বালিয়ে মাথা ফুঁড়ে আকাশগামী হয়েছে। অন্যদিকে, আমার চুপচাপ প্রকৃতি, সবকিছু এড়িয়ে একা থাকার প্রবণতা এবং অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক না গলানোর অভ্যাসের কারণে অনেকে আমাকে নিতান্ত দুর্বল, স্বার্থপর, অসামাজিক ও অহংকারী প্রকৃতির মানুষ মনে করেন। যারা অতি আশা নিয়ে আমার কাছে আসেন তারা যেমন হতাশ হন তেমনি আমার অমূল্যায়নকারীদের হতাশার পরিমাণও কম নয়।

যুগান্তকারী সাহিত্যিক কিংবা কিংবদন্তির রাজনৈতিক নেতার কথামালার সঙ্গে পত্রপত্রিকায় ইদানীংকালের কলাম লেখক অথবা টেলিভিশন, সভা-সমিতি ও সেমিনারে পারিশ্রমিক নিয়ে কথা বলা কথকের মধ্যে যে বিস্তর অমিল এবং আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে তা আমি নিতান্ত অবুঝ হওয়া সত্ত্বেও ঢের বুঝতে পারি। আমি এ কথাও বুঝতে পারি যে, সুনাম-সুখ্যাতি ও জনপ্রিয়তার মতো ফাঁপা বেলুন জগতে দ্বিতীয়টি নেই।

জনপ্রিয় ব্যক্তির যদি উত্তম চরিত্র, পর্যাপ্ত প্রজ্ঞা ও ধর্মবোধ না থাকে তবে তারা ওজন হারিয়ে কখনো শূন্যে উড়তে থাকেন অথবা জমিনে গড়াতে থাকেন। অন্যদিকে সুদীর্ঘ কয়েক যুগের মেধা, পরিশ্রম ও সততার বিনিময়ে অর্জিত সুনাম-সুখ্যাতি ধুলা-ধূসরিত হয়ে কদর্য দুর্গন্ধময় কাদায় পরিণত হতে কয়েক মিনিট সময়ই যথেষ্ট। মানুষের উন্নয়নের উল্লম্ফনের গতির চেয়ে তার পতনের গতি সবসময়ই বেশি হয়।

আমার জীবনের বহু ক্ষেত্রে বহু নির্মম ঘটনা এবং বিস্ময়কর সফলতা ও আনন্দময় ক্ষণের তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করে আমার মনে হয়েছে, জীবনের চলতি পথে আমার আরও সতর্ক, আরও বিনয়ী এবং আরও দক্ষ হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে; অন্যথায় প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীর নিষ্ঠুর বাস্তবতার কবলে পড়ে আমাকে বার বার নাজেহাল হওয়ার নির্মম স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। যে কাহিনী বলার জন্য এতক্ষণ এত্তসব ভূমিকার অবতারণা করলাম এবার সেই প্রসঙ্গের... পাঁচালি শুরু করি।

বাংলাদেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপের তৃতীয় প্রজন্মের এক তরুণ ব্যবসায়ী হঠাৎ ফোন করে আমাকে জানালেন যে, তিনি আমার মস্তবড় ভক্ত। আমি তার কণ্ঠে সত্যিকার ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার গন্ধ পেলাম এবং সে অনুযায়ী তার সঙ্গে যথাসাধ্য আন্তরিকতা নিয়ে কথা বললাম। ভদ্রলোক নিজেকে আকিজ গ্রুপের পরিচালক বলে পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘ভাইয়া! আমার নাম ফাহিম। আমি আপনার ছোট ভাই হতে চাই।’

তিনি আমার সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন। বাংলাদেশে আকিজ গ্রুপের পরিচয় নতুন করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মরহুম শিল্পপতি শেখ আকিজ উদ্দিন সাধারণ বিড়ি ব্যবসা থেকে যে শিল্পসাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তা বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানার জন্য এক অনন্য উদাহরণ। তার ১০টি পুত্রসন্তান ও পাঁচটি কন্যাসন্তান মিলে যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালান তাতে লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থান এবং সরকারি কোষাগারে বছরে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জমা পড়ে।

আমি ফাহিমকে আমার অফিসের ঠিকানা দিলাম। সে আমার অফিসটির অবস্থান যখন দশম তলায় বলে জানল তখন অফিসের পরিবর্তে বাসায় গিয়ে দেখা করার প্রস্তাব দিল কারণ তার নাকি লিফট ফোবিয়া রয়েছে। অর্থাৎ তিনি লিফটে উঠতে ভয় পান। টেলিফোনে প্রথম পরিচয় এবং ক্ষণিকের আলাপে কারও বাসায় যাওয়ার প্রস্তাব শুনে আমি খানিকটা বিব্রত হলাম। কিন্তু অন্য প্রান্তে ফাহিমের সহজ-সরল আন্তরিকতা অচিরেই আমাকে স্বাভাবিক করে তুলল।

সেদিন রাতে তিনি যখন একগাছা উপহার, কেক ও মিষ্টি নিয়ে আমার বাসার সাত তলার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলেন তখন তাকে দেখে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। কারণ তার অভিব্যক্তি ও পোশাক-পরিচ্ছদ এত সাধারণ ছিল যা দেখে কেউ তাকে বলবে না যে তিনি দেশের বৃহত্তম শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক এবং বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ব্যক্তিত্ব বা সিআইপি।

ফাহিমের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় আমি দেশের শিল্পবাণিজ্য সম্পর্কে তার চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করলাম। আর তিনিও আমার কাছ থেকে দেশ-বিদেশের রাজনীতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলেন। ফাহিমের এক চাচা আফিল উদ্দিন জাতীয় সংসদে আমার সহকারী ছিলেন এবং তিনি বর্তমানেও সংসদ সদস্য। তার আরেক চাচা শেখ নাসির যশোরের নওয়াপাড়া নির্বাচনী এলাকা থেকে এমপি নির্বাচন করতে চান বলে আমি জানতাম।

তা ছাড়া শেখ নাসিরের স্ত্রীর বড় ভাইও বর্তমান সংসদের একজন সদস্য। কাজেই আকিজ পরিবার ব্যবসা-বাণিজ্যের বাইরে রাজনীতিতেও বেশ সক্রিয়। সুতরাং আপন পরিবারের রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে ফাহিম কেন আমার মতো ব্যর্থ একজন তথাকথিত রাজনীতিবিদের সঙ্গে দেখা করার জন্য এতটা কষ্ট করলেন তা নিয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি এমন একটি নিষ্পাপ হাসি দিলেন যার কারণে আমি আর দ্বিতীয়বার তাকে একই প্রশ্ন করতে পারলাম না।

ফাহিম আকিজ পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য। অস্ট্রেলিয়া থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে এসে এখন পৈতৃক ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। তার বাবা শেখ মমিন উদ্দিন মূলত চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি ও জুতা তৈরির কারখানা দেখাশোনা করেন। যশোরে কয়েক শ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত আকিজ ট্যানারি বছরে ১০ লাখ বর্গমিটার চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করে; যা তাদের পৃথিবীর বৃহত্তম ট্যানারির মর্যাদা এনে দিয়েছে।

অন্যদিকে, ঢাকার আশুলিয়ায় প্রায় ৫০ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত আকিজ সু ফ্যাক্টরি দেশের বৃহত্তম শতভাগ রপ্তানিমুখী একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের পরিবারের অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তিনি জানালেন যে, তার দাদার মূলত তিন স্ত্রী ছিলেন এবং সেই তিন দাদির সন্তানরা সবাই মিলেমিশে এখনো একই পরিবারভুক্ত হয়ে কিছু ব্যবসা যৌথ মালিকানায় পরিচালনা করছেন এবং কিছু ব্যবসা একক মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে।

তাদের বড় চাচা এককভাবে বাংলাদেশের সব আদ-দীন হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের মালিক। তার বাবা ও তিনি চামড়া ও জুতার ফ্যাক্টরিগুলোর একক মালিক। শেখ আফিল এমপিরও স্বতন্ত্র মালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যবসাপাতি রয়েছে। তবে শেখ নাসির, শেখ বসির প্রমুখের যৌথ পরিচালনায় শিপিং, জুট, টেক্সটাইল, টিম্বার, বেভারেজ প্রভৃতি ব্যবসার পরিধিই সবচেয়ে বড়। তবে লাভের দিক থেকে এখনো আকিজ বিড়ি ও সিগারেটের ব্যবসার সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা চলে না।

আকিজ গ্রুপের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করলাম এ কারণে যে, অনেকে হয়তো দেশের নামকরা শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে কৌতূহল বোধ করতে পারেন। আমি আমার কর্মজীবন সাংবাদিকতা দ্বারা শুরু করলেও ১৯৯১ সাল থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করছি। আমার ব্যবসার পরিধি ও ব্যাপ্তি উল্লেখ করার মতো না হলেও ব্যক্তিগত গণসংযোগ এবং রাজনীতি ও সাংবাদিকতা পেশার কল্যাণে সেই আশির দশক থেকে আজ অবধি দেশের প্রতিষ্ঠিত প্রায় সব বড় ব্যবসায়ীকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি।

আমার মতো যারা কেবল ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য নিজেদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও সর্বোচ্চ মেধা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পেরেছেন তারাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। আমার মতো সেমি ব্যবসায়ী, সেমি বুদ্ধিজীবী ও সেমি রাজনীতিবিদদের যে আসলে কোনো কিছুতেই পরিপূর্ণ সফলতা আসে না তার বাস্তব প্রমাণ আমি নিজে। মরহুম আকিজ উদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন যে, পারিবারিক ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যকে রাজনীতিমুক্ত রাখা ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে সফলতা লাভ অসম্ভব।

তিনি তার ছেলেমেয়েদের মধ্যে আপন আদর্শের বুনিয়াদ কতটা মজবুতভাবে গেঁথে দিয়েছিলেন তা আমি স্বচক্ষে না দেখলে হয়তো বিশ্বাসই করতাম না। ঢাকার আশুলিয়ায় আকিজ সু ফ্যাক্টরিতে সম্প্রতি আকিজ পরিবার ও তাদের শুভানুধ্যায়ীদের একটি মিলনমেলা বসেছিল। ফাহিমের অনুরোধে আমি সেখানে সপরিবারে উপস্থিত হয়েছিলাম। তার বাবা ও মা আমাকে এবং আমার পরিবারকে উষ্ণ অভ্যর্থনায় বরণ করে নিলেন। তার অন্যান্য চাচা, চাচি, ভাইবোন এবং গ্রুপের কর্তাব্যক্তিরাও আমার সঙ্গে পরিচিত হলেন।

তাদের আন্তরিকতা এবং সহজ-সরল অভিব্যক্তির কারণে আমি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের একান্ত আপনজনের মতো হয়ে গেলাম। আমার কাছে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল আকিজ পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক। ছোট বড় সবাই একে অন্যকে তুমি বলে সম্বোধন করছিলেন এবং একই সঙ্গে পরস্পর পরস্পরকে সম্মানিত করার চেষ্টা করছিলেন। ফাহিম ও তার এক চাচা আমাকে বললেন যে, তাদের পরিবারের সবচেয়ে ধনী ও চৌকস সদস্যের নাম বসির।

আমাদের কথোপকথনের মাঝে হঠাৎ করেই জনাব বসির এসে উপস্থিত হলেন। আমরা সবাই গিয়ে একটি টেবিল ঘিরে বসে পড়লাম। পাশের টেবিল থেকে শেখ আফিল উদ্দিন এমপি, মনিরুল ইসলাম এমপিসহ আকিজ গ্রুপের সিনিয়র সদস্যরা আমাদের টেবিলে চলে এলেন। ফলে শুরু হয়ে গেল তুমুল আড্ডা। আকিজ পরিবারের সেদিনের আড্ডায় আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম চুপচাপ থেকে তাদের কথাবার্তা শুনে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। তারা প্রায় সমস্বরে বলে উঠলেন যে, আমার টকশো ও লেখালেখি নিয়ে তাদের অনেক প্রশ্ন রয়েছে।

তারা বহু সুন্দর সুন্দর বাক্যে আমাকে এমনভাবে প্রশংসা করলেন যা শুনে আমার অবস্থা নাচুনে বুড়ি ও ঢোলের বাড়ির মতো হয়ে গেল। ফলে আমি আরও একবার অতিমূল্যায়নের কবলে পড়ে অবিরত ফুলে ফেঁপে বিরাট এক ফাঁকা বেলুন হয়ে গেলাম। শুরু হলো আমার বকবকানি। অন্যসব বক্তার মতো আমিও কতগুলো চিত্তাকর্ষকমূলক কথামালা ঠিক করে রাখি এবং সময়-সুযোগমতো সেগুলো উদিগরণ করে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করি যা দেখে মনে হতে পারে আমি সর্বগুণে গুণান্বিত এবং সর্বকাজের বিশেষজ্ঞ একজন মানুষ।

সেদিনের আড্ডায় আকিজ পরিবারের সদস্যরাও হয়তো তেমনি মনে করেছিলেন, তা না হলে তারা কেন জোর করে হাঁড়িভাঙা খেলায় আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন। আমার বিশ্বাস তারা আমার সম্পর্কে এমন ধারণা করেছিলেন যে, আমি হয়তো খুব চালাক-চতুর এবং দক্ষ একজন খেলোয়াড় এবং নিশ্চয়ই সবার হাঁড়ি ভেঙে আমি বিজয়ী হয়ে প্রথম পুরস্কারটি গ্রহণ করে তাদের ধন্য করতে পারব।

ফাহিমের বাবা শেখ মমিন উদ্দিন আমাকে একরকম জোর করেই খেলার মাঠে নিয়ে গেলেন এবং হাতে হাঁড়ি ও লাঠি ধরিয়ে দিলেন। আকিজ পরিবারের সিনিয়র সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা যারা সবাই ছিলেন ভিআইপি অথবা সিআইপি, সবাই হাঁড়ি ও লাঠি নিয়ে মাঠে অবতীর্ণ হলেন। কয়েকজন আমার কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘রনি ভাই! আপনি আমারটা ভাঙবেন না, আমিও আপনারটা ভাঙব না।’ আমি অবাক দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাতেই তারা বললেন, ‘এ ধরনের খেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে ঐক্য করতে হয়, না হলে টেকা যায় না।’

আমি মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ২০-২৫ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ইতিমধ্যেই পাঁচটি গ্রুপ হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, ব্যবসায়ী ও নিরপেক্ষ গ্রুপের সদস্যরা আলাদা হয়ে প্রতিপক্ষদের পরাজিত করার ফন্দি আঁটতে লাগলেন। তাদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো তারা আমাকে রেহাই দেবেন এবং পরস্পর পরস্পরের হাঁড়ি ভেঙে আমাকে জিতিয়ে দেবেন। আমার এই চিন্তা যে কতটা অমূলক ও অর্বাচীনের মতো ছিল তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। একটু পরই রেফারি বাঁশিতে ফুঁ দিলেন। ফলে খেলা শুরু হলো।

খেলোয়াড়দের মনে উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য যুদ্ধের ময়দানের মতো বাদ্য বাজানো শুরু হলো। শত শত বিভিন্ন বয়সের আমন্ত্রিত অতিথি তুমুল বেগে হর্ষধ্বনি দিতে লাগলেন। মধ্যযুগের যুদ্ধের ময়দানে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে যেভাবে যোদ্ধারা যুদ্ধ করতেন ঠিক সেভাবে সেদিনের প্রতিযোগীরা এক হাতে হাঁড়ি এবং অন্য হাতে লাঠি নিয়ে এমনভাবে নাচনকুদন শুরু করলেন যা না দেখলে আমার জীবনে হয়তো বিরাট এক অপূর্ণতা থেকে যেত। কারণ আমি ইতিপূর্বে কোনো দিন এ ধরনের হাঁড়ি ভাঙা খেলা দেখিনি এবং এই খেলা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না।

আমার ঘরকুনো স্বভাব এবং অলসতার কারণে জীবনে কোনো খেলাই খেলতে শিখিনি। অথচ জীবনের বহু ক্ষেত্রে লোকজন আমাকে জোর করে খেলার মাঠে নামিয়ে দিয়েছে এমনটা ভেবে যে নিশ্চয়ই আমি মস্তবড় কোনো খেলোয়াড়। সেদিনের খেলার মাঠের আনন্দ ও উত্তেজনা আমাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বানিয়ে ফেলল। অনেকে হর্ষধ্বনি দিয়ে বলতে আরম্ভ করলেন, ‘রনি ভাই! ওদিকে যান, ওকে মারেন। ওই হাঁড়ির পাছায় বাড়ি দেন, ওইটার মাথায় টোকা দেন, হালকা একটু গুঁতা দেন।’

আমি লোকজনের উৎসাহ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার ধরন এবং নিজের অযোগ্যতার সমন্বয় করে চার্লি চ্যাপলিনের সেই বিখ্যাত বক্সিং প্রতিযোগিতার দৃশ্যের কথা কল্পনা করলাম এবং অবাক বিস্ময়ে প্রতিযোগীদের দক্ষতা, নৈপুণ্য ও সিরিয়াসনেস দেখে চিন্তা করতে থাকলাম কী করা যায়। আমি চুপচাপ মাঠের এক কোণে প্রকৃতির প্রতিযোগী করে সময় পার করতে থাকলাম। এমন সময় একজন অতীব ভদ্রলোক-প্রকৃতির প্রতিযোগী এগিয়ে এসে আমাকে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম রনি ভাই!’ খেলার মাঠেও আমার সম্মান! এই কথা ভেবে সালামের জবাব দিয়ে আমি যেই না ভদ্রলোকের দিকে তাকাতে গেলাম অমনি তিনি পুটুস করে একটি বাড়ি মেরে আমার হাঁড়িটি ভেঙে দিলেন! বিডি প্রতিদিন

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন