রবিবার, ২০ মে ২০১৮ ০৪:১৮:৫৭ পিএম

নতুন আতঙ্কে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা

আন্তর্জাতিক | সোমবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০১:৫৪:৫৩ এএম

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সীমান্তের শূন্যরেখায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থানকারী প্রায় ছয় হাজার রোহিঙ্গাকে এলাকা ছেড়ে যেতে মাইকিং করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশ।

কয়েক দিন ধরেই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় এ নির্দেশনা দিয়ে তারা মাইকিং করছে। মাইকিং করে বলা হচ্ছে, ‘তোমরা (রোহিঙ্গারা) আমাদের সঙ্গে কথা বলবে না। তোমরা আমাদের কেউ নয়। আমাদের ভূখণ্ড ছেড়ে বাংলাদেশে চলে যাও।’

গতকাল সকালেও শূন্যরেখা থেকে রোহিঙ্গাদের সরে যেতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কাঁটাতারের বেড়ার কাছে এসে মাইকিং করেছে। এ ছাড়া আরাকান রাজ্যে এখনো যারা অবস্থান করছে তাদেরও স্বাভাবিক জীবন যাপনে সেনারা বাধা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গারা। ফলে গত সপ্তায় প্রায় প্রতিদিন গড়ে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশু নৌকায় করে এপারে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

এতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তবে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশের (বিজিবি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জিরো পয়েন্ট বা সীমান্তের শূন্যরেখা স্পর্শকাতর হওয়ায় এসব রোহিঙ্গাকে কিছু করতে পারবে না মিয়ানমার সেনারা। প্রসঙ্গত, গত বছর ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা নিধন-নির্যাতনের মুখে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে ১০ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নেন।

এদের মধ্যে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সীমান্তের আশারতলী, বড় ছনখোলা, তুমব্রুসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত অর্ধলাখ রোহিঙ্গা অবস্থান নেন। শুরুর দিকে যার প্রায় ১৫ হাজারই এই তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান নিয়েছিল। ইতিমধ্যে ইউএনএইচসিআরের সহায়তায় জানুয়ারিতে উপজেলার সাপমারা ঝিরি, বড় ছনখোলা, দোছড়ি ও ঘুনধুম সীমান্তে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে তুমব্রু সীমান্তের ছয় হাজার রোহিঙ্গাকে কোথাও সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এই সীমান্তের রোহিঙ্গা বৃদ্ধ বদিউজ্জামান জানান, এত দিন তারা ভালোই ছিলেন। তবে এক সপ্তাহ ধরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বিজিপি প্রায়ই ফাঁকা গুলি ছুড়ে ভয় দেখাচ্ছে। তারা সীমান্তের ওপারে ঢেঁকিবুনিয়া এলাকায় নতুন করে বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে, মাইকিং করে সরিয়ে যেতে বলছে। মিয়ানমারের সেনাসদস্যরা কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষে তাঁবু টাঙিয়ে অবস্থান নিয়েছে। ফলে সবার মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে জানান ৬৫ বছরের এই রোহিঙ্গা।

এদিকে উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা মাঝি তকিয়ত উল্লাহ জানান, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা সীমান্তের কাছে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়ে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তবে এতে কোনো অসুবিধা হবে না বলে মনে করছেন তিনি। নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরওয়ার কামাল জানান, এসব রোহিঙ্গা নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নিলেও তারা মূলত মিয়ানমারের ভূখণ্ডেই রয়েছে।

এ জন্য তাদের সরিয়ে নেওয়া আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। কক্সবাজার বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবদুল খালেক বলেন, ‘জিরো পয়েন্টে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের চাপ দেওয়ার বিষয়টি আমরা জেনেছি। সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এখন নয়।’

এদিকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের হাড়িয়াখালী ও খুরের মুখ এলাকায় প্রায় প্রতিদিন ৪০-৫০ জন করে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু নৌকাযোগে পালিয়ে আসছে। মাঝে কিছুদিন রোহিঙ্গা আসা বন্ধ থাকলেও ফের শুরু হয়েছে দেশের সর্বশেষ দক্ষিণের এই সীমানায়।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বরাত দিয়ে শাহপরীর দ্বীপের স্থানীয় সমাজকর্মী মো. জাকারিয়া আলফাজ বলেন, এখন যারা চলে আসছে তারা মূলত খাদ্য ও চিকিত্সা সংকটের কারণে আসছে। তারা মিয়ানমারের ধংখালী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে খেয়ে না খেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। আয়-রোজগার নেই, তাই খাদ্য নেই, চিকিত্সাও নেই। এ অবস্থায় তারা চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সু চির সঙ্গে জনসনের বৈঠক: কক্সবাজারে কুতুপালং পরিদর্শনের পর ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ রাখাইন পরিদর্শন করেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। গতকাল বিকালে রাখাইন সফরের আগে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চাপ দিতে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে বাংলাদেশে দুই দিনের সফরে এসে গত শনিবার কক্সবাজার গিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তখন তিনি বাংলাদেশের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়ে যান। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসির খবরে বলা হয়, মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। এ সময় রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারের ফেরার ব্যবস্থা করতে সু চির প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

মিয়ানমার থেকে বিবিসির প্রতিবেদক জানিয়েছেন, ‘মিয়ানমারে সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় দু’জনকেই হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেছে। এ সময় তারা দুজনই হ্যান্ডশেক করেন। তবে রোহিঙ্গাদের দুর্দশার বিষয়টি কঠিন হবে। ব্রিটিশ এই পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে রাখাইনে নেওয়া হয়েছে। পরে তিনি রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশনের চেয়ারম্যান সুরাকিয়ার্ট সাথিরাথির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।’

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের পর বরিস জনসন বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের ভয়াবহ জীবন-যাপন পরিস্থিতি সংকটের শক্তিশালী সমাধান খুঁজে বের করতে তার সরকার সহযোগিতা করবে। তিনি এও বলেছিলেন, ‘এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, পরিস্থিতি ঠিক হওয়া সাপেক্ষে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন অবশ্যই স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে হতে হবে।’

শনিবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর বরিস জনসন বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ এবং ব্রিটেন সরকারের অবস্থান একই রকম। মিয়ানমারের সরকারের কাছে সমস্যা সমাধানের উপায়গুলো তুলে ধরতে হবে।’

উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে শুরু হওয়া দেশটির সেনাবাহিনীর রক্তাক্ত অভিযান, জ্বালাও-পোড়াওয়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়েছে। জাতিসংঘ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ অভিযানকে জাতিগত নিধনে পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণের শামিল বলে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে গণহত্যার অভিযোগ আনা হলেও তা বরাবরই অস্বীকার করে দেশটি।

তবে গত ডিসেম্বরে সংখ্যালঘু ১০ রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যায় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জড়িত বলে প্রথমবারের মতো স্বীকার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। সহিংসতায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরানোর লক্ষ্যে ডিসেম্বরে দুই দেশের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়।

আগামী দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরাতে দুই দেশ ঐকমত্যে পৌঁছেছে। প্রতি সপ্তাহে মাত্র দেড় হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার এ সংখ্যাকে নগণ্য উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে বাংলাদেশ বলছে, দুই বছরের মধ্যে সব রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে তারা চুক্তি করেছে। বিডি প্রতিদিন

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন