মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০১:১৮:২৩ এএম

রাজনীতিতে দুর্দিনের সাথীরা কেবল দুর্দিনেই থাকে

খোলা কলাম | মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০২:১০:১২ এএম

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ৮ ফেব্রুয়ারি জেলে গেলেন। এই রায় দেখিয়ে দিল ক্ষমতার দাপট চিরস্থায়ী কিছু নয়। জেল হলো তারেক রহমানের। একসময় এই তারেক রহমান ও তার হাওয়া ভবন ছিল ক্ষমতার অলিখিত মহা কেন্দ্রবিন্দু। অভিযোগ রয়েছে, আইন, আদালত, বদলি, নিয়োগসহ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করা হতো ওই ভবন। এ ভবনের বিরুদ্ধে কথা বলার স্পর্ধা কারও ছিলনা তখন।অথচ সেই প্রবল পরাক্রমশালীও আজ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তার অনুপস্থিতিতে আদালত তাকে জেল দিল।

এই সাবেক যুবরাজ দেশে এলে সাথে সাথেই গ্রেফতার করা হবে। আর এ গ্রেফতার সরকারি দমন পীড়নে নয়, তা আদালতের নির্দেশে। বিএনপি এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি দিল। আইনি রায় আইনি প্রক্রিয়াতেই মোকাবেলা করা সঙ্গত নয় কি? আন্দোলন করে কি আদালতের রায় বদলানো যায়?

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলাটি হয়েছিল ওয়ান ইলেভেনের পরে ফখর উদ্দীন-মঈন উদ্দীনের আমলে। মামলার দায় তাদের। রায়ের দায়টাও কিন্তু সরকারের নয়। সরকার কি পারতো নির্বাহী আদেশে এ মামলাগুলো স্থগিত করতে? এমনটি করলে কী প্রতিক্রিয়া হতো তখন? তখন কি কথা উঠতো না যে সরকার আদালতের স্বাভাবিক গতি বন্ধ করে দিয়েছে? জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টটি কোথায়? কারা করল?

খালেদা জিয়াও বা কেন এতে অনুমোদন ও অনুদান দিল? দল ক্ষমতায় গেলে অনেক অনেক ভুঁইফোঁড় সংগঠন গড়ে ওঠে। বিরোধীদলে থাকার সময় ওরা চুপসে থাকে। এসব বিষয়ে সকলেরই সতর্ক থাকা দরকার। অথচ ক্ষমতাসীন সময়ে অনেককেই দেখা যায় বিভিন্ন রঙের ঢঙের স্তুতিকারদের স্তুতি সেবন করতে। তারা তখন কখনও ভাবেনা যে এ ক্ষমতা চিরস্থায়ী কিছু নয়। দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের নেশায় তারা মেতে ওঠে ক্ষমতার অপব্যবহারে। খালেদা জিয়ার রায়ে ক্ষমতাবাজরা একটু শিক্ষা নিতে পারেন।

এ রায়ে ক্ষমতাবাজদের বিচারের উর্ধ্বে থাকার বাসনায় একটা বড় ঢিল ছোঁড়া হল। সুদিন, ক্ষমতা কারও চিরস্থায়ী নয়। যেখানে সুদিন সেখানেই দুর্দিনের পদধ্বনি। অথচ ক্ষমতায় থাকাকালীন স্তুতিকারদের স্তুতি, কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও দুর্বৃত্তায়নের নেশায় সবাই ভুলে যায় তাদের এই সম্ভাব্য পরিণতির ভাবনা। খালেদা জিয়ার এই রায় প্রবল ক্ষমতাধরদের জন্য একটি সংকেত বার্তা হয়ে থাকল। দেশ জুড়ে খালেদা জিয়াকে ঘিরে কত জয়ধ্বনি শোনা যেত। আবার এই জয়ধ্বনি দাতাদের অনেককেই দেখা গেছে ক্ষমতা হারানোর পর তার বিরুদ্ধ রাজনীতির স্রোতে মিশে যেতে।

দুর্দিনে কারা পাশে থাকে? খালেদাকে কারাগারে দেখতে অনেক অজ্ঞাত, অখ্যাত মানুষদের দেখা যায় তার পছন্দের খাবার নিয়ে কারাফটকের সামনে অপেক্ষা করতে। অথচ সুদিনে এরা ছিল অজ্ঞাত ও অবহেলিত। এই দুর্দিনের সাথীরা সুদিনে সামান্যতম কোন সুবিধা নেয়নি। এটা যেন চিরায়ত রীতি হয়ে উঠছে সুদিনের স্তুতিকাররা দুর্দিনে পাশে থাকেনা। দুর্দিনের সাথীরা যেন কেবল দুর্দিনে পাশে থাকার জন্যই। অতীতে জেল খেটেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আর তার সুদিনের নিকটতম ব্যক্তি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সহ অনেকেই চলে গেছেন বিএনপিতে। অথচ সুদিনে এরশাদের স্তুতি করে তারা নিজেদের ক্ষমতার মসনদকে পোক্ত করেছেন।

১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারসহ হত্যা করা হলো। তখনও প্রতিবাদ করলো অখ্যাত ও অজ্ঞাত মুজিব প্রেমীরা। তারা আখ্যায়িত হলো দুষ্কৃতিকারী হিসেবে। আজও তাদের স্বীকৃতি মেলেনি। ১৫ আগস্ট আসে যায় কেউ খবর নেয়না তাদের। প্রতিটি ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে ঘিরেই গড়ে ওঠে স্তুতিবাজদের ক্ষমতাস্পর্শী চতুর দেয়াল। এ দেয়ালে তফাতে চলে যায় দুর্দিনের ত্যাগী সাথীরা। যারা কেবলই আদর্শ ও ভালবাসার চর্চা করে থাকে।
আর ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো এই মানুষগুলো সুদিনে আড়ালে চলে যায়। তাদের দেখা যায় দুর্দিনে। সুদিনের সুবিধা ভোগীরাই দুর্দিনে ভোল পাল্টে নতুন সুদিন সঙ্গকে বেছে নেয়। দুর্দিনের ত্যাগীরা সবসময় পাশে দাঁড়ায় কেবলই দুর্দিনে। এটা যেন নিয়তি হয়ে উঠছে। ওয়ান ইলেভেনের সময় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া কারাগারে গেলেন। যখন তারা নানা হয়রানি, মামলা ও নির্যাতনের মুখোমুখি তখন অনেককে দেখা যায় তাদের বিরুদ্ধ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে। নিজেদের রক্ষার দিক ভেবে তখন তাদের নেত্রী ও দলের দিক তারা ভাবেননি।

বিএনপি-খালেদা জিয়াওয়ান ইলেভেনের সময় ‘সংস্কারপন্থী’ কথাটার প্রচলন হয়। তখন অনেককেই দেখা যায় সংস্কারপন্থী হয়ে যেতে। এতদিন যে রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন তাতেই তারা ত্রুটি ধরেন ও তা সংস্কার করে রাজনীতি সংস্কারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তারা। অথচ এই তারাই এই ত্রুটিপূর্ণ রাজনীতির সকল সুবিধা নিয়েছেন।কেউ মন্ত্রী হয়েছেন, কেউ এমপি হয়েছেন। সুদিনে নেত্রীর স্তুতিতে তাদের এতটুকু কমতি ছিলনা। আর দুর্দিনে কেউ বললেন, পরিবারতন্ত্র রুখতে হবে। কেউ বললেন, একই ব্যক্তি দলের প্রধান ও সরকারের প্রধান তা হতে পারেনা।

কিন্তু এই সংস্কারকের ভূমিকা দুর্দিনে কেন? কেন বললেন না সুদিনে? সুদিনের স্তুতিতে ব্যস্ত থেকে দুর্দিনে চুপসে থাকা ও বিরুদ্ধ ভূমিকাতে সক্রিয় হওয়া কতটা যুক্তি সঙ্গত? কিন্তু এসবে লিপ্ত হয় সুদিনের টসটসে ফলভোগীরাই, দুর্দিনের অনাহারীরা নয়। এই অনাহারীরাই পারে শুধু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপদে পাশে দাঁড়াতে। এটাই বুঝি আজ চরম বাস্তবতা হয়ে উঠল। তাই নয় কি?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব, তার জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়)।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন