রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮ ১০:২০:৩৩ পিএম

বাংলাদেশ-চীন ঘনিষ্ঠতায় উদ্বিগ্ন ভারত

আন্তর্জাতিক | বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৩:৫১:১৪ এএম

ঢাকা-বেইজিং ঘনিষ্ঠতা ক্রমেই বাড়ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি থেকে শেয়ার বাজার- সর্বত্রই ‘কৌশলগত অংশীদার’ চীনের সরব উপস্থিতি। বাণিজ্য-বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বেইজিং অনেক এগিয়ে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন। কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালেও দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে যেন কোনো রকম টানাপড়েন না হয় তাতে সচেষ্ট ঢাকা।

তাদের মতে, ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই বাংলাদেশের অগ্রাধিকার। কিন্তু বেইজিং বা দিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে কিভাবে মূল্যায়ন করে? প্রতিযোগিতায় থাকা দেশ দুটির গণমাধ্যমে প্রায়ই এ নিয়ে নানা খবর ও মূল্যায়ন থাকে। সেখানে স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগের বিষয়টিই বেশি আলোচিত হয়।

নয়াদিল্লি ডেটলাইনে প্রকাশিত সামপ্রতিক সময়ের রিপোর্টগুলোতে ঘুরে ফিরে যে বার্তা দেয়া হচ্ছে- তা হলো ঢাকা-বেইজিং ঘনিষ্ঠতায় চরম অস্বস্তি বা উদ্বেগে রয়েছে নয়াদিল্লি। এ উদ্বেগের পেছনে যুক্তি বা দালিলিক প্রমাণও দেখাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। ভারতের সংবাদ বিষয়ক ওয়েব সাইট স্ক্রল. ইন-এ প্রকাশিত শোয়েব দানিয়েলের এক নিবন্ধে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে চীনের উপস্থিতির বিষয়টি বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

নিবন্ধটির সূচনা হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে। তাতে বলা হয়েছে- এক দশক আগে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বেগম খালেদা জিয়ার দুর্নীতির দায়ে তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের বছরে বিএনপি নেত্রীর দণ্ড এবং জেলে পাঠানোর কারণে নির্বাচনে তিনি এবং তার দলের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে গেছে!

যদি সত্যি সত্যি খালেদা জিয়া ও তার দল আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে তবে বাংলাদেশের জরাগ্রস্ত গণতন্ত্র আরো খর্ব হতে পারে। তবে এতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এমনটা দাবি করে বলা হয়েছে- বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রয়েছে ভারত।

২০১৪ সালে বিএনপি ভোট বর্জন করে। সহিংসতাপূর্ণ ওই নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে ভোটাভুটিই হয়নি। ফলে এ নির্বাচন প্রহসনের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না মন্তব্য করে নিবন্ধে বলা হয়- তারপরও শেখ হাসিনাকে সমর্থন দেয় নয়াদিল্লি। আর এ কারণে নতুন সরকারের বৈধতার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মৃদু সমালোচনাও চাপা পড়ে যায়।

নিবন্ধে বাংলাদেশে চীন ও ভারতের সহযোগিতাকে তুলে আনা হয়েছে এভাবে- চীন বাংলাদেশকে ২৪ কোটি ডলারের ঋণ দিয়েছে। সেই তুলনায় ভারত অনেক পিছিয়ে। তাছাড়া নয়াদিল্লির উদ্বেগের বড় কারণ হচ্ছে, চীনের কাছ থেকে দুটি সাবমেরিন পেয়েছে বাংলাদেশ। দুই দেশের নৌ-বাহিনীর মধ্যে যৌথ অনুশীলনও রয়েছে।

নিবন্ধটির সমাপ্তি টানা হয়েছে এইবলে- নেপাল ও মালদ্বীপ এখন চীনের অক্ষের দিকে ঝুঁকছে। ফলে আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে নির্বাচন হওয়ার পরও ঢাকাকে বন্ধুপ্রতীম হিসাবে পেতে নয়াদিল্লি উন্মুখ হয়ে থাকবে। অন্য একাধিক ভারতীয় বিশ্লেষণে অবশ্য বড্ড সমালোচনা করা হয়েছে চীনের। সেখানে চীনকে ‘আগ্রাসী’ বলা হয়েছে।

বিশ্লেষণটি এরকম- প্রতিবেশীদের কাজে লাগিয়ে ভারতকে একরকম ঘিরে ফেলার যে আগ্রাসী নীতি নিয়ে চলছে চীন, তাতে এ পর্যন্ত একমাত্র ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। ভারতের অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, ঢাকা এখনও দিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে একটা ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে। এমনকি ভৌগোলিক ও মানসিক নৈকট্যের কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা ভারতের দিকেই ঝুঁকে আছে।

কিন্তু দিল্লির কাছ থেকে সব সময় তারা এর উপযুক্ত প্রতিদান পাচ্ছে না, আক্ষেপ সেখানেই। এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হিসাবে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট অব চাইনিজ স্টাডিজ’র বিশেষজ্ঞ ড. জোনাথন ডি টি ওয়ার্ড এর মতে, ভারত-চীনের উত্তেজনা ক্রমশ মেরিটাইম ডোমেইনে সরে আসছে, বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে।

চীন যে ভারতকে দক্ষিণ দিক দিয়ে নানা দেশে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন নৌবন্দর স্থাপন করে একরকম ঘিরে ফেলতে চায়, এটা অবশ্য নতুন কোনো কথা নয়। ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকে এটাকে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বলেও বর্ণনা করে থাকেন, যে মুক্তোর হারে মুক্তোগুলো মালাক্কা প্রণালী থেকে মিয়ানমার, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান হয়ে হরমুজ প্রণালী ও সোমালিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।

বিশ্লেষকরা একটা বিষয় মানছেন তা হলো- শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ ও মিয়ানমারে চীনের প্রভাব যেভাবে বাড়ছে তাতে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখনও বিরল-ব্যতিক্রম!

ভারতীয় কূটনীতিক চন্দ্রশেখর দাশগুপ্তের মতে, ‘বাংলাদেশে এসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারের চেক লিখে দিয়ে গেছেন। তার পরেও ঢাকা সটান চীনের প্রভাব বলয়ে ঢুকে পড়েছে এটা কিন্তু মোটেও বলা যাবে না। চীনের দান-খয়রাতির সঙ্গে পাল্লা দেয়ার ক্ষমতা ভারতের নেই, এটা জেনেও শেখ হাসিনা সরকার এখনও পরিষ্কার ভারতের দিকেই ঝুঁকে আছে।’

কিন্তু রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে সেই বাংলাদেশের প্রত্যাশাকে যে ভারত পূরণ করতে পারেনি এটি তিনিও মানছেন। তার ভাষ্যমতে, ‘মিয়ানমারের অনুভূতিকে আমার মনে হয় একটু বেশিই গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছি। কিন্তু যে দেশটিকে লাখ লাখ শরণার্থীর বোঝা বইতে হচ্ছে, তাদের কথাকে ভারত আরো একটু বেশি গুরুত্ব দিলেই মনে হয় ভালো করত।’

অন্য এক বিশ্লেষক বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান চীনের প্রভাবে দিল্লির উদ্বিগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। নেপালে চীনের প্রভাব বাড়ছে। শ্রীলংকাতেও পিছিয়ে নেই। পাকিস্তান তো আছেই। আর মিয়ানমারে চীনের সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন এটাও দিল্লির জানা। বাকি রইল বাংলাদেশ। এখানে চীনের সরব উপস্থিতি দিল্লির জন্য মোটেই স্বস্তিকর নয়। আর বাংলাদেশে বিনিয়োগে চীনের সঙ্গে পারবে না- এটা ভারতের মিডিয়াই ফলাও করে প্রচার করছে।

ঢাকার সদ্য বিদায়ী চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং কিয়াং যাওয়ার আগে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদশ ও চীন সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন। পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের উপস্থিতিতে চীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী বাংলাদেশের তরুণ কূটনীতিকদের অভিজ্ঞতা বিনিময় অনুষ্ঠানে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, একতা আর বন্ধুত্বের নীতিকে ভিত্তি ধরেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিচ্ছে বেইজিং।

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বাংলাদেশ একটি নবীন রাষ্ট্র। অন্যদিকে চীন বেশ পুরনো রাষ্ট্র। প্রতিটি ক্ষেত্রেই চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে। এজন্য আমাদের মধ্যে আরো বেশি সহযোগিতা দরকার।

এদিকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশের সমর্থনের বিষয়টিকেও ভালোভাবে নেয়নি নয়াদিল্লি। ভারত ওই প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমারের মধ্যে বিসিআইএম-ইসি নামের প্রস্তাবিত চতুর্দেশীয় অর্থনৈতিক করিডোরকে চীন ইনিশিয়েটিভে’র অংশ হিসেবেই দেখতে চায়। ফলে করিডোর বাস্তবায়নে ভারত এখন শীতলভাব দেখাচ্ছে।

গত অক্টোবরে পররাষ্ট্র সচিবের দিল্লি সফরে এ নিয়ে মতপার্থক্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। বিবিসি বাংলার রিপোর্ট মতে, ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটের মঞ্চে সচিব শহীদুল হক পরিষ্কার করেই বলেন, বাংলাদেশের কাছে অর্থনীতির দাবি আগে। বাংলাদেশ আশেপাশের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলাতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ভারত যেভাবে বিষয়টি দেখে বাংলাদেশ সেভাবে দেখে না জানিয়ে সচিব বলেন, সার্বভৌমত্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভৌগোলিক ও অন্যভাবেও ছোট দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা দূর করতে দুনিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চায় ঢাকা। এজন্য অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশ আগেই নিজেদের দরজা খুলে দিয়েছে।

ওই অনুষ্ঠানে চীনের প্রতি ইঙ্গিত করে ভারতের সাবেক কূটনীতিক তথা সহকারী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা লীলা পোনাপ্পা বলছিলেন, একটা বহুপাক্ষিক প্রকল্পে কোনো বিশেষ একজন অন্যায় আধিপত্য দেখাবে এটা ভারতের পক্ষে মানা সম্ভব নয়। -এমজমিন

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন