মঙ্গলবার, ১৪ আগস্ট ২০১৮ ১২:৩৮:১১ পিএম

সুনামগঞ্জ পৌরসভা: দুই পরিবারের প্রভাবে এবারো ‘বোনাস’দলীয় প্রতীক?

রাজনীতি | সুনামগঞ্জ | বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ১০:৫৫:১২ পিএম

সুনামগঞ্জ পৌরসভার অতীতের নির্বাচনগুলোর ফলাফলের দিকে তাকালে মুখ্য হয়ে ওঠে আসে শহরের দুটি পরিবারের নাম, বিগত অন্তত সাতটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন পরিবার দুটির প্রার্থীরা, যার একটি বখত পরিবার আর অন্যটি হাছনরাজা পরিবার।

এ দুই পরিবারের মাঝেই পৌরসভার ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে বার বার। ভোটের পাল্লা ওঠানামা করলেও পরিবার দুটিকে ঘিরে এখানকার ভোটারাও দ্বিধাবভক্ত। এক কথায়, জাতীয় রাজনীতির প্রভাবকে পারিবারিক প্রভাবে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার অলিখিত রেওয়াজ চালু হয়ে আছে এই পৌরসভায়।

গত পহেলা ফ্রেব্রুয়ারি রাজনৈতিক কাজে ঢাকায় অবস্থানকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভার জনপ্রিয় মেয়র আয়ুব বখত জগলুলের মৃত্যু হলে এখানকার মেয়রের পদটি শূন্য হয়ে যায়। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইনের বিধানমতে নির্বাচিত পৌর পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের পূর্বে কোন মেয়র বা কাউন্সিলরের পদ শূন্য হলে, পদটি শূন্য হবার ৯০ দিনের মধ্যে পূরণ করার বাধ্যবাধকতা থাকায় শোকের আবহেও নির্বাচনমুখী এখন সুনামগঞ্জ পৌরসভার মানুষ। অকাল প্রয়াত মেয়রের চেয়ারে কাকে বসালে ভাল হবে- ভোটারদের মাঝে চলছে চাপা আলোচনা। আর ঘুরে ফিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এবারো অবস্থান করছেন বখত পরিবার আর হাছনরাজা পরিবারের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা।

২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো যখন দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হয়, তখনও এই পৌরসভায় ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে দুই পরিবারের নিজস্ব ভোট ব্যাংকের ওপর ভিত্তি করে। দলীয় প্রতীককে এই পৌররসভার ভোটাররা প্রার্থীর ‘বোনাস’ পয়েন্ট হিসেবে দেখে থাকেন। পারিবারিক ইমেজের পাশাপাশি কোন প্রার্থীর দলীয় প্রতীক পাওয়া তার বাক্সে ‘বোনাস’ হিসেবে কিছু ভোট যোগ হওয়া। পরিবারিক প্রভাববলয় ভিত্তিক দীর্ঘদিনের বিভাজনে দলীয় প্রতীক তাই ভোটের ফলাফলে বড় কোন ফারাক সৃষ্টি হয় না।

জাতীয় নির্বাচন ভিত্তিক পরিসংখ্যানে ভোটের হিসাবে পৌরসভায় বিএনপি এগিয়ে থাকলেও তুলনামূলক সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার পরও ২০১৬ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে বিএনপি প্রার্থী পেয়েছিলেন প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৮.৭০ ভাগ মাত্র। অথচ নৌকা নিয়ে বখত পরিবারের প্রার্থী সাড়ে ৫৩ ভাগ ও হাছন রাজা পরিবারের স্বতন্ত্র প্রার্থী পেয়েছিলেন পৌনে ৩৭.৭৯ ভাগ ভোট।

আয়ুব বখত জগলুলের মৃত্যুর পর সুনামগঞ্জ পৌরসভায় মেয়র পদের বিপরীতে তাই ঘুরে ফিরে আসছে বখত আর হাছন রাজা পরিবারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম। শোকের মাঝেও ভোটের মাঠের পাক্কা খেলোয়াড় পরিবার দুটি নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে, যাতে তফশিল ঘোষণার পর পর দ্রুত পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নামতে পারেন।

জানা যায়, উপ-নির্বাচেন বখত পরিবার থেকে প্রার্থী হবেন প্রয়াত মেয়র জগলুলের ছোট ভাই নাদের বখত। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে জেলখাটা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা নির্বাচনে লড়ার জন্য চাইবেন দলীয় প্রতীক নৌকা। যাতে নির্বাচিত হয়ে প্রয়াত মেয়র আয়ুব বখত জগলুলের অসম্পূর্ণ উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। এছাড়া অতীতের চারটি নির্বাচনে জগলুলের পক্ষে জনমত গড়তে নাদের বখতের অগ্রণী ভুমিকা থাকার কারণে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তাঁর পক্ষে অনেকটাই সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সেইসাথে দুই মেয়াদে মেয়র থাকা অবস্থায় জগলুল পৌরসভায় দুই দৃশ্যমান যেসব উন্নয়ন করেছেন, তাঁর সহোদর হিসেবে সাধারণ ভোটারদের বাড়তি সহনুভুতি নাদের বখতের পক্ষে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এছাড়া নৌকা নিয়ে নির্বাচন করতে চাইছেন হাছনরাজা পরিবারের দেওয়ান ইমদাদ রেজা চৌধুরী। শহরের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গণের পরিচিত এই মুখকে দেখা হচ্ছে শক্তিশালী একজন প্রার্থী হিসেবে। আওয়ামী লীগের অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে নাম ওঠে এসেছে পাবলিক প্রসিকিউটরের দায়িত্বে থাকা (পিপি) খায়রুল কবির রুমেনের।

২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রয়াত জগলুলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হাছনরাজা পরিবারের দেওয়ান গণিউল সালাদীন এবারো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। নির্বাচনে যে সাড়ে চার হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন সালাদীন, সেই সংখ্যাকে পারিবারিক প্রভাবের বাইরে দলীয় প্রতীকের ‘বোনাস’ ভোট বিবেচনা করে এবার তাই ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে মাঠে নেমেছেন হাছন পরিবারের দেওয়ান সাজাউর রাজা চৌধুরী সুমন। যুব সমাজে বেশ জনপ্রিয় সুমনকে সম্প্রতি বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে।

অপরদিকে, বিগত দুটি নির্বাচনে পৌরসভায় পারিবারিক প্রভাববলয় ভাঙার লক্ষ্য নিয়ে ভোটের মাঠে থাকা বিএনপির প্রার্থী অধ্যক্ষ শেরগুল আহমেদ এবারো ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করবেন বলে জানা গেছে। পৌরসভায় যাতে দলের সতন্ত্র ইমেজ সৃষ্টি করতে চাইবেন তিনি। তাঁর পক্ষে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকলে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করেন শেরগুল। এছাড়া ধনের বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন দুই বারের সাবেক পৌর কাউন্সিলর ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল নোমানও।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন