রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ ০২:০২:৫৩ এএম

অবশেষে জানা গেল, যে পরিকল্পনায় এগুচ্ছে বিএনপি

রাজনীতি | ঢাকা | মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০২:১২:১৯ পিএম

জোটের বাইরে সরকারবিরোধী দলগুলো নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের পরিকল্পনা করেছে বিএনপি। এক্ষেত্রে ডান, বাম ও মধ্যপন্থীদের যুক্ত করা হচ্ছে। তবে ২০ দলীয় জোটের ব্যানারে আন্দোলনে যেতে বেশ কয়েকটি দলের আপত্তি থাকায় তাদের নিয়ে আলাদাভাবে নতুন জোট গঠনের চিন্তাভাবনা হচ্ছে।

দলগুলো হচ্ছে- ‘সর্বদলীয় ঐক্যজোট’, ‘সর্বদলীয় যুক্তফ্রন্ট’, ‘গণতান্ত্রিক অ্যালায়েন্স’ ও ‘পিপলস ফ্রন্ট’। এ চারটির মধ্য থেকে যে কোনো একটি নাম শিগগিরই চূড়ান্ত করা হবে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দুই মেয়াদের দুর্নীতির ফিরিস্তি নিয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। জিয়া অরফানেজ দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার পরদিন শুক্রবার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের যুগ্ম মহাসচিবদের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

রোববার জোটের বৈঠকেও এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে সরকারের দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব দেয়া হয়।

পাশাপাশি বলা হয়, এই দুর্নীতির ফিরিস্তি সংবলিত লিফলেট তৈরি করে তা সারা দেশে বিলি করার প্রস্তাব করা হয়। জোটের শরিক এক নেতা জানান, বৈঠকে হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ফারমার্স ব্যাংক, এনআরবিসিসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা ওই লিফলেটে স্থান পাবে। এছাড়া ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপিসহ সব স্তরের নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছিল, সেগুলোর বিস্তারিত তথ্য থাকবে ওই লিফলেটে।

এ ব্যাপারে বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নেতা জানান, এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ শেষ করেছেন তারা। সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দুর্নীতির ফিরিস্তি যে কোনো সময় লিফলেট আকারে দলের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলায় পাঠিয়ে দেয়া হবে। একই সঙ্গে তা দলীয় নেতাকর্মীদের ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তা প্রচারের আহ্বান জানানো হবে।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা ও অন্যান্য মামলার বিষয়ে আজ আবারও বিদেশি কূনীতিকদের ব্রিফ করবে বিএনপি। বিকাল ৪টায় গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত সব দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার এবং বিদেশি সংস্থাগুলোর কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের এক সদস্য জানান, খালেদা জিয়ার মামলা, সাজা এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফ করবেন বিএনপি মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতারা।

বিএনপির একজন শীর্ষ নীতিনির্ধারক সোমবার বলেন, ২০ দলীয় জোটকে নিয়ে একই সঙ্গে এ যুগপৎ আন্দোলনে নামতে চায় দলটি। এক্ষেত্রে যেসব দল একতরফা নির্বাচন চায় না, আইনি শাসনে বিশ্বাস করে ও গণতন্ত্র চায়, তাদের প্রথমে জোটে আসার জন্য অনুরোধ করা হবে। যদি কেউ ২০ দলীয় জোটে আসতে না চায়, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দলকে প্রস্তাবিত নতুন জোটের ব্যানারে রেখে একই প্লাটফর্মের মাধ্যমে আন্দোলন সফল করার টার্গেট বিএনপির। রোববার জোটের বৈঠকেও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দেন জোটের নেতারা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। আর এ ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন যাতে না হতে পারে, সেজন্য সরকারের বাইরের ডান, বাম, মধ্যপন্থী- সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একটি জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার প্রতিষ্ঠাই আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। এজন্য দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কাজ করছেন। তবে কোন সমীকরণে তা চূড়ান্ত হবে, এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করবেন।

এছাড়া বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সরকারবিরোধী জনমত তৈরি করতে তৃণমূল সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে। শিগগিরই জোটের নেতারা বিভাগীয় শহরসহ সব জেলায় সফরে বের হবেন।

এদিকে আজ বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশে বিএনপি ও জিয়া পরিবারের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে। ইউরোবিডি নিউজ পাঠকদের জন্য নিচে সেই প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলেঃ

বাংলাদেশে দুর্নীতি মামলায় জেলে আছেন খালেদা জিয়া। এখন দলের দায়িত্ব নিয়েছেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। যিনি নিজেও দুটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ও বহু মামলায় অভিযুক্ত।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও আরো বেশকটি মামলা বিচারাধীন। প্রশ্ন উঠছে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং নেতৃত্ব নিয়ে। 'বিএনপি সময় অসময়' গ্রন্থের লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি জিয়াউর রহমান মারা যাবার পর এবং এরশাদের সময়েও সংকটে পড়েছে। ওয়ান ইলেভেনের সময়েও একটা বড় সংকট তাদের গেছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি জটিল।

"দলতো আছে, কিন্তু সবচে বড় সমস্যা হচ্ছে দলের মধ্যে সংহতিটা থাকবে কিনা। কারণ এই দলের অনেক নেতা অতীতে দল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন আবার এসেছেন, আবার চলেও যেতে পারেন। সরকার থেকে নানান টোপ তাদের দেয়া হতে পারে। সুতরাং এই সময়টা বিএনপির জন্য খুবই নাজুক।"

কিন্তু বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করছেন তাদের নেতা জেলে যাওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীরা আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ। "মামলা বিএনপিকে বেশি ক্ষতি করতে পারবে না। কারাগারেও তাকে বেশিদিন রাখতে পারবে না। দল অটুট আছে অটুট থাকবে। মামলা একটা একটা বড় হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে আওয়ামী লীগের সরকার।

কিন্তু আমাদের বিশ্বাস আমাদের কর্মীবাহিনী, জনগণ এগুলো উপেক্ষা করে মোকাবেলা করে তারা আমাদের যে রাজনৈতিক লক্ষ্য সে লক্ষ্যে তারা পৌঁছুতে পারবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্বাচনে জয়ী হয়ে দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসা। প্রায় এগার বছর ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে রয়েছে বিএনপি। কারাগারে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরো মামলা আছে রায়ের অপেক্ষায়। তারেক রহমানেরও দেশে ফেরার পরিস্থিতি নেই।

মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, "যেহেতু এই দলগুলো এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক। বিএনপির মতো দলে সেকেন্ড ম্যান বলে কিছু নাই। যাকে তারা সেকেন্ড ম্যান বলছেন তিনিও তো দৃশ্যমান না। সুতরাং এটা আরেক ধরনের সংকট। এবং এই সংকটটা আরো বড় মনে হবে যেহেতু নির্বাচনটা কাছে। সুতরাং নির্বাচনে এবার যদি বিএনপি খুব প্রস্তুতি নিয়ে মোকাবেলা করতে না পারে তাহলে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়তে হবে।"

এদিকে এবছরই বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। গত নির্বাচন বয়কট করা দল বিএনপি এবার যখন নির্বাচন করতে চাইছে তখন দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে গেলেন। মি. আহমদ মনে করেন, "যে কোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। এইটা সামাল দেবার জন্য যে ব্যক্তিত্ব, ক্যারিশমা এবং নেতৃত্ব দরকার সেটা কিন্তু দলের মধ্যে বেগম জিয়া ছাড়া আর কারো নাই। দলে যদি নেতৃত্ব না থাকে, দলের পাঁচজন নেতা যদি পাঁচ রকমের কথা বলে, যেটা ইতোমধ্যে আমরা আলামত দেখছি তাহলে তো এই দলটা নির্বাচন করার মতো সামর্থ্য অর্জন করবে না।"

বর্তমান পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার এবং তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে আদালতের রায়ের ওপর। বিরোধী দল ও মতের প্রতি সরকারের কঠোর অবস্থানও স্পষ্ট। এ অবস্থায় বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে কী কোনো ভাবনা আছে বিএনপিতে? এ প্রশ্নে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নেতৃত্বের কোনো সংকট বিএনপিতে নেই। নতুন কিছু ভাবার কিছু নেই।

"আমরা এগুলো নিয়ে এতটুকু চিন্তিত নই শঙ্কিত নই। এটা পার্ট অব পলিটিক্স। যতই ষড়যন্ত্র করা হোক তাদেরকে রাজনীতি থেকে সরানো যাবে না। এটা সম্ভব না। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি একটি পরিবার কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল।

"পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির সমস্যাটা হচ্ছে এখানে যদি পরিবার থেকে ঐ ধরনের ক্যারিশম্যাটিক লিডার বেরিয়ে না আসেন আরেকজন তখন ঐ রাজনীতি আর টেকে না বেশিদিন। অতীতে আমরা দেখেছি মুসলিম লীগের একই পরিণতি হয়েছে। এছাড়া কৃষক শ্রমিক পার্টি ও ন্যাপের একই পরিণতি হয়েছে।"

তার মতে, আমাদের দেশে সামন্ত ধাঁচের মানসিকতা আমরা পরিবারগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। জিয়া পরিবার থেকে একটা বিকল্প কাউকে বের করতে হবে। কারণ পরিবারের বাইরে নেতৃত্ব তো যাবে না। স্ট্যান্ডিং কমিটির যে অবস্থা কেউ কাউকে মানে না।

পরিবার থেকেই কাউকে না কাউকে আসতে হবে। আমরা অনেক গসিপ শুনেছিলাম যে তারেকের স্ত্রী তাকে স্ট্যান্ডিং কমিটির মেম্বার করা হলো না কেন এটা নিয়ে কয়েকজন কথা বলেছেন। এর বাইরে তো আমি দেখিনা আসলে।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন