রবিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৮ ০৫:৩০:০৩ এএম

পলিথিনে ঘেরা সুনেকার সংসার

জেলার খবর | লালমনিরহাট | শুক্রবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৮:৫৩:৪৭ পিএম

`গরিবের কথা কায় শুনে বাপু। ওরা (প্রতিপক্ষ) এসপি, টিএনও অফিসের ঝাড়ুদার হওয়ায় সগায় ওমার(ওদের) কথা শুনে ওমার পক্ষে কোটোত কাগজ পাঠায়। হামার দুঃখ কায়ো দেখে না। এতক্ষণ যে কথা গুলো শুনলেন এ কথা গুলো চোখের জল বের করতে করতে বলছিলেন সুনেকা বালা।`

বাজারের গো-মাংসের সেট ঘরের ভিতরে পলিথিনে মোড়ানো একটি ঝুপড়ি ঘর। দরজা জানালা নেই। দুর্গন্ধে যাওয়া অসম্ভব হলে এক পাশে পলিথিনের ফাঁকা জায়গা দিয়ে ভিতরে উঁকি মেরে দেখা গেল মধ্য বয়স্ক এক মহিলা চুলো জ্বালিয়ে রান্না করছেন। নাম জানতে চাইলে বললেন` সুনেকা বালা বেদ`। পাশে বসে রয়েছেন স্বামী মনকান্ত বর্মন বেদ। প্রায় দুই বছর যাবত তারা এই ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন। তাদের খোঁজ রাখেন না কেউই।

বাজারের সেট ঘরে দুর্গন্ধযুক্ত স্থানে কেন বসবাস করছেন- এমন প্রশ্নে নির্বাক সুনেকা বালা বার বার চোখের জল মুছেছেন। কয়েক মিনিটের নিরবতা শেষে এক গাঁদা কাগজ নিয়ে এলেন তার স্বামী মনকান্ত। বাপ দাদার ভিটে মাটি আবাদি জমি নিজের ঘর সব ছিল এখনও আছে। তবে তা শুধুমাত্র কাগজ কলমে। বাস্তবে তারা ভুমিহীন গৃহহীন এমনটাই জানান সুনেকা বালা।

সুনেকা বালা বেদ ও মনকান্ত বর্মন বেদ লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভাদাই ইউনিয়নের আরাজি দেওডোবা কাছারীপাড়া এলাকার মৃত প্রাণেশ্বরের একমাত্র মেয়ে ও জামাই।

সুনেকা বালা বেদ বলেন, বাবার একমাত্র মেয়ে আমি। অনেক জমিজমা ছিল আমাদের। কিন্তু ছেলে সন্তান না থাকায় মেয়ের বিয়ে দিয়ে ঘর জামাই রাখেন প্রাণেশ্বর। নিজের বসতবাড়ির ৪ শতাংশ জমি ১৯৯৭ সালে মেয়ে সুনেকা বালাকে কবলা মুলে দিয়ে যান প্রাণেশ্বর। সেই বসতবাড়িতে মা ক্ষিরবালাকে নিয়ে সুখেই ছিলেন সুনেকা বালা। কিছু দিন পর মা ক্ষিরবালাও পাড়ি জমান পরপারে।

সংসারের আয়ের জন্য স্বামী মনকান্ত মাঝে মাঝেই ঢাকায় যেয়ে রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন। এ সুযোগে প্রতিবেশী গনেশ চন্দ্র পেশি শক্তির জোরে তাদেরকে উচ্ছেদ করতে ওই বাড়িতে হামলা করে। এ নিয়ে থানায় ও আদালতে একাধিক মামলা দায়ের করেন সুনেকা বালা। মামলা করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ২০১৬ সালে গনেশ চন্দ্র গংরা দলবল নিয়ে ওই বাড়িতে হামলা করে জোরপুর্বক তাদের বের করে দিয়ে ঘরে তালা দিয়ে দেন। নিরুপায় হয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে বুড়িরবাজারের গো- মাংসের পরিত্যাক্ত দুর্গন্ধযুক্ত সেট ঘরে বসবাস শুরু করেন তিনি।

স্বামীর সামান্য আয়ে অনাহারে অর্ধহারে পলিথিনের ঝুপড়ি ঘরে দিন কাটছে তাদের। বাবার ও তাঁর নিজের জমি উদ্ধারে দায়ের করা মামলার খরচ বহনে হিমশিম খাচ্ছেন সুনেকা। প্রতিপক্ষ গনেশ ইউএনও অফিসের এবং তার ভাগিনা অতুল চন্দ্র এসপি অফিসের ঝাড়ুদার হওয়ায় আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দাবি করেন সুনেকা বালা বেদ। সুবিচারের আশায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে লিখিত আবেদন করেন তিনি।

সুনেকার পৈত্রিক বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল তার ঘরে দুইটি তালা লাগানো। কথা হয় সুনেকার প্রতিপক্ষ গনেশ চন্দ্রের সাথে। তিনি জানান, সুনেকা নিজেই ঘরে তালা দিয়ে মামলা করেছেন। আদালত যে রায় দিবে তা মানা হবে। তার ঘর অক্ষত রয়েছে।

বুড়িরবাজার হাটের সাবেক ইজারাদার ইব্রাহিম মিয়া জানান, সুনেকার বাড়ি দখল হওয়ার পর তার অনুরোধে মানবিক কারনে সেট ঘরের পরিত্যক্ত জায়গায় তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনের জোরালো হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তিনি।

শুধু সুনেকা বালা নন, এমন অনেকেই গৃহহীন হয়ে ঠাঁই নিয়েছেন বাঁধ বা রাস্তার ধারে ঝুপড়ি ঘরে। সরকারের এমডিজি অর্জনে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব আশ্রয়হীন গৃহহীনরা। তাদেরকে পুনবাসন করাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন সুশিল সমাজের প্রতিনিধিরা।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন